"বর্তমান জেনার কারখানা" শুধু এই বিষয়ের উপর কুরআন হাদিস থেকে বিস্তারিত আলোচনা
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আসলে আমাদের কিভাবে বিবাহ করা উচিৎ ছিল , আর আমাদের বর্তমানে বিবাহ চিত্র কেমন। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার অনুরোধ জানাচ্ছি।
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
প্রশ্নের মূল বক্তব্য: "বর্তমান বিবাহ রমরমা জিনার কারখানা" – এ বক্তব্যের সত্যতা যাচাই এবং ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহের আদর্শ চিত্র ও বর্তমান বিকৃতি নিয়ে কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা।
আপনার এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ইসলামে বিবাহ একটি ইবাদত ও পবিত্র চুক্তি, কিন্তু বর্তমান সমাজে বিবাহের নামে যে বিকৃতি ও জালিমানি চলছে, তা সত্যিই জিনার পথ প্রশস্ত করছে। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ পেশ করছি।
১. ইসলামে বিবাহের আদর্শ চিত্র
ইসলামে বিবাহের উদ্দেশ্য হলো:
- যিনা থেকে বাঁচা (সুরা আন-নূর, ২৪:৩২-৩৩)
- পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া (সুরা আর-রুম, ৩০:২১)
- পরিবার গঠন ও নৈতিক সমাজ প্রতিষ্ঠা
কুরআনের নির্দেশনা:
وَأَنكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ ۚ إِن يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
“তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিবাহ দিয়ে দাও এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎ, তাদেরও। তারা যদি দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের সচ্ছল করে দেবেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।” (সুরা আন-নূর ২৪:৩২)
হাদিসে আদর্শ বিবাহ:
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহের সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিবাহ করে। নিশ্চয়ই বিবাহ দৃষ্টি নিচু রাখে ও লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষা করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন রোজা রাখে, কারণ রোজা তার জন্য ঢাল হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪০০)
হানাফি ফিকহের আলোকে:
ইমাম আবু হানিফা (রহ) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ) বিবাহের জন্য স্বামী-স্ত্রীর সম্মতি, দুইজন পুরুষ বা এক পুরুষ ও দুই নারী সাক্ষী, মোহর নির্ধারণ এবং ওয়ালির উপস্থিতি (হানাফি মতে ওয়ালি শর্ত নয়, তবে উত্তম) – এসব শর্তের ওপর জোর দিয়েছেন। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫-১০; ফাতাওয়া উসমানি, ২/২৮৪)
বিবাহের আদর্শ পদ্ধতি (হানাফি মতে):
- সহজ-সরল পদ্ধতি, অযথা খরচ ও জাঁকজমক থেকে বিরত থাকা।
- মোহর পরিমাণ ন্যায্য ও স্ত্রীর অধিকার।
- পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে বিবাহ সম্পন্ন করা।
- বক্তৃতা-ওয়াজ, দোয়া ও দ্বীনি পরিবেশে আয়োজন।
২. বর্তমান বিবাহের চিত্র ও “জিনার কারখানা” হওয়ার কারণ
বর্তমানে বিবাহের নামে যে অপকর্ম ও জিনার পথ তৈরি হচ্ছে, তা নিম্নোক্ত কুরআন-হাদিসের আলোকে স্পষ্ট হয়:
ক. ইসলামের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে প্রেম-প্রীতি ও অবৈধ সম্পর্ক:
-
কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
“তোমরা জিনার কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।” (সুরা বনি ইসরাইল ১৭:৩২) -
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি অবৈধভাবে কোনো নারীর হাত স্পর্শ করে, কিয়ামতের দিন তার হাতে আগুনের টুকরো দেওয়া হবে।” (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৮)
বর্তমানে প্রেমের নামে গোপনে দেখা-সাক্ষাৎ, ফোন-মেসেজ, ডেটিং – এসবই জিনার সিড়ি।
খ. বিবাহের আড়ম্বর ও বাড়াবাড়ি:
-
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“সবচেয়ে বরকতময় বিবাহ হলো যার খরচ কম হয়।” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৭৪৭; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৪০৫৫) -
বর্তমানে দামি গাড়ি, হোটেলে ওয়ালিমা, বিশাল যৌতুক ও অযথা ব্যয় করা হয়। এসবই জিনার পরিবেশ তৈরি করে, কারণ:
- বাড়াবাড়ির কারণে অনেকে বিবাহ করতে পারে না, ফলে জিনায় লিপ্ত হয়।
- যৌতুকের চাপে অনেক বিবাহ ভেঙে যায়, নারীরা নির্যাতিত হয়।
গ. বিবাহ পরবর্তী সম্পর্কের অবক্ষয়:
- কুরআনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে “পোশাক” বলা হয়েছে (সুরা বাকারা ২:১৮৭) – অর্থাৎ একে অপরের আবরণ ও শান্তির মাধ্যম।
- কিন্তু বর্তমানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিশ্বাসহীনতা, পরকীয়া, ডিভোর্সের মহামারি – এসবই জিনার চিত্র।
ঘ. বিবাহ নামের অপব্যবহার (মিস ইয়ারেজ, কোর্ট ম্যারেজ, গোপনে বিবাহ):
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“বিবাহের ঘোষণা দাও, তা প্রকাশ করো।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৮৯৪) - বর্তমানে অনেক বালক-বালিকা গোপনে (জাল ওয়ালি দিয়ে) বিবাহ করে, পরে অস্বীকার করে – যা জিনার সুযোগ করে দেয়।
ঙ. নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা:
-
কুরআন বলেছে:
وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ
“তোমরা প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো প্রদর্শনী করো না।” (সুরা আল-আহযাব ৩৩:৩৩) -
বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, বিনোদন কেন্দ্রে পর্দা লঙ্ঘন করে মেলামেশা – এটাই জিনার ভিত্তি।
চ. মোহর ও নারীর অধিকার হরণ:
- কুরআনে মোহরকে ফরজ করা হয়েছে:
وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً
“তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে দিয়ে দাও।” (সুরা নিসা ৪:৪)
৩. “বিবাহ রমরমা জিনার কারখানা” বলার কারণের সংক্ষিপ্তসার
এ উক্তিটি বর্তমান সমাজের বাস্তবতাকে চিহ্নিত করে:
- বিবাহ পূর্ববর্তী অনৈতিক সম্পর্ক (প্রেম, ডেটিং) – যা সরাসরি জিনার পথ।
- বিবাহ পরবর্তী অবৈধ সম্পর্ক (পরকীয়া, প্রেমের বিয়ের পর ডিভোর্স)।
- বিবাহের আড়ম্বর ও অযথা ব্যয় – দরিদ্ররা বিবাহ থেকে বঞ্চিত হয়, ফলে জিনায় লিপ্ত হয়।
- মোহর ও নারীর অধিকার লঙ্ঘন – নারীরা নির্যাতিত হয়, তারা অন্যত্র আশ্রয় খোঁজে।
- সামাজিক পরিবেশ – টিভি-সিনেমা, মিডিয়ায় জিনার প্রচার, বিবাহকে তুচ্ছ করা।
হাদিসের ভবিষ্যদ্বাণী:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“জিনা প্রকাশ পাওয়া এমন এক সময় আসবে যে, কোনো সম্প্রদায় তাদের নেতাকে এমন ব্যক্তি বানাবে যে জিনায় লিপ্ত।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৮০৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭২২)
৪. সমাধান ও প্রতিকার
ইসলামের আদর্শে ফিরে আসার জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপ জরুরি:
- বিবাহের বয়স ও পদ্ধতি সহজ করা – দেরি না করে সামর্থ্য আসার পর বিবাহ।
- পর্দা ও লিঙ্গ পৃথকীকরণ – শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, সামাজিক মিলনে।
- যৌতুক বর্জন ও মোহর নির্ধারণ – মোহরকে গুরুত্ব দেওয়া।
- ওয়ালিমা ও বিবাহ অনুষ্ঠান সরল রাখা – সুন্নাহ অনুযায়ী।
- স্বামী-স্ত্রীর দ্বীনি শিক্ষা ও পারস্পরিক অধিকার পালন।
- বিবাহিত দম্পতির জন্য পৃথক ঘরের ব্যবস্থা এবং যেনার সুযোগ নষ্ট করা।
- সন্তানদের ছোটবেলা থেকে দ্বীনের শিক্ষা দেওয়া – যাতে তারা জিনার কুফল বুঝতে পারে।
হানাফি ফিকহের নির্দেশনা:
- ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ) লিখেছেন:
“বিবাহের সময় ওয়ালি ও সাক্ষীর উপস্থিতি আবশ্যক, যাতে পরবর্তীতে অস্বীকার না হয়।” (আল-হিদায়া, ২/৩০০) - বর্তমানে কোর্ট ম্যারেজ বা গোপন বিবাহকে বৈধ বললেও তা যিনার পথ খুলে দেয় – এজন্য তাদের থেকে দূরে থাকা জরুরি।
৫. প্রাসঙ্গিক হানাফি গ্রন্থের উদ্ধৃতি
-
রদ্দুল মুহতার (কিতাবুন নিকাহ):
“বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হলো যিনা থেকে বাঁচা এবং নিষিদ্ধ জিনিস থেকে পবিত্রতা রক্ষা করা।” (৩/৫)
-
ফাতাওয়া উসমানি (২/২৮৪):
“বর্তমানে বিবাহের নামে যে জাঁকজমক ও অযথা ব্যয় হয়, তা সুন্নাহর পরিপন্থী এবং দরিদ্রদের বিবাহ থেকে দূরে রাখে।”
উপসংহার
আল্লাহ আমাদের বিবাহের পবিত্রতা রক্ষা করার তাওফিক দান করুন এবং যিনার সব রাস্তা বন্ধ করুন।