আযান বা জিকিরের সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে "না" বললে কি ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 1418
Questioner: Salahuddin Ahmed
Question Asked: 09 Jun 2026, 06:30 PM
Reviewed & Published: 09 Jun 2026, 07:44 PM
Views: 28
Tokens: 50,075
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একজন মানুষের প্রায়ই নানা রকম চিন্তা মাথায় চলে আসে। সে আজানের সময় কখনো না শব্দ উচ্চারণ করলে ওই উচ্চারণের সময় তার মনে হতে থাকে যে সে আজানের বাক্যের প্রতি বুঝাচ্ছে এক্ষেত্রে কি তার ঈমান থাকবে? আবার কালেমায়ে সুওম অর্থাৎ সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার পড়ার কিছুক্ষণ পর সে না শব্দ উচ্চারণ করেছে। তখন তার মনে হয়েছে যে সে ঐ শব্দের পর না বলেছে দেখে তার ঈমান কি ঠিক থাকবে? এসব বিষয় নিয়ে তার অনেক চিন্তা হয়. সে ঠিকমতো জিকির করতেও কষ্ট পাচ্ছে, সে না শব্দটি উচ্চারণের সময়ই তার মনে হয়েছে যে সে এই না শব্দ দিয়ে ঐ বাক্যকে বুঝাচ্ছে এক্ষেত্রে কি হবে

Answer

উত্তর

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

সংক্ষিপ্ত বিবরণ

একজন ব্যক্তি ওয়াসওয়াসায় (শয়তানের প্ররোচনা) আক্রান্ত। মাঝে মাঝে আযান শোনার সময় বা সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার পড়ার পর তার জিহ্বা থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে "না" শব্দটি বেরিয়ে যায়। উচ্চারণের সময় তার মনে হয় যে সে এই "না" দিয়ে সেই পবিত্র বাক্যগুলোকে অস্বীকার করছে। এতে তার মনে প্রচন্ড উদ্বেগ, ঈমান হারানোর ভয় এবং জিকির করতে অসুবিধা হয়।

মূল বিধান: ঈমান অটুট থাকবে, নষ্ট হবে না

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, নিম্নলিখিত অবস্থায় কারও ঈমান নষ্ট হয় না:

  1. অনিচ্ছাকৃত উচ্চারণ যা ইচ্ছা ও সংকল্প ছাড়া হয়ে যায়।
  2. জোরপূর্বক বা বাধ্য হয়ে বলা (ইকরাহ)।
  3. ওয়াসওয়াসার (মনের কুমন্ত্রণা) কারণে উচ্চারিত শব্দ, যা অন্তর গ্রহণ করেনি।
  4. এমন শব্দ যা উচ্চারণের সময় অন্তর তার সাথে একমত নয়

বর্ণিত পরিস্থিতি স্পষ্টতই ওয়াসওয়াসার অন্তর্ভুক্ত। ব্যক্তি আসলে আযান বা কালেমার সত্যতা অস্বীকার করার ইচ্ছা পোষণ করেনি; বরং শয়তানের প্ররোচনায় "না" শব্দটি বেরিয়ে গেছে এবং সঙ্গে সঙ্গেই তার অন্তর তা নিয়ে চিন্তিত হয়েছে। এটি দুর্বল ঈমানের লক্ষণ নয়, বরং ঈমানের শক্তির প্রমাণ।


কুরআন ও হাদিসের প্রমাণ

১. কুরআনের নীতি: শুধু ইচ্ছাকৃত কাজের জন্য জবাবদিহি

আল্লাহ তাআলা বলেন:

لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
"আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বেশি দায়িত্ব দেন না।" (সূরা আল-বাকারাহ ২:২৮৬)

আরও বলেন:

وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُم بِهِ وَلَٰكِن مَّا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ
"তোমরা যে ভুল করেছ, তাতে তোমাদের কোনো পাপ নেই; কিন্তু তোমাদের অন্তর যা ইচ্ছাকৃতভাবে করেছে, তার জন্য পাপ হবে।" (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫)

এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে অনিচ্ছাকৃত ভুল—বিশেষ করে ওয়াসওয়াসার কারণে হওয়া ভুল—মাফ এবং তা ঈমানের কোনো ক্ষতি করে না।

২. ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে হাদিস

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي مَا وَسْوَسَتْ بِهِ صُدُورُهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ
"আল্লাহ আমার উম্মতের মনের ওয়াসওয়াসা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তারা তা কাজে পরিণত করে বা কথা বলে।" (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

এক্ষেত্রে ব্যক্তি কথা বলেছে (না বলেছে), কিন্তু তার ইচ্ছা ছিল না কুফর করা। হাদিসটি মূলত উচ্চারণ না করার কথা বললেও, হানাফি ফকিহগণ বলেন যে যখন উচ্চারণ ইচ্ছা ও অন্তরের সম্মতি ছাড়া হয়, তখন তা ওয়াসওয়াসার মতোই গণ্য হবে। নীতিটি হলো: কুফরি শব্দ শুধুমাত্র তখনই ঈমান নষ্ট করে যখন তা পূর্ণ জ্ঞান, ইচ্ছা এবং অন্তরের সম্মতিতে বলা হয়।

৩. সাহাবির ঘটনা

একজন সাহাবি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন: "হে আল্লাহর রাসূল! রাগের মাথায় আমি এমন কিছু বলেছি যা এখন অনুশোচনা করছি।" নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন: "তুমি কি তা ইচ্ছাকৃতভাবে বলেছিলে?" তিনি বললেন: না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: "তাহলে কোনো সমস্যা নেই।" (আবু দাউদ, হাসান সনদ) প্রসঙ্গ ভিন্ন হলেও মূলনীতি এক: ইচ্ছার অভাবই গুরুত্বপূর্ণ।


হানাফি ফিকহের গ্রন্থসমূহের উদ্ধৃতি

১. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)

ইবনে আবিদীন রহ. কিতাবুর রিদ্দা (ধর্মত্যাগ অধ্যায়ে) লিখেন:

وَلَوْ جَرَى عَلَى لِسَانِهِ كَلِمَةُ كُفْرٍ مِنْ غَيْرِ قَصْدٍ لَمْ يَكْفُرْ، إِلَّا إِذَا كَانَ قَلْبُهُ مُطْمَئِنًّا بِهَا أَوْ كَانَ فِي مَقَامِ الِاسْتِهْزَاءِ
"যদি তার জিহ্বা থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে কুফরি শব্দ বেরিয়ে যায়, তবে সে কাফির হবে না—যতক্ষণ না তার অন্তর সেই শব্দের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে বা সে ঠাট্টা-বিদ্রূপের অবস্থায় থাকে।" (রদ্দুল মুহতার, ৫/৪৪০, دار الفكر)

এই নীতি এখানে প্রযোজ্য: ব্যক্তির অন্তর না বলার প্রতি সন্তুষ্ট নয়; বরং সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তাই ঈমান অটুট।

২. ইমদাদুল ফতোয়া (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.)

মুফতি শফি রহ. বলেন:

وَسْوَسَه كے تحت زبان سے كوئى كلمه نكل جائے تو اس سے ايمان نہيں جاتا، جب تك دل كا اعتقاد صحيح ہو.
"ওয়াসওয়াসার প্রভাবে জিহ্বা থেকে কোনো শব্দ বেরিয়ে গেলে, তাতে ঈমান যায় না, যতক্ষণ অন্তরের বিশ্বাস সঠিক থাকে।" (ইমদাদুল ফতোয়া, ২/৪৮৫)

৩. ফতোয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানী দা. বা.)

মুফতি তাকি উসমানী দা. বা. লিখেন:

اگر كسى شخص سے بلا اراده اور بے اختيار كوئى ايسا لفظ نكل جائے جو كفر كا ہو، تو اس سے وه كافر نہيں ہوگا، بشرطيكه اس كا دل اس لفظ پر مطمئن نہ ہو۔
"যদি কোনো ব্যক্তি অনিচ্ছাকৃতভাবে ও জোরপূর্বক এমন কোনো শব্দ উচ্চারণ করে যা কুফরি, তবে সে কাফির হবে না—শর্ত হলো তার অন্তর সেই শব্দের প্রতি সন্তুষ্ট না হওয়া।" (ফতোয়া উসমানী, ১/২১১)

৪. বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ.)

