কুরবানীকারীর জন্য নিজের গোশত খাওয়া পর্যন্ত না খাওয়া সম্পর্কে
Qurbani-Slaughtering · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
কুরবানী ঈদের দিন কিছু মুস্তাহাব আমল রয়েছে। তবে প্রশ্নে উল্লেখিত ‘সারাদিন না খেয়ে থাকা’ সম্পর্কে সঠিক মাসআলা হলো— যারা কুরবানী করবেন তাদের জন্য মুস্তাহাব (উত্তম) হলো, ঈদের দিন নিজের কুরবানীর গোশত থেকে খাওয়ার পূর্বে অন্য কিছু না খাওয়া। কিন্তু যদি গোশত দেরিতে আসে (যেমন রাতে), তাহলে অন্য খাবার খেতে কোনো বাধা নেই। এটি সুন্নাতের খিলাফ হবে না, বরং অপারগতার কারণে রুখসত (ছাড়) আছে।
বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা:
-
হাদীস শরীফ:
হযরত বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) কুরবানীর দিন এমন কিছু খেতেন না যতক্ষণ না তিনি ঈদের নামায পড়ে নিজের কুরবানীর গোশত খেতেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস: ৩১৫৬; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ২৩০২৭)- এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কুরবানী আদায়কারীর জন্য মুস্তাহাব হলো নামায ও কুরবানীর পর নিজের কুরবানীর গোশত দিয়ে এফতার করা। তবে এটি ওয়াজিব বা ফরজ নয়, বরং মুস্তাহাব।
-
হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহের বক্তব্য:
- রদ্দুল মুহতার (৬/৩২৬): “কুরবানীকারীর জন্য মুস্তাহাব হলো, কুরবানীর গোশত খাওয়ার আগে অন্য কিছু না খাওয়া। তবে যদি কুরবানী বিলম্ব হয়, তাহলে অন্য খাবার খেতে পারে।”
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৩৪৫): “ঈদের দিন সকালে খালি পেটে থাকা সