স্বামী স্ত্রী দূরে থাকার বিষয়ে প্রশ্ন
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য প্রশান্তির কারণ। বিশেষ করে দীর্ঘদিন দূরে থাকার পর স্বামী-স্ত্রীর মিলন ও সঙ্গদান ইসলামী জীবনব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো পরিষ্কার করা যাচ্ছে:
১. স্ত্রীর অধিকার ও স্বামীর কর্তব্য
ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী বিবাহিত স্ত্রীর ওপর স্বামীর যেমন অধিকার আছে, তেমনি স্বামীর ওপরও স্ত্রীর অধিকার আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো স্বামীর উপস্থিতি ও সঙ্গদান। বিশেষ করে দীর্ঘদিন দূরে থাকার পর স্ত্রীর কাছে আসা ও তার চাহিদা পূরণ করা স্বামীর জন্য জরুরি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।" (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)
২৫ দিন বিয়ের পরই স্বামী বিদেশে চলে গেছেন, এবং দীর্ঘ ১ বছর ২ মাস দূরে থাকার পর এখন তিনি দেশে আসছেন। এমতাবস্থায় স্ত্রীর কাছে যথাযথ সময় কাটানো স্বামীর জন্য একটি দায়িত্ব। বিশেষ করে আপনার শারীরিক ও মানসিক চাহিদা থাকলে তা পূরণ করা তার জন্য কর্তব্য।
২. উমরাহ বনাম স্ত্রীর অধিকার
উমরাহ একটি অত্যন্ত পুণ্যময় ইবাদত, কিন্তু এটি সুন্নাত (নফল) ইবাদত, অর্থাৎ ফরজ বা ওয়াজিব নয়। অন্যদিকে, স্ত্রীর সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করা এবং তার সঙ্গদান ও সেবা করা স্বামীর ওয়াজিব কর্তব্য। যখন নফল ইবাদতের কারণে ওয়াজিব কর্তব্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন নফল ইবাদত পরিত্যাগ করে ওয়াজিব পালন করাই উত্তম।
ফাতাওয়া শামী (রদ্দুল মুহতার)-এ উল্লেখ আছে:
"যে ব্যক্তির স্ত্রী তার ওপর নির্ভরশীল, তার জন্য নফল ইবাদতে লিপ্ত থেকে স্ত্রীর অধিকার নষ্ট করা জায়েজ নয়।" (রদ্দুল মুহতার, ২/৪২২)
সুতরাং, আপনার স্বামীর জন্য উচিত হবে প্রথমে আপনার সাথে কিছু দিন থেকে প্রশান্তি ও পারস্পরিক সঙ্গ উপভোগ করা, তারপর ইচ্ছে করলে উমরাহ করতে যাওয়া। তবে উমরাহর জন্য একেবারে ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই; বরং উমরাহ কিছুদিন পিছিয়ে দেয়া বা আপনার সাথেও যেতে পারেন (যদি সামর্থ্য থাকে)।
৩. আপনার পক্ষ থেকে অনুরোধের বিধান
আপনি তাকে বলতে পারবেন না বলে মানসিক কষ্ট পাচ্ছেন, অথচ আপনার অধিকার রক্ষার্থে আপনি স্পষ্টভাবে অনুরোধ করতে পারেন। ইসলামী আদবের মধ্যে স্ত্রীর জন্য স্বামীর কাছে নিজের চাহিদা জানানো জায়েজ এবং প্রশংসনীয়। আপনি এভাবে বলতে পারেন:
"আমি অনেকদিন পর আপনাকে পেয়েছি। দয়া করে কিছু দিন আমার কাছে থেকে আমার সঙ্গ দিন, তারপর উমরাহ করুন—এতে কোনো অসুবিধা নেই।"
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে এসেছে:
"স্ত্রী যদি কোনো নফল রোজা রাখতে চায়, তবে স্বামীর অনুমতি না নিলে তা কবুল হয় না। কিন্তু স্বামী উপস্থিত থাকলে তার অধিকার আগে পূরণ করতে হবে।" (বুখারি, মুসলিম)
এ থেকে বোঝা যায়, স্বামীর অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি স্ত্রীর অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর।
৪. পরিস্থিতি মোকাবিলার উপায়
- প্রথমে আপনার স্বামীর সাথে মধুরভাবে কথা বলে বিষয়টি বোঝান। তাকে বলুন যে আপনি তাকে অনেক মিস করছেন এবং তার সঙ্গদান এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
- উমরাহ যদি অত্যন্ত প্রয়োজন মনে করেন, তাহলে তিনি উমরাহ করে ফিরে এসে আপনার সাথে কিছুদিন থাকতে পারেন।
- ভবিষ্যতে আপনার জন্য উমরাহর ব্যবস্থাও চিন্তা করতে পারেন যাতে আপনিও ইবাদতে অংশ নিতে পারেন।
৫. ফিকহী গ্রন্থের রেফারেন্স
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ২/৪২২, ৩/৫২৭—স্ত্রীর অধিকার ও নফল ইবাদতের প্রাধান্য সম্পর্কে।
- ফাতাওয়া উসমানী: ২/৪২—স্বামীর উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/৩৪১—স্ত্রীর সাথে সহবাসের ক্ষেত্রে স্বামীর কর্তব্য।
উপসংহার
আপনার স্বামীর জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো আপনার কাছে এসে কিছুদিন অবস্থান করা, দীর্ঘদিনের দূরে থাকার পর আপনাকে সান্ত্বনা দেওয়া এবং স্ত্রী হিসেবে আপনার চাহিদা পূরণ করা। উমরাহ করা নফল ইবাদত, তা কিছুদিন পিছিয়ে দেয়া বা আপনার সাথেও মিলিয়ে নেয়া সম্ভব। দূরে থাকার পর আপনি তাকে 'চাচ্ছেন' তা স্বাভাবিক এবং তার প্রতি আপনার অধিকার। তাই তাকে স্পষ্টভাবে জানান যে আপনার কাছে সময় কাটানো জরুরি।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের মাঝে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি স্থাপন করুন এবং উভয়ের ইবাদতকে কবুল করুন। আমীন।