বিয়ে না করতে চাওয়া প্রসঙ্গে
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
তাছড়া এখব সবাই শুধু অর্থ সম্পদই দেখে। আমি এমন কোনো জীবনসঙ্গীনি চাইনা যে টাকা দেখে আসবে।
Answer
উত্তর
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম: আপনি ২৮ বছর বয়সী পুরুষ, বিয়ের চেষ্টা করছেন কিন্তু সফল হচ্ছেন না। যৌবনের প্রধান ১২ বছর পার হয়ে গেছে মনে করে আপনি আর বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পাশাপাশি আপনার অভিযোগ, আজকাল সবাই সম্পদ দেখে বিয়ে করে, তাই আপনি এমন জীবনসঙ্গী চান না যে টাকার জন্য আসবে।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করে আমরা নিম্নোক্ত পরামর্শ দিচ্ছি:
১. বিয়ে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ও প্রয়োজন
বিয়ে করা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নত এবং ঈমানের অর্ধেক পূর্ণতা লাভের মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَنكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ ۚ إِن يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
"তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে সৎলোকদের বিয়ে দাও। তারা যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।" (সূরা আন-নূর ২৪:৩২)
হাদীসে এসেছে:
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ، مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ
"হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখে, তাদের উচিত বিয়ে করা। কেননা তা দৃষ্টি নিচু রাখে এবং লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষা করে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫০৬৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৪০০)
হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ বলা হয়েছে:
إذا خاف على نفسه الزنا وجب عليه التزويج وإن لم يخف فمندوب
"যদি কেউ নিজের জন্য যিনার আশঙ্কা করে, তাহলে তার উপর বিয়ে করা ওয়াজিব। আর যদি এমন আশঙ্কা না থাকে, তবে মুস্তাহাব (সুন্নত)।" (ইবনে আবিদীন, রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৪৬)
আপনি ২৮ বছর বয়সী। সাধারণত ১২ বছর বয়সে বালেগ হওয়ার পর ১২ বছর যৌবন শেষ হয়েছে—এমন ধারণা সঠিক নয়। ২৮ বছর বয়সে এখনো বিয়ের উপযুক্ত সময়। বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী হতে পারে, বিশেষ করে যদি আপনার মধ্যে শারীরিক চাহিদা বিদ্যমান থাকে।
২. বিয়ে করতে না পারার কারণ ও সমাধান
আপনি বলেছেন, "বিয়ের চেষ্টা করছি অনেক, হয়না।" এর পেছনে কিছু বাস্তব কারণ থাকতে পারে:
- অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা: ইসলাম বিয়েতে অতিরিক্ত অর্থ বা জাঁকজমক জরুরি করেনি। ন্যূনতম মোহর ও স্ত্রীর ভরণপোষণের সামর্থ্য থাকলেই বিয়ে করা যায়। আল্লাহ তাআলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন:
إِن يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ
"তারা যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করবেন।" (সূরা আন-নূর ২৪:৩২)
- অতিরিক্ত শর্ত: পাত্রী নির্বাচনে উচ্চশিক্ষা, সম্পদ, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদির পরিবর্তে দ্বীনদারি ও সচ্চরিত্রকে অগ্রাধিকার দিন। হাদীসে এসেছে:
تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ
"নারীকে চারটি গুণের জন্য বিয়ে করা হয়: সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য ও দ্বীন। তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও—তোমার হাত ধুলিমাখিত হোক।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫০৯০; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৪৬৬)
- দুআ ও তাওয়াক্কুল: বিয়ে পেতে বেশি বেশি দুআ করুন, বিশেষ করে এই দুআটি:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ
"হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানদের পক্ষ থেকে চোখের শীতলতা দান করুন।" (সূরা আল-ফুরকান ২৫:৭৪)
ফাতাওয়া উসমানীতে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি বিয়েতে বিলম্বের সম্মুখীন হয়, তার জন্য উচিত ইস্তিগফার ও সদকা বৃদ্ধি করা। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৭৪)