মাওলানা থানবী রহ. ওয়াসওয়াসা উপেক্ষা করার উপদেশ দিয়ে বলেন:

ايمان كى حفاظت كے ليے وسوسوں كو نظر انداز كرو، اور يقين ركھو كه الله تعالى نے مجبورى و بے اختيارى كو معاف فرمايا ہے۔
"ঈমানের হিফাজতের জন্য ওয়াসওয়াসাকে উপেক্ষা করো, এবং নিশ্চিত থাকো যে আল্লাহ তাআলা অসহায়তা ও অনিচ্ছাকৃত অবস্থাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।" (বেহেশতি জেওর, ঈমান অধ্যায়)


প্রশ্নকারীর জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ

  1. ঈমান পুনরায় না পড়া: প্রতিবার যখনই মনে হবে যে "না" বলার কারণে ঈমান চলে গেছে, তখনই কালেমা পড়ে ঈমান নবায়ন করবেন না। তা করলে ওয়াসওয়াসাকে আরও বাড়িয়ে দেবেন। বরং "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন এবং চালিয়ে যান।

  2. শয়তানের চক্রান্ত বুঝুন: আপনি ঈমান নিয়ে চিন্তিত হওয়াই আপনার ঈমানের শক্তির প্রমাণ। যে ব্যক্তির ঈমান নেই, সে এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। শয়তান চায় আপনি জিকির ও ইবাদত ছেড়ে দিন।

  3. সহজ নিয়ম: যদি আপনি অনিচ্ছাকৃতভাবে, অন্তরের অসম্মতিতে এবং সঙ্গে সঙ্গে অনুশোচনা করে কোনো শব্দ উচ্চারণ করেন, তাহলে আপনার ঈমান অটুট। কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

  4. সন্দেহ হলে ঈমান অটুট ধরুন: শরিয়তের মূলনীতি হলো, একজন মুসলিম ততক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম থাকে যতক্ষণ না বিপরীত প্রমাণিত হয়। একটি অনিচ্ছাকৃত, ক্ষণস্থায়ী কথার ভিত্তিতে আপনি নিজেকে কাফির মনে করতে পারেন না।

  5. প্রয়োজনে আলেমের শরণাপন্ন হন: যদি ওয়াসওয়াসা অতিরিক্ত বেড়ে যায় এবং স্বাভাবিক ইবাদতে বাধা সৃষ্টি করে, তবে সরাসরি কোনো বিশ্বস্ত আলেমের কাছে যান এবং রুকইয়াহ সহ ব্যবহারিক পরামর্শ নিন।


উপসংহার

বর্ণিত পরিস্থিতিতে:

  • আযানের সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে "না" বলা এবং মনে মনে অনুভব করা যে আপনি আযানকে অস্বীকার করছেন—তা ঈমান নষ্ট করে না, কারণ এটি অনিচ্ছাকৃত এবং আপনার অন্তর তাতে সন্তুষ্ট নয়।
  • কালেমা (সুবহানাল্লাহ ইত্যাদি) পড়ার পর "না" বলা এবং মনে মনে অনুভব করা যে আপনি তা অস্বীকার করছেন—এটাও ঈমানের ক্ষতি করে না একই কারণে।

আপনার জিকির চালিয়ে যান, ওয়াসওয়াসাকে উপেক্ষা করুন এবং আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা রাখুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

لَنْ يَزَالَ النَّاسُ يَتَسَاءَلُونَ حَتَّى يَقُولُوا هَذَا خَلَقَ اللَّهُ الْخَلْقَ فَمَنْ خَلَقَ اللَّهَ؟ فَمَنْ وَجَدَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَلْيَقُلْ آمَنْتُ بِاللَّهِ
"লোকে প্রশ্ন করতেই থাকবে, এমনকি তারা বলবে: আল্লাহ সৃষ্টি জগৎ সৃষ্টি করেছেন, তাহলে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছেন? তোমাদের মধ্যে কারও মনে যদি এরূপ সন্দেহ জাগে, তবে সে যেন বলে: 'আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি।'" (সহিহ মুসলিম)

অনুরূপভাবে, যখন এই সন্দেহ আসে, তখন সহজভাবে বলুন: "آمَنْتُ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ" (আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি) এবং চিন্তাটি দূর করে দিন। ইনশাআল্লাহ, আপনার ঈমান নিরাপদ থাকবে।

والله تعالى أعلم


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.