এনজিও চাকুরী করতে মজবুর হলে করণীয় কি?

Family Life · Hanafi

Questioner: Sonia Ety
Question Asked: 31 May 2026, 08:09 AM
Reviewed & Published: 31 May 2026, 12:36 PM
Views: 102
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম
আমি একটা এঞ্জিও তে চাকরি করি ফিল্ড এ গত ৭ মাস ধরে।।আমি সামি বেকার হওয়ায় বাধ্য হয়ে এটা করতে হচ্ছে।কিন্তু আমি মনে মনে খুব কস্টে আছি।এটার কারনে আমার নামাজ কুরান সব গ্যাপ পরে গেছে।মেয়েও সময় কম পায়।কিন্তু এখন এটা ছাড়লে আমি আবার বিপদে পরবো।তাছারা এটার কারনে ১টা বল আছে আমাদের মা মেয়ের।।না হয় সবসময় স্বামী সসুর বারিতে তুচ্ছতাচ্ছিল্য হতে জয় ১১বছর ধরে।।আমি ঠিক ভাবে বুঝাতে পারতেছিনা কিন্তু আমি প্রতিনিয়ত খুব মানসিক কস্টে আছি।।না পারতে সুদের চাকরি করছি ছারতে চাইলেও সামি তার পরিবার আর তার অলসতা ও বেকারত্তের কারনে পারতেছিনা।।এটা ছারলে আবার আমাকে আস্তে যাইতে লাথি খেতে হবে।।আর কোন চাক্রিও কোনভাবেই হচ্চেনা কত চেষ্টা করছি।।আর অনেক হিন্দুদের সাথে কাজ করতে হয় তাদের পুজা আওয়াজ গুলা শুধু মাথায় ঘুরে সবসময় দেখতে দেখতে।।কত পুরুশের সাথে কথা বলতে হয় আমার খুব মনে কস্ট হয় না পারতেও বলতে হয়।।
আমার জন্য ১টা সমাধান বলুন কি করবো আমি।।সামির কাছে আমি জান দিয়ে করেও টিস্যুর দাম ও নাই।।মরলেও তার কিছু যায় আসেনা।।।সে সারাক্ষণ শুধু ঘুম আড্ডা তার পরিবার মোবাইল এগুলা নিয়ে ব্যস্ত।।কিছু বলতে/বুঝাতে গেলেই ঝগড়া
আর সারাক্ষণ শুধু আমি এই চিন্তায় থাকি আমার ইনকাম কি হালাল হচ্ছে যেহেতু এঞ্জিও চাকরি আবার সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়।।এই ইনকাম কি আল্লাহ নিবেন??
আর এই টাকা জমালে কি আমার হজের জন্য সেটা হালাল হবেন??
নাকি সুদের চাকরি যে সব হারাম। অনেকে বলে আমরা তো রক্ত মাংস পানি করে সারাদিন ঘাম ঝরাই কাজ করে খাই, এটা হারাম হবে না।।

Answer

وعلیکم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার কষ্ট ও অবস্থা আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারছি। আপনি একাধিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন—স্বামীর বেকারত্ব ও উদাসীনতা, শ্বশুরবাড়ির তাচ্ছিল্য, নিজের চাকরির কারণে দ্বীনি আমল ও সন্তানের প্রতি অবহেলা, আর সবচেয়ে বড় কথা—এই উপার্জন কি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য? নিচে আমরা কোরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেব এবং ব্যবহারিক সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করব।


১. এনজিও চাকরি (যা সুদের সাথে জড়িত) এবং হিন্দু পরিবেশে কাজ করার হুকুম

আপনি বলেছেন, এটি সুদের চাকরি। সাধারণত এদেশের অনেক এনজিও সুদভিত্তিক মাইক্রোক্রেডিট বা সঞ্চয়-ঋণ প্রকল্প চালায়, যা স্পষ্ট হারাম

  • কোরআনে বলা হয়েছে, "আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন" (সূরা বাকারা: ২৭৬)।
  • হাদিসে এসেছে, "সুদখোর, সুদগ্রহীতা, এর লেখক ও সাক্ষী—সবার ওপরই লানত" (মুসলিম)।
  • ইবনে আবেদিন শামী (রহ.) লিখেছেন, "সুদভিত্তিক লেনদেনে কোনো অংশগ্রহণই জায়েয নয়, যদিও তা অন্যের পক্ষে করা হয়" (রদ্দুল মুহতার, ৫/১৬৫)।

এছাড়া আপনি বলেছেন, হিন্দুদের পূজার আওয়াজ শুনতে হয় এবং পুরুষদের সাথে কথা বলতে হয়—এটাও শরিয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয কাজের পরিবেশ।

  • যে পরিবেশে নামাজ ও কুরআন তেলাওয়াত থেকে গাফিলতি হয়, সেই চাকরি অবশ্যই ত্যাগ করা জরুরি। আল্লাহ বলেন, "তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো ফিতনা (পরীক্ষা)" (সূরা তাগাবুন: ১৫)।

তবে জরুরত বা প্রয়োজনের ক্ষেত্রে হুকুম ভিন্ন।

  • হানাফি ফিকহের মূলনীতি: اضطرار (অনিবার্য প্রয়োজন) হারামকে জায়েয করে, কিন্তু তার সীমা নির্ধারিত। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, অনাহারে মৃত্যুর আশঙ্কা হলে সুদের কাজ করাও জায়েয হবে কেবল প্রাণ বাঁচানোর পরিমাণ (শরহু মাআনিল আসার, ২/৪০; রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯২)।
  • আপনার বর্তমান অবস্থায় আপনি পুরোপুরি অনাহারে নন। আপনার স্বামী বেকার হলেও আপনার মা-মেয়ে ও নিজের জীবন রক্ষার জন্য এই উপার্জন প্রয়োজন—এটা সীমিত জরুরত বলে গণ্য হতে পারে, তবে তা শুধু খানা-পিনা ও নিত্য প্রয়োজন মেটানোর জন্য জায়েয, বিলাস বা সঞ্চয়ের জন্য নয়।

২. এই উপার্জনে হজ করা কি জায়েয?

না, সুদের টাকায় হজ করা জায়েয নয়।

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, যে ব্যক্তি সুদের অর্থ দিয়ে হজ করে, তার হজ আদায় হলেও গুনাহ থেকে মুক্তি পাবে না এবং সওয়াব নষ্ট হবে (আল-হিদায়া, ২/৫৫০)।
  • বরং আপনার কর্তব্য: সুদী উপার্জন যতটুকু হয়েছে, তার তওবা করুন এবং ভবিষ্যতে আর সুদের কাজে লিপ্ত হবেন না। হজের জন্য শুধু হালাল অর্থ জমা করুন।

৩. আপনার স্বামী ও পারিবারিক অবস্থার সমাধান

আপনার স্বামী আপনার প্রতি দায়িত্বশীল নয়, অলস, এবং আপনার কথা মানে না—এটা শরিয়তে তার বড় গুনাহ

  • নবী (সা.) বলেন, "তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে" (বুখারি, ৮)।
  • আপনি ১১ বছর ধরে তুচ্ছতাচ্ছিল্য সহ্য করছেন, কিন্তু ধৈর্যের সীমা আছে
  • ব্যবহারিক পদক্ষেপ:
    • এলাকার একজন আলেম বা পারিবারিক সালিশের মাধ্যমে স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
    • যদি সে একেবারেই উপার্জন না করে এবং আপনার প্রতি জুলুম করে, তাহলে আপনি খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাক) নিতে পারেন। তবে সেটা শেষ বিকল্প।
    • নিজের জন্য হালাল উপার্জনের পথ খুঁজতে থাকুন। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন—তিনি বিকল্প পথ তৈরি করবেন (সূরা তালাক: ২-৩)।

৪. আপনার করণীয় (ধাপে ধাপে সমাধান)

প্রথম ধাপ: অবিলম্বে তওবা ও ইবাদতে ফিরে আসা

  • নামাজ ও কুরআন তেলাওয়াতকে ফরজ হিসেবে নিন। ফিল্ডে থাকলেও ফরজ নামাজ ছাড়বেন না। আল্লাহ বলেন, "নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে" (সূরা আনকাবুত: ৪৫)।

দ্বিতীয় ধাপ: হালাল চাকরির খোঁজ করা

  • বর্তমান চাকরি ছেড়ে দেওয়া আপনার জন্য ওয়াজিব যদি আপনি অন্য হালাল কাজের সুযোগ পান। বর্তমানে না পেলেও নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যান
  • আপনার দক্ষতা অনুযায়ী অনলাইন বা হোম ভিত্তিক কাজ (যেমন: সেলাই, টিউশনি, কন্টেন্ট রাইটিং) করতে পারেন—এতে পর্দা ও নামাজ রক্ষা সহজ হবে।

তৃতীয় ধাপ: বর্তমান চাকরিতে সাময়িকভাবে সীমিত রাখা

  • যদি বিকল্প না পান এবং প্রাণ বাঁচানোর প্রয়োজনে এই চাকরি করতে বাধ্য হন, তাহলে শর্ত মেনে চলুন:
    • ফরজ নামাজের সময় যেকোনো উপায়ে আদায় করবেন (মাঠে বা অফিসে)।
    • পুরুষের সাথে অনর্থক কথা না বলা, প্রয়োজনে সংক্ষেপে কাজ সেরে নিন।
    • হিন্দু পূজার আওয়াজ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন (হেডফোনে কুরআন শুনতে পারেন)।
    • সুদের লেনদেনে সরাসরি সম্পৃক্ত না হওয়ার জন্য চেষ্টা করুন (যেমন: শুধু ফিল্ডে মজুরি সংগ্রহ নয়, বরং অন্য কাজ)।
    • কিন্তু মনে রাখবেন, এটা শুধু অস্থায়ী অনুমতি—আপনার আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে যেন দ্রুত এই কাজ ছাড়তে পারেন।

চতুর্থ ধাপ: স্বামী ও পরিবারের সাথে সম্পর্ক পরিচালনা

  • স্বামীর জন্য বেশি বেশি দোয়া করুন। আল্লাহ hidayat দিতে পারেন।
  • নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ধৈর্য ও ইস্তিগফার বাড়ান।
  • প্রয়োজনে পরিবার পরিকল্পনা ও আইনগত সাহায্য নিতে পারেন। তবে সব কাজ শরিয়তের আওতায় রাখবেন।

৫. গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়া ও কিতাবের উদ্ধৃতি

  • ফতোয়া উসমানি (১/৪৪৫): “সুদভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করা হারাম। তবে যদি কোনো ব্যক্তি অনাহারের দ্বারপ্রান্তে থাকে, তবে সে পরিমাণ উপার্জন জায়েয হবে যার মাধ্যমে প্রাণ বাঁচে। কিন্তু তবুও তার জন্য হালাল কাজের সন্ধান আবশ্যক।”
  • রদ্দুল মুহতার (৪/১৯০) : “যে ব্যক্তি সুদী লেনদেনে জড়িত, তার উপার্জন নাপাক; কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে খাওয়া জায়েয।”
  • বেহেশতি জেওর (২/২৬) : “যে কাজ ছাড়লে নামাজের ক্ষতি হয় বা গুনাহ হয়, সেই কাজ ছেড়ে দেওয়া ফরজ।”
  • মারেফুল কুরআন (সূরা বাকারা ২৭৫) – মাওলানা মুফতি শফি (রহ.) লিখেছেন, “সুদী ব্যবস্থায় সহায়তা করা কুফরের নিকটবর্তী কাজ।”

৬. চূড়ান্ত পরামর্শ

আপনি একজন ধৈর্যশীল ও দায়িত্বশীল মুসলিম নারী। আপনার অবস্থা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কিন্তু আল্লাহর হুকুমের সামনে কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়

  • অবিলম্বে তওবা করুন এবং এই চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিন। আল্লাহ বিকল্প দেবেন—ইতিহাসে অনেক বান্দা হারাম ত্যাগ করে আল্লাহর অকল্পনীয় রিজিক পেয়েছেন।
  • আপনার স্বামী যদি বেকার ও অলস থাকে, তাহলে আপনি নিজে হালাল উপায়ে উপার্জনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যান। তবে মনে রাখবেন, নিজের দ্বীন ও নামাজ রক্ষা করাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
  • এই চাকরি ছাড়লে আপনি বিপদে পড়বেন—এটা শয়তানের ভয়। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। তিনি বলেন, "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিজিক দেন" (সূরা তালাক: ২-৩)।

আপনার জন্য বিশেষ দোয়া—আল্লাহ আপনার কষ্ট দূর করুন, হালাল রিজিক দিন এবং আপনার স্বামীকে সংশোধন করুন। আমিন।

উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত কিতাব:

  • কুরআন মজিদ
  • সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন)
  • ফতোয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
  • বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
  • মারেফুল কুরআন (মুফতি শফি)
  • আল-হিদায়া (মারগিনানি)
  • শরহু মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবি)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.