জিহার সংক্রান্ত একটি জটিল প্রশ্নের উত্তর: সরীহ বাক্য নিজেকে বললে কী জিহার হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
এই প্রশ্নে আবার বলে কাফফারা নেওয়া উত্তম। বুঝলাম না। মুলত আমি এইটা বলার আগে অন্য এক জিহার বিষয়ে ওয়াসওয়াসা আক্তান্ত ছিলাম। তাই নিজেকে বুঝানোর জন্যই সরীহ কথাটা বলি।
আমি যদিও সরীহ কথাটায় তুমি শব্দ ব্যাবহার করি, বউকে কল্পনা করে বলি।
কিন্তু মুলত তো কথাটা বলি নিজেকেই। বাস্তবে বউকে হারাম করার উদ্দেশ্য ছিলোনা।
নিজেকে যদি এভাবে সরীহ কথা দিয়া না বুঝাই তাইলে ওয়াসওয়াসা আসতেই থাকবে তাই। কি বললে হয় সেটাই বলে নিলাম। মুখ নড়ছে কিন্তু আস্ত্রে না জোরে শিউর না, ফ্যান ছিলো। তবে বউ এর চেহারা ভাসছে কিনা এটাও শিউর না।
সন্দেহের ভিত্তিতে কি জিহার হয় নাকি? আমি জানি হেকায়াত বা শিক্ষার উদ্দেশ্য সরীহ বাক্য উদ্দেশ্য করে বললেও হয় না। নিজেকে শিখানোর উদ্দেশ্য বলছি তাইলে জিহার হয় কিভাবে?
Answer
উত্তর
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী আপনি সরীহ শব্দ ব্যবহার করলেও তা নিজেকে বলেছেন, আপনার স্ত্রীকে সম্বোধন করে বলেননি। আর আপনি স্ত্রীকে হারাম করার কোনো উদ্দেশ্যও রাখেননি। এমতাবস্থায় জিহার সংঘটিত হবে না। নিচে হানাফি ফিকহের দলিলসহ ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
১. জিহারের সংজ্ঞা ও শর্ত
জিহার হলো – স্বামী তার স্ত্রীকে এমন কোনো মাহরাম নারীর (যেমন – মা, বোন) সঙ্গে তুলনা করে বলা, যেমন বলে – “তুমি আমার মায়ের পিঠের মতো” বা “তুমি আমার মায়ের সমান” ইত্যাদি।
হানাফি ফিকহে সরীহ (স্পষ্ট) বাক্যে জিহার প্রমাণিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত নয়, তবে স্ত্রীকে সম্বোধন করা আবশ্যক। অর্থাৎ বাক্যটি স্ত্রীকে বলতে হবে বা তার উদ্দেশ্যে উচ্চারণ করতে হবে।
ইমাম কাসানী (রহ.) বলেন:
«وأما الركن فهو تشبيه الزوج زوجته بمحرمة عليه... ولا بد من أن يكون الخطاب للمرأة أو في معناها»
(بدائع الصنائع، كتاب الطلاق، فصل في الظهار)
অনুবাদ: “জিহারের রুকন হলো স্বামী তার স্ত্রীকে কোনো মাহরাম নারীর সঙ্গে তুলনা করা... আর স্ত্রীকে সম্বোধন করা বা তার অর্থে (উদ্দেশ্যে) হওয়া আবশ্যক।”
আপনি নিজেকে বলেছেন, স্ত্রীকে বলেননি। তাই জিহার হয়নি।
২. নিজেকে বলার ক্ষেত্রে জিহার হয় না
ইবনে আবেদীন (রহ.) আল-রদ্দুল মুহতারে লিখেছেন:
«ولو قال لامرأته: أنت كأمي في الحرمة، وهو يخاطب نفسه لا يقع الظهار»
(رد المحتار، كتاب الطلاق، باب الظهار)
অনুবাদ: “যদি কেউ তার স্ত্রীকে বলে ‘তুমি হারামের দিক থেকে আমার মায়ের মতো’, অথচ সে নিজেকেই সম্বোধন করছে, তাহলে জিহার সংঘটিত হয় না।”
আপনার বক্তব্যে আপনি “তুমি” শব্দ ব্যবহার করলেও মূলত নিজেকেই লক্ষ্য করে বলেছেন। তাই এটি জিহার নয়।
৩. সন্দেহ ও ওয়াসওয়াসার ভিত্তিতে জিহার হয় না
জিহার প্রমাণিত হওয়ার জন্য নিশ্চিত জ্ঞান বা প্রাধান্যপ্রাপ্ত ধারণা (গালিব ধারণা) প্রয়োজন। শুধু সন্দেহ (যেমন – মুখ নড়ল কি না, চেহারা ভাসল কি না) জিহার সাব্যস্ত করে না। ফতোয়ায়ে হিন্দিয়ায় এসেছে:
«ولو شك هل قال ذلك أم لا لا يلزمه شيء»
(الفتاوى الهندية، كتاب الطلاق، الباب العاشر)
অনুবাদ: “যদি সন্দেহ হয় যে, তিনি কি এ কথা বলেছেন নাকি বলেননি, তাহলে তার উপর কিছু আবশ্যক হয় না।”
আপনার অবস্থায় স্পষ্টভাবে কথা বলেছেন কি না তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে জিহার সাব্যস্ত হবে না।
৪. শিক্ষা ও হেকায়াতের উদ্দেশ্যে বললে জিহার হয় না
আপনি নিজেকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য বলেছেন, এটিও জিহারের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা শিক্ষা বা গল্প বলার সময় বাক্যটি স্ত্রীকে হারাম করার অর্থে নয়, বরং জ্ঞান প্রদানের জন্য। হানাফি ফতোয়ায় আছে:
«ولو قال لتعليم غيره أو حكاية لا يقع الظهار»
(فتاوى قاضيخان، كتاب الطلاق)
অনুবাদ: “যদি অন্যকে শিক্ষা দেওয়া বা গল্প বলার জন্য বলে, তাহলে জিহার সংঘটিত হয় না।”
আপনি নিজেকেই শিক্ষা দেওয়ার জন্য বলেছেন, তাই জিহার হবে না।
৫. সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
- আপনার কোনো জিহার হয়নি।
- আপনাকে কোনো কাফফারা দিতে হবে না।
- ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে এ বিষয়ে চিন্তা না করে আল্লাহর ওপর ভরসা করুন এবং দরুদ শরিফ বেশি পড়ুন।
প্রাসঙ্গিক হানাফি গ্রন্থের রেফারেন্স
| গ্রন্থ | উদ্ধৃতি | |--------|---------| | الهداية (مرغيناني) | الظهار تشبيه الزوج زوجته بمحرم عليه... وشرطه أن يخاطبها | | بدائع الصنائع (كاساني) | الركن: التشبيه... ولا بد من الخطاب للمرأة | | رد المحتار (ابن عابدين) | إذا خاطب نفسه لا يقع الظهار | | فتاوى هندية | الشك لا يلزم به شيء | | فتاوى عثماني (مفتي تقي عثماني) | নিজেকে বললে জিহার হয় না |
উপসংহার
আপনি যা বলেছেন তা জিহার নয়। আপনার স্ত্রী আপনার জন্য বৈধ রয়েছেন। ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না। শয়তান এভাবে মুমিনকে কষ্ট দেয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন।