স্বামী জুলুম নির্যাতন করলে এবং তালাক না দিলে করণীয় কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
"আমি একটি ছেলেকে বিয়ে করি। সম্পূর্ন গোপনে ২০২৩ সালে।বিয়েটা হয়েছিল এমন ভাবে।ছেলের ২ টা বন্ধু ছিল একজন আমার পক্ষে সাক্ষি দিয়েছিলেন এবং একজন তার পক্ষে সাক্ষি দিছে।একজন কাজি ছিলেন অরেজিস্ট্রারকৃত।আমি জানিও না সে এর আগে বিয়ে করিয়েছিলেন কি না।যাই হোক,তারপর যেভাবে সূরা পরে কবুল বলায় ওভাবেই ৫০ হাজার টাকা দেনমোহর এ কবুল বলেছিলাম।বিয়ের পর আমাকে নানানভাবে মানষিক অত্যাচার,শারিরীক নির্যাতন করে,ভরনপোষণ এর কথা বাদ ই দিলাম।ছেলেটা নেশায় আসক্ত। যেহেতু বিয়েটা গোপন ছিল তাই ওভাবে থাকতাম না একসাথে।এই কয়েক বছরের অনেক অত্যাচার আমি সহ্য করেছি।তাই আমি তাকে তালাক দিতে বলেছি। সে তালাক দিবে না বলেছে।আমি যেন তার সাথে থেকে এসব সহ্য করি এটাই হবে আমাকে শাস্তি দেওয়া।তাই সে তালাক দিবে না।এবং সে এটায়াও বলেছে সে পারিবারিক ভাবে আমাকে আবার বিয়েও করবে না।এভাবে ঝুলিয়ে রাখবে যাতে আমার পরিবার অন্য কোথাও বিয়ে করতে না পারে। তাই তালাক দিবে না।সে আমাকে ঝুলিয়ে রেখে শাস্তি দিবে।কিন্তু আমি এসব অত্যাচার সহ্য করতে করতে মাঝে মাঝে আত্মহত্যার সিদ্ধান্তে পৌছে যেতাম।অনেক হুজুরের সাথে কথা বলছি সবাই বলছে ছেলে তালাক না দিলে তালাক মেয়ে দিতে পারবে না।কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহর কিতাবে সব সমস্যার সমাধান আছে।
আপনি আমাকে দয়া করে সাহায্য করুন।আমি কিভাবে তালাক দিতে পারি এবনং এসব শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে পারি?
Answer
بسم اللہ الرحمن الرحیم
উত্তর:
আপনার সমস্যা অত্যন্ত জটিল ও বেদনাদায়ক। ইসলামে নারীর ওপর জুলুম ও নির্যাতন সম্পূর্ণ হারাম। আপনার স্বামী যদি তালাক দিতে অস্বীকার করে, তবে ইসলামী আইন অনুযায়ী আপনি খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাকের আবেদন) বা ফাস্খ-ই-নিকাহ (বিচারকের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ) এর মাধ্যমে মুক্তি পেতে পারেন। নিচে হানাফী ফিকহের কিতাবের আলোকে বিস্তারিত সমাধান দেওয়া হলো:
১. খুলা (خلع) কী?
খুলা হলো স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীকে কিছু অর্থ (যেমন দেনমোহর বা ক্ষতিপূরণ) প্রদানের বিনিময়ে তালাক গ্রহণ করা। আল্লাহ বলেন:
"যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তারা আল্লাহর বিধান বজায় রাখতে পারবে না, তাহলে স্ত্রী যদি বিনিময় প্রদান করে (বিচ্ছেদের আবেদন করে) তবে তাতে তাদের উভয়েরই কোনো গুনাহ নেই।" (সূরা বাকারা: ২২৯)
হানাফী ফতোয়া:
-
ফাতাওয়া হিন্দিয়াতে বলা হয়েছে: "স্বামী যদি স্ত্রীর প্রতি জুলুম করে, তাহলে স্ত্রী কাযীর (বিচারক) নিকট খুলার আবেদন করতে পারে। কাযী স্বামীকে তালাক দিতে বাধ্য করতে পারেন, অথবা নিজেই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৪৮৬)
-
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন: "যদি স্বামী স্ত্রীকে জুলুম করে এবং তালাক দিতে অস্বীকার করে, তাহলে কাযী স্ত্রীর পক্ষে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘোষণা করতে পারেন।" (রাদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৮)
২. ফাস্খ-ই-নিকাহ (فسخ نکاح) কী?
ফাস্খ হলো বিচারকের মাধ্যমে বিবাহ বাতিল করা। এটি তখনই প্রযোজ্য যখন স্বামী স্ত্রীর প্রতি:
- শারীরিক নির্যাতন করে,
- নেশায় আসক্ত থাকে,
- ভরণপোষণ প্রদান না করে,
- দীর্ঘদিন স্ত্রীকে অবহেলা করে ঝুলিয়ে রাখে।
হাদীস:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: "যদি কোনো স্ত্রী তার স্বামীর ধর্মীয় চরিত্র ও আচরণগত ত্রুটির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তার জন্য বিবাহ বিচ্ছেদের অনুমতি রয়েছে।" (সুনানে নাসাঈ, হাদীস: ৩৪০৯)
আপনার জন্য প্রযোজ্য:
যেহেতু আপনার স্বামী:
- শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন (ضرب و شتم) করছে,
- নেশায় আসক্ত (শরাব/মাদক) - যা ইসলামে হারাম,
- ভরণপোষণ প্রদান করছে না,
- ইচ্ছাকৃতভাবে আপনাকে ঝুলিয়ে রেখেছে (تعلیق و اضرار),
তাই আপনি স্থানীয় ইসলামী আদালত বা দেশের প্রচলিত পারিবারিক আদালতে খুলা বা ফাস্খ-এর মামলা করতে পারেন।
৩. আপনাকে করণীয়:
(ক) প্রমাণ সংগ্রহ করুন:
- নির্যাতনের ডাক্তারি রিপোর্ট, ফটোগ্রাফ, সাক্ষী প্রমাণাদি জমা করুন।
- তার নেশা করার প্রমাণ (যেমন মোবাইল মেসেজ, সাক্ষী) সংগ্রহ করুন।
(খ) স্থানীয় মুফতি বা কাজির সাথে পরামর্শ করুন:
তিনি স্বামীকে তালাকের আদেশ দিতে পারেন। যদি স্বামী তা মানতে না চায়, তাহলে তিনি নিজেই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘোষণা করবেন।
(গ) আইনি সহায়তা নিন:
বাংলাদেশের পারিবারিক আইন অনুযায়ী (১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ) আপনি ক্ষতিপূরণ (খুলা) বা স্বামীর ত্রুটির কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ চাইতে পারেন। একজন ভালো উকিলের মাধ্যমে কোর্টে মামলা করুন।
৪. আত্মহত্যা সম্পর্কে সতর্কতা:
আপনার আত্মহত্যার কথা ভয়ানক! ইসলামে আত্মহত্যা কবীরা গুনাহ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: "যে ব্যক্তি আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে চিরকাল থাকবে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৭৭৮)
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। তিনি সব সমস্যার সমাধান দেন। তার উপর ভরসা রাখুন এবং ধৈর্য ধরে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করুন।
৫. চূড়ান্ত কথা:
ইসলামে নারীর ওপর জুলুম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেছেন: "আর তোমরা নারীদের সাথে সদয়ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা নিসা: ১৯) আপনি যদি সব উপায়ে ব্যর্থ হন, তাহলে বুখারী ও মুসলিমের হাদীস অনুযায়ী খুলা আপনার জন্য বৈধ।
সাহায্যকারী প্রতিষ্টান
- স্থানীয় মসজিদের ইমাম বা মুফতি।
- ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের স্থানীয় অফিস।
আল্লাহ আপনার সমস্যার সমাধান করুন এবং আপনাকে ধৈর্য দান করুন। (আমিন)