নামাজে সূরা ফাতিহা ভুলে গেলে কী করণীয়?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ফরজ নামাজের কোনো রাকাতে ভুলবশত সূরা ফাতিহা না পড়লে এবং পরে মনে পড়লে নামাজের বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:
হানাফি মাজহাবের মূলনীতি:
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, নামাজের প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহা পড়া ওয়াজিব। এটি ফরজের অংশ নয়, বরং নামাজের একটি অপরিহার্য ওয়াজিব অংশ। যদি কেউ ভুলবশত কোনো রাকাতে সূরা ফাতিহা না পড়ে ফেলে, তাহলে তার নামাজ নষ্ট হবে না, বরং সাহু সিজদা (ভুলের সিজদা) দেওয়ার মাধ্যমে নামাজ শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে শর্ত হলো, যদি ভুলটি নামাজ শেষ হওয়ার আগে মনে পড়ে এবং তখনও ঐ রাকাতের রুকুতে না যাওয়া হয়, তাহলে ফিরে এসে সূরা ফাতিহা পড়ে নিতে হবে এবং সাহু সিজদার প্রয়োজন নেই। কিন্তু যদি রুকুর পর বা পরবর্তী রাকাতে গিয়ে মনে পড়ে, তাহলে সাহু সিজদা ওয়াজিব হবে।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে ব্যাখ্যা:
কুরআন:
সূরা ফাতিহা পড়ার নির্দেশনা কুরআনের আয়াত থেকে এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَلَقَدْ آتَيْنَاكَ سَبْعًا مِّنَ الْمَثَانِي وَالْقُرْآنَ الْعَظِيمَ" (সূরা হিজর: ৮৭) "আর নিশ্চয়ই আমি তোমাকে দিয়েছি সাতটি পুনরাবৃত্ত সূরা (সূরা ফাতিহা) এবং মহান কুরআন।"
এ আয়াতে সূরা ফাতিহাকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এবং নামাজে এটি পড়া আবশ্যক। তবে ভুলে পড়তে ভুলে গেলে কী করণীয়, তা হাদিস ও ফিকহের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
হাদিস:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"مَنْ صَلَّى صَلَاةً لَمْ يَقْرَأْ فِيهَا بِأُمِّ الْقُرْآنِ فَهِيَ خِدَاجٌ، فَهِيَ خِدَاجٌ، فَهِيَ خِدَاجٌ غَيْرُ تَمَامٍ" (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৩৯৫) "যে ব্যক্তি এমন নামাজ পড়ে যাতে সে সূরা ফাতিহা পড়েনি, সে নামাজ ত্রুটিপূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ—পরিপূর্ণ নয়।"
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সূরা ফাতিহা না পড়া নামাজকে অসম্পূর্ণ করে দেয়। তবে হানাফি মাজহাবের ইমামগণ এটিকে ওয়াজিব পর্যায়ের বলে গণ্য করেছেন এবং ভুলে পড়তে ভুলে গেলে সাহু সিজদার মাধ্যমে তা পূরণ করার বিধান দিয়েছেন।
সাহু সিজদার দলিল:
রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও নামাজে ভুল করলে সাহু সিজদা করতেন। যেমন হাদিসে বর্ণিত:
"عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَّى الظُّهْرَ خَمْسًا فَقِيلَ لَهُ: أَزِيدَ فِي الصَّلَاةِ؟ فَقَالَ: وَمَا ذَاكَ؟ قَالُوا: صَلَّيْتَ خَمْسًا. فَسَجَدَ سَجْدَتَيْنِ بَعْدَ مَا سَلَّمَ" (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৫৭২) "আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) যোহরের নামাজ পাঁচ রাকাত পড়ে ফেললেন। তখন তাঁকে বলা হলো: নামাজ কি বাড়ানো হয়েছে? তিনি বললেন: কী ব্যাপার? তারা বলল: আপনি পাঁচ রাকাত পড়েছেন। তখন তিনি সালাম ফিরানোর পর দুটি সিজদা করলেন (সাহু সিজদা)।"
এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, নামাজে কোনো ভুল হলে সাহু সিজদা দিয়ে তা সংশোধন করা সুন্নত।
হানাফি কিতাবের রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): এতে বলা হয়েছে, যদি কেউ কোনো রাকাতে সূরা ফাতিহা ভুলে যায় এবং পরবর্তী রাকাতে গিয়ে মনে পড়ে, তাহলে সে ঐ রাকাতকে বাতিল মনে করবে না, বরং নামাজ শেষে সাহু সিজদা দেবে। (রদ্দুল মুহতার, ২/৮০)
- ফাতাওয়া আলমগিরি (হিন্দিয়া): এতে উল্লেখ আছে, "যদি কোনো ব্যক্তি প্রথম রাকাতে সূরা ফাতিহা না পড়ে দ্বিতীয় রাকাতে গিয়ে পড়ে, তাহলে তার উপর সাহু সিজদা ওয়াজিব।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/১২৫)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি মুহাম্মদ শফি): এতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে যে, সূরা ফাতিহা ওয়াজিব এবং ভুলে বাদ পড়লে সাহু সিজদা দিয়ে নামাজ সহীহ হয়।
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর:
১. নামাজ কি সহীহ হবে?
হ্যাঁ, আপনার নামাজ সহীহ হবে। কারণ ভুলে সূরা ফাতিহা না পড়া নামাজকে নষ্ট করে না, বরং এটি একটি ওয়াজিব তরক করার শামিল, যা সাহু সিজদা দ্বারা পূরণযোগ্য।
২. সাহু সিজদা দিতে হবে কি?
হ্যাঁ, আপনাকে সাহু সিজদা দিতে হবে। যদি ভুলটি রুকুর আগে মনে পড়ে, তাহলে দাঁড়িয়ে সূরা ফাতিহা পড়ে নিন এবং সাহু সিজদার প্রয়োজন নেই। কিন্তু যদি রুকুর পর বা পরবর্তী রাকাতে মনে পড়ে, তাহলে নামাজ শেষে দুটি সাহু সিজদা দিতে হবে।
ব্যবহারিক নিয়ম:
- যদি আপনি কোনো রাকাতে ভুলে সূরা ফাতিহা না পড়ে থাকেন এবং রুকুতে যাওয়ার আগেই মনে পড়ে, তাহলে দাঁড়িয়ে সূরা ফাতিহা পড়ে নিন এবং যথারীতি নামাজ চালিয়ে যান। এতে সাহু সিজদার প্রয়োজন হবে না।
- যদি রুকুতে যাওয়ার পর বা পরবর্তী রাকাতে গিয়ে মনে পড়ে, তাহলে ঐ রাকাতের জন্য আপনি আর ফিরবেন না। বরং নামাজ শেষে (শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ পড়ে) ডানে ও বামে সালাম ফিরানোর আগে বা পরে—উভয় পদ্ধতিই গ্রহণযোগ্য—দুটি সাহু সিজদা দিন।
উপসংহার:
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, ফরজ নামাজের কোনো রাকাতে ভুলে সূরা ফাতিহা না পড়লে নামাজ নষ্ট হয় না, বরং সাহু সিজদা দেওয়ার মাধ্যমে তা শুদ্ধ হয়ে যায়। এটি কুরআন ও হাদিসের আলোকে প্রমাণিত এবং ফিকহের কিতাবে বিশদভাবে বর্ণিত।
আল্লাহ আপনাকে সঠিক আমল করার তাওফিক দিন। যদি আরও কোনো প্রশ্ন থাকে, জানাতে পারেন।