"বর্তমান জেনার কারখানা" শুধু এই বিষয়ের উপর কুরআন হাদিস থেকে বিস্তারিত আলোচনা

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 1383
Questioner: MD. SHAHARIAR PARVEZ
Question Asked: 08 Jun 2026, 08:03 PM
Reviewed & Published: 08 Jun 2026, 09:00 PM
Views: 65
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আচ্ছালামু আলাইকুম । প্রিয় শায়েখের কাছে আজকে কোনো প্রশ্ন না, "বর্তমান বিবাহ একটা রমরমা জেনার কারখানা" শুধু এই বিষয়ের উপর কুরআন হাদিস থেকে একটি বিস্তারিত আলোচনা চাচ্ছি। আমি এই বিষয়ে মানুষের সামনে আলোচনা পৌঁছে দিতে চাই।
আসলে আমাদের কিভাবে বিবাহ করা উচিৎ ছিল , আর আমাদের বর্তমানে বিবাহ চিত্র কেমন। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

প্রশ্নের মূল বক্তব্য: "বর্তমান বিবাহ রমরমা জিনার কারখানা" – এ বক্তব্যের সত্যতা যাচাই এবং ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহের আদর্শ চিত্র ও বর্তমান বিকৃতি নিয়ে কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা।

আপনার এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ইসলামে বিবাহ একটি ইবাদত ও পবিত্র চুক্তি, কিন্তু বর্তমান সমাজে বিবাহের নামে যে বিকৃতি ও জালিমানি চলছে, তা সত্যিই জিনার পথ প্রশস্ত করছে। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ পেশ করছি।


১. ইসলামে বিবাহের আদর্শ চিত্র

ইসলামে বিবাহের উদ্দেশ্য হলো:

  • যিনা থেকে বাঁচা (সুরা আন-নূর, ২৪:৩২-৩৩)
  • পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া (সুরা আর-রুম, ৩০:২১)
  • পরিবার গঠন ও নৈতিক সমাজ প্রতিষ্ঠা

কুরআনের নির্দেশনা:

وَأَنكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ ۚ إِن يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
“তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিবাহ দিয়ে দাও এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎ, তাদেরও। তারা যদি দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের সচ্ছল করে দেবেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।” (সুরা আন-নূর ২৪:৩২)

হাদিসে আদর্শ বিবাহ:

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
    “যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহের সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিবাহ করে। নিশ্চয়ই বিবাহ দৃষ্টি নিচু রাখে ও লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষা করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন রোজা রাখে, কারণ রোজা তার জন্য ঢাল হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪০০)

হানাফি ফিকহের আলোকে:
ইমাম আবু হানিফা (রহ) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ) বিবাহের জন্য স্বামী-স্ত্রীর সম্মতি, দুইজন পুরুষ বা এক পুরুষ ও দুই নারী সাক্ষী, মোহর নির্ধারণ এবং ওয়ালির উপস্থিতি (হানাফি মতে ওয়ালি শর্ত নয়, তবে উত্তম) – এসব শর্তের ওপর জোর দিয়েছেন। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫-১০; ফাতাওয়া উসমানি, ২/২৮৪)

বিবাহের আদর্শ পদ্ধতি (হানাফি মতে):

  • সহজ-সরল পদ্ধতি, অযথা খরচ ও জাঁকজমক থেকে বিরত থাকা।
  • মোহর পরিমাণ ন্যায্য ও স্ত্রীর অধিকার।
  • পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে বিবাহ সম্পন্ন করা।
  • বক্তৃতা-ওয়াজ, দোয়া ও দ্বীনি পরিবেশে আয়োজন।

২. বর্তমান বিবাহের চিত্র ও “জিনার কারখানা” হওয়ার কারণ

বর্তমানে বিবাহের নামে যে অপকর্ম ও জিনার পথ তৈরি হচ্ছে, তা নিম্নোক্ত কুরআন-হাদিসের আলোকে স্পষ্ট হয়:

ক. ইসলামের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে প্রেম-প্রীতি ও অবৈধ সম্পর্ক:

  • কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:

    وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
    “তোমরা জিনার কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।” (সুরা বনি ইসরাইল ১৭:৩২)

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
    “যে ব্যক্তি অবৈধভাবে কোনো নারীর হাত স্পর্শ করে, কিয়ামতের দিন তার হাতে আগুনের টুকরো দেওয়া হবে।” (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৮)

বর্তমানে প্রেমের নামে গোপনে দেখা-সাক্ষাৎ, ফোন-মেসেজ, ডেটিং – এসবই জিনার সিড়ি।

খ. বিবাহের আড়ম্বর ও বাড়াবাড়ি:

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
    “সবচেয়ে বরকতময় বিবাহ হলো যার খরচ কম হয়।” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৭৪৭; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৪০৫৫)

  • বর্তমানে দামি গাড়ি, হোটেলে ওয়ালিমা, বিশাল যৌতুক ও অযথা ব্যয় করা হয়। এসবই জিনার পরিবেশ তৈরি করে, কারণ:

    • বাড়াবাড়ির কারণে অনেকে বিবাহ করতে পারে না, ফলে জিনায় লিপ্ত হয়।
    • যৌতুকের চাপে অনেক বিবাহ ভেঙে যায়, নারীরা নির্যাতিত হয়।

গ. বিবাহ পরবর্তী সম্পর্কের অবক্ষয়:

  • কুরআনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে “পোশাক” বলা হয়েছে (সুরা বাকারা ২:১৮৭) – অর্থাৎ একে অপরের আবরণ ও শান্তির মাধ্যম।
  • কিন্তু বর্তমানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিশ্বাসহীনতা, পরকীয়া, ডিভোর্সের মহামারি – এসবই জিনার চিত্র।

ঘ. বিবাহ নামের অপব্যবহার (মিস ইয়ারেজ, কোর্ট ম্যারেজ, গোপনে বিবাহ):

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
    “বিবাহের ঘোষণা দাও, তা প্রকাশ করো।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৮৯৪)
  • বর্তমানে অনেক বালক-বালিকা গোপনে (জাল ওয়ালি দিয়ে) বিবাহ করে, পরে অস্বীকার করে – যা জিনার সুযোগ করে দেয়।

ঙ. নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা:

  • কুরআন বলেছে:

    وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ
    “তোমরা প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো প্রদর্শনী করো না।” (সুরা আল-আহযাব ৩৩:৩৩)

  • বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, বিনোদন কেন্দ্রে পর্দা লঙ্ঘন করে মেলামেশা – এটাই জিনার ভিত্তি।

চ. মোহর ও নারীর অধিকার হরণ:

  • কুরআনে মোহরকে ফরজ করা হয়েছে:

    وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً
    “তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে দিয়ে দাও।” (সুরা নিসা ৪:৪)


৩. “বিবাহ রমরমা জিনার কারখানা” বলার কারণের সংক্ষিপ্তসার

এ উক্তিটি বর্তমান সমাজের বাস্তবতাকে চিহ্নিত করে:

  1. বিবাহ পূর্ববর্তী অনৈতিক সম্পর্ক (প্রেম, ডেটিং) – যা সরাসরি জিনার পথ।
  2. বিবাহ পরবর্তী অবৈধ সম্পর্ক (পরকীয়া, প্রেমের বিয়ের পর ডিভোর্স)।
  3. বিবাহের আড়ম্বর ও অযথা ব্যয় – দরিদ্ররা বিবাহ থেকে বঞ্চিত হয়, ফলে জিনায় লিপ্ত হয়।
  4. মোহর ও নারীর অধিকার লঙ্ঘন – নারীরা নির্যাতিত হয়, তারা অন্যত্র আশ্রয় খোঁজে।
  5. সামাজিক পরিবেশ – টিভি-সিনেমা, মিডিয়ায় জিনার প্রচার, বিবাহকে তুচ্ছ করা।

হাদিসের ভবিষ্যদ্বাণী:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“জিনা প্রকাশ পাওয়া এমন এক সময় আসবে যে, কোনো সম্প্রদায় তাদের নেতাকে এমন ব্যক্তি বানাবে যে জিনায় লিপ্ত।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৮০৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭২২)


৪. সমাধান ও প্রতিকার

ইসলামের আদর্শে ফিরে আসার জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপ জরুরি:

  1. বিবাহের বয়স ও পদ্ধতি সহজ করা – দেরি না করে সামর্থ্য আসার পর বিবাহ।
  2. পর্দা ও লিঙ্গ পৃথকীকরণ – শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, সামাজিক মিলনে।
  3. যৌতুক বর্জন ও মোহর নির্ধারণ – মোহরকে গুরুত্ব দেওয়া।
  4. ওয়ালিমা ও বিবাহ অনুষ্ঠান সরল রাখা – সুন্নাহ অনুযায়ী।
  5. স্বামী-স্ত্রীর দ্বীনি শিক্ষা ও পারস্পরিক অধিকার পালন
  6. বিবাহিত দম্পতির জন্য পৃথক ঘরের ব্যবস্থা এবং যেনার সুযোগ নষ্ট করা।
  7. সন্তানদের ছোটবেলা থেকে দ্বীনের শিক্ষা দেওয়া – যাতে তারা জিনার কুফল বুঝতে পারে।

হানাফি ফিকহের নির্দেশনা:

  • ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ) লিখেছেন:
    “বিবাহের সময় ওয়ালি ও সাক্ষীর উপস্থিতি আবশ্যক, যাতে পরবর্তীতে অস্বীকার না হয়।” (আল-হিদায়া, ২/৩০০)
  • বর্তমানে কোর্ট ম্যারেজ বা গোপন বিবাহকে বৈধ বললেও তা যিনার পথ খুলে দেয় – এজন্য তাদের থেকে দূরে থাকা জরুরি।

৫. প্রাসঙ্গিক হানাফি গ্রন্থের উদ্ধৃতি

  • রদ্দুল মুহতার (কিতাবুন নিকাহ):

    “বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হলো যিনা থেকে বাঁচা এবং নিষিদ্ধ জিনিস থেকে পবিত্রতা রক্ষা করা।” (৩/৫)

  • ফাতাওয়া উসমানি (২/২৮৪):

    “বর্তমানে বিবাহের নামে যে জাঁকজমক ও অযথা ব্যয় হয়, তা সুন্নাহর পরিপন্থী এবং দরিদ্রদের বিবাহ থেকে দূরে রাখে।”

উপসংহার

আল্লাহ আমাদের বিবাহের পবিত্রতা রক্ষা করার তাওফিক দান করুন এবং যিনার সব রাস্তা বন্ধ করুন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.