৩. শুধু সম্পদ দেখে বিয়ে করার প্রবণতা ও আপনার অবস্থান
আপনি বলেছেন, "তাছড়া এখব সবাই শুধু অর্থ সম্পদই দেখে। আমি এমন কোনো জীবনসঙ্গীনি চাইনা যে টাকা দেখে আসবে।"
এটি একটি প্রশংসনীয় মনোভাব। ইসলামে নারীর পছন্দের ক্ষেত্রে দ্বীনদারি ও চরিত্রই মুখ্য। পাত্রীর পরিবারের কাছে আপনার দ্বীনদারি ও সচ্চরিত্র তুলে ধরুন। যদি তারা শুধু অর্থ সম্পদ দেখে, তবে তাদের সাথে বিয়ে জরুরি নয়; অন্য কোনো সৎ পরিবারের সন্ধান করুন।
ইমাম ইবনে আবিদীন রহ. বলেন:
ينبغي للرجل أن يختار المرأة ذات الدين والخلق الحسن، فإنها خير متاع الدنيا
"পুরুষের উচিত দ্বীনদার ও সচ্চরিত্রা নারীকে বেছে নেওয়া। কেননা সে দুনিয়ার সর্বোত্তম সম্পদ।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫৫)
আপনার উচিত এমন পাত্রী খোঁজা যার পরিবার দ্বীনকে প্রাধান্য দেয়। এজন্য মসজিদের ইমাম, আলেম বা বিশ্বস্ত লোকের সাহায্য নিতে পারেন।
৪. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত সঠিক নয়
আপনি "আর বিয়ে করবোনা" ভেবেছেন। যদি আপনার মধ্যে যৌন চাহিদা থাকে এবং বিয়ের সামর্থ্য থাকে, তাহলে বিয়ে না করা গুনাহের কারণ হতে পারে। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে:
مَنْ قَدَرَ عَلَى بَاءَةٍ وَلَمْ يَتَزَوَّجْ فَلَيْسَ مِنَّا
"যে ব্যক্তি বিয়ের সামর্থ্য রাখে অথচ বিয়ে করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ২২৬৫; ইমাম বায়হাকী, শুআবুল ঈমান)
তবে সম্মানিত হানাফী ফকীহগণ বলেন, যদি বিয়েতে অক্ষমতা থাকে (যেমন: আর্থিক সংকট বা উপযুক্ত পাত্রী না পাওয়া), তাহলে বিলম্ব করা জায়েয, তবে চিরতরে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৮৯)
আপনার উচিত দুআ ও তাওয়াক্কুলের সাথে বিয়ের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
৫. কিছু বাস্তব পরামর্শ
- দ্বীনদার পাত্রীর সন্ধান: শুধু সম্পদ বা রূপ নয়, বরং দ্বীনদারি ও ভালো চরিত্রকে প্রাধিকার দিন।
- নিজেকে যোগ্য করে তোলা: দ্বীনি জ্ঞান অর্জন, চরিত্র সংশোধন, হালাল উপার্জনে মনোযোগী হোন।
- পরিবার ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করুন: নিজে চেষ্টা করে না পেলে বাবা-মা, মুরব্বি বা আলেমদের মাধ্যমে বিয়ের উদ্যোগ নিন।
- সালাতুল হাজত ও দুআ: নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ুন এবং বিয়ের জন্য বিশেষ দুআ করুন।
- সবর ও শোকর: বিলম্বকে আল্লাহর পরীক্ষা মনে করে ধৈর্য ধরুন। আল্লাহ বলেন:
وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ
"হয়তো তোমরা এমন কিছু অপছন্দ করছ যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।" (সূরা আল-বাকারা ২:২১৬)
সংক্ষিপ্ত উত্তর
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ে করা সুন্নত ও প্রয়োজন। ২৮ বছর বয়সে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়, বিশেষ করে যদি আপনার শারীরিক চাহিদা থাকে। বিয়েতে বিলম্ব হলে হতাশ না হয়ে দ্বীনদার পাত্রীর সন্ধান চালিয়ে যান, দুআ করুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। সম্পদই সবকিছু নয়—দ্বীন ও চরিত্রই আসল সম্পদ। তাই নিজের যোগ্যতা বাড়ান এবং সৎ জীবনসঙ্গী পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যান। আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম বন্দোবস্ত করবেন, ইনশাআল্লাহ।
রেফারেন্স সমূহ:
- কুরআন: সূরা আন-নূর (২৪:৩২), সূরা আল-ফুরকান (২৫:৭৪)
- হাদীস: সহীহ বুখারী (৫০৬৬, ৫০৯০), সহীহ মুসলিম (১৪০০, ১৪৬৬), মুসনাদে আহমাদ (২২৬৫)
- হানাফী ফিকহ: রদ্দুল মুহতার (৩/৫৪৬, ৩/৫৫৫), ফাতাওয়া উসমানী (২/৩৭৪), ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৮৯)
- আধুনিক ফাতাওয়া: ইসলামী ফিকহ একাডেমি, দারুল উলুম দেওবন্দের ফাতাওয়া
মেটা বর্ণনা:
SEO কীওয়ার্ড: বিয়ে না করা, ২৮ বছর বয়সে বিয়ে, ইসলামে বিয়ের গুরুত্ব, সম্পদ দেখে বিয়ে, দ্বীনদার পাত্রী, হানাফী ফিকহ, বিয়ে নিয়ে হতাশা, বিয়ের দুআ।
সার্চ ফ্রেজ:
- ২৮ বছর বয়সে বিয়ে করা জরুরি কি?
- বিয়ে না করার ইসলামী বিধান
- শুধু টাকা দেখে বিয়ে করলে কি হবে?
- বিয়ে করতে না পারলে করণীয়
- হানাফী মাজহাবে বিয়ের ফিকহ
- জীবনসঙ্গী নির্বাচনে সম্পদ vs দ্বীন