সমাজে মুসলিম নামের কিছু মুশরিক রয়েছে? এ ধরণের কথাবার্তা কি সঠিক?

Faith and Belief · Hanafi

Questioner: Meraj Melody
Question Asked: 31 May 2026, 08:34 PM
Reviewed & Published: 31 May 2026, 09:17 PM
Views: 11
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ফেসবুক থেকে এটা কালেক্ট করা, এই তথ্য গুলা কি সঠিক?
( মুসলিম নামে মুশরিক (নামে মুসলিম কিন্তু কাফের) এদের যত হাজার বুঝান, এরা যুক্তি দিয়েই যাবে। যেকোনো একটা হুজুরদের করা কবিরাহ গুনাহ দিয়ে কুরআনের আইনের বিরোধিতা করবে। কাফের হচ্ছে শত্রু, কিন্তু মুসলিম নামে মুশরিকরা আরও ভয়ংকর। এজন্য আল্লাহতালা এসব মুশরিকদের জন্য সর্বশেষ ৭ নম্বর দোযখ রেখেছেন, যেখানে খ্রিস্টান অথবা হিন্দুরা যাবে না, যাবে মুসলিম নামে মুশরিকরা এবং চিরস্থায়ী থেকে যাবে। আমাদের উচিত এদের পেছনে সময় নষ্ট না করা। আমরা আমাদের আমল আল্লাহর নির্দেশ পালন করে যাবো, এসব মুসলিম নামের মুশরিকরা তারা তাদের কাজ করে যাবে।

Answer

প্রশ্নের উত্তর

আপনার দেওয়া ফেসবুক পোস্টটিতে কিছু গুরুতর ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য রয়েছে যা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের পরিপন্থী। নিচে বিন্দু বিন্দু বিশ্লেষণ ও উত্তর দেওয়া হল:

১. ‘মুসলিম নামে মুশরিক’ বা ‘নামে মুসলিম কিন্তু কাফের’ বলার ভুল

  • সঠিক আকীদা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের (যার অনুসারী হানাফী মাযহাব) মতে, যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ পড়ে এবং ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো মেনে চলে, তাকে শুধুমাত্র কবীরা গুনাহের কারণে ‘মুশরিক’ বা ‘কাফের’ বলা জায়েয নয়। এটি খারেজী ও মু‘তাযিলা ফিরকার ভ্রান্ত মতবাদ।
  • ইবনু আবেদীন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’ (৩/২৭৩) এ স্পষ্ট বলেছেন: “যে ব্যক্তি কাবীরা গুনাহ করে, তাকে কাফের বলা যাবে না, বরং সে ঈমানদার কিন্তু ফাসিক।” (وأما مرتكب الكبيرة فليس بكافر عند أهل السنة بل هو مؤمن فاسق)
  • ইমাম তাহাবী (রহ.) ‘আল-আকীদাতুত তাহাবীয়্যা’ তে বলেন: “আমরা কবীরা গুনাহের কারণে কোনো মুসলিমকে কাফের বলি না, যতক্ষণ না সে হালাল মনে করে।” (ولا نكفر أحداً من أهل القبلة بذنب ما لم يستحله)

উপসংহার: ফেসবুক পোস্টে যাদের ‘মুসলিম নামে মুশরিক’ বলা হয়েছে, তারা প্রকৃতপক্ষে মুসলিমই। তাদেরকে কাফের বা মুশরিক বলা নিজেই কুফরীর পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে। (দেখুন: ফাতাওয়া উসমানী, ১/২৭৬; ফাতাওয়া শামী, ৪/২২৪)

২. ‘সর্বশেষ ৭ নম্বর দোযখ’ এবং ‘শুধু মুসলিম নামে মুশরিকরা যাবে’—এ কথার ভিত্তিহীনতা

  • কুরআন ও হাদীসে জাহান্নামের স্তর (দরজা) উল্লেখ আছে, কিন্তু কোনো আয়াত বা সহীহ হাদীসে বলা হয়নি যে ‘সপ্তম স্তর’ শুধুমাত্র ‘মুসলিম নামধারী মুশরিকদের’ জন্য এবং সেখানে খ্রিস্টান বা হিন্দুরা যাবে না। এটি সম্পূর্ণ মনগড়া কথা।
  • কুরআনে এসেছে: “নিশ্চয় জাহান্নামের উপর সাতটি দরজা আছে; প্রতিটি দরজার জন্য নির্ধারিত আছে এক পৃথক দল।” (সূরা হিজর, ১৫:৪৪) — এখানে ‘দল’ বলতে কাফের, মুশরিক, মুনাফিক প্রভৃতি শ্রেণীকে বোঝানো হয়েছে, কোনো বিশেষ উপদলকে নয়।
  • সাহীহ হাদীসে জাহান্নামের স্তরগুলো পাপের মাত্রা অনুযায়ী বণ্টিত, যেমন মুশরিকদের জন্য প্রথম স্তর, মুনাফিকদের জন্য সর্বনিম্ন স্তর ইত্যাদি। তবে ‘মুসলিম নামধারী’ বলার কোনো ভিত্তি নেই। বরং যে মুসলিম কাবীরা গুনাহ করে এবং তওবা না করে মারা যায়, সে যদি ঈমান নিয়ে মরে (অর্থাৎ ইসলামের মৌলিক বিষয় অস্বীকার না করে), তবে সে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে না; কিছু শাস্তির পর জাহান্নাম থেকে বেরিয়ে আসবে। (বুখারী, ৪০৪০; মুসলিম, ১৮৫)

উপসংহার: পোস্টের বক্তব্য যে ‘খ্রিস্টান বা হিন্দুরা যাবে না, শুধু মুসলিম নামের মুশরিকরা যাবে’ — এটি কুরআন-সুন্নাহর বিপরীত। বরং কাফেরদের (যে কোনো ধর্মের) জন্যই জাহান্নাম চিরস্থায়ী। আর মুসলিমদের কাবীরা গুনাহের শাস্তি অস্থায়ী।

৩. ‘হুজুরদের কবীরা গুনাহ’ ও ‘যুক্তি দিয়েই যাবে’—এ কথার জবাব

  • পোস্টটি ‘হুজুর’ (আলিম) বলতে যাদেরকে ইঙ্গিত করছে, তাদেরকে অযথা অপবাদ দিচ্ছে। ইসলামী আলিমগণ কুরআন-হাদীসের দলীল দিয়েই মানুষকে বোঝান। তাঁদের বিরুদ্ধে ‘কবীরা গুনাহ’ আরোপ করে ফতোয়া বানানো নাজায়েয।
  • কোনো আলিম যদি ভুল করেন, তাকে মিথ্যা অপবাদ না দিয়ে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সংশোধন করা উচিত। কিন্তু পোস্টটি সব আলিমকে ‘মুশরিক’ আখ্যা দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

৪. ‘এদের পেছনে সময় নষ্ট না করা’—এ কথার মূল্যায়ন

  • ইসলামে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে গুনাহগার মুসলিমদের নাসীহাত (উপদেশ) দেওয়ার, তাদের দাওয়াত দেওয়ার। যেমন কুরআনে “তোমরা কল্যাণের দিকে আহ্বান কর এবং সৎকর্মের আদেশ দাও, অসৎকর্মে নিষেধ কর” (আল-ইমরান, ৩:১০৪)।
  • তবে যদি কেউ স্পষ্ট বিদ‘আতে লিপ্ত থাকে বা দাওয়াত বর্জন করে, তবে তার সঙ্গ ত্যাগ করা যেতে পারে। কিন্তু এখানে যেভাবে ‘মুসলিম নামের মুশরিক’ বলে দায়িত্ব শেষ করার কথা বলা হয়েছে, তা উলামায়ে কিরামের পদ্ধতি নয়।

সংক্ষিপ্ত ফাতাওয়া

হানাফী ফিকহের গ্রহণযোগ্য ফতোয়া:

  • কোনো মুসলিমকে শুধুমাত্র কবীরা গুনাহের কারণে কাফের বা মুশরিক বলা জায়েজ নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৪/২২৪; মাজমু‘উল ফাতাওয়া, ২/২২৪)
  • যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ পড়ে এবং ইসলামের রুকনসমূহ মেনে চলে, তার নামায-রোযা ত্যাগ বা যেকোনো কবীরা গুনাহ তাকে ইসলাম থেকে খারিজ করে না (যতক্ষণ না সে হালাল মনে করে অথবা কুফরী কথা বলে)।
  • জাহান্নামের স্তর কুরআন-হাদীসে নির্ধারিত। সপ্তম স্তর সম্পর্কে কোনো সহীহ বর্ণনা নেই যে সেখানে শুধু ‘মুসলিম নামের মুশরিকরা’ যাবে এবং অন্য কাফেররা যাবে না। বরং সর্বস্তরের কাফেরদের স্থান জাহান্নাম। (সূরা বাকারা, ২:২৪; সূরা কাহফ, ১৮:১০২)

ফেসবুক পোস্টটি কি সঠিক?

না, পোস্টটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর। এটি খারেজী ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর মতবাদ প্রচার করছে, যা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের (হানাফী, শাফেয়ী, মালিকী, হাম্বলী) আকীদার পরিপন্থী। এই ধরনের পোস্ট থেকে সাবধান থাকা এবং অন্যদেরকে সতর্ক করা জরুরী।

প্রস্তাবিত পদক্ষেপ

  • উক্ত পোস্টটি শেয়ার না করা এবং অন্যদেরকে এর ভুল বুঝানো।
  • ইসলাম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে জ্ঞান অর্জন করা: যেমন সুলতানুল মাদারিস, দারুল উলুম দেওবন্দ বা বাংলাদেশের স্বীকৃত ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট।
  • কোনো ফতোয়া বা আকীদার ব্যাপারে সন্দেহ থাকলে সরাসরি আলিমের পরামর্শ নেওয়া।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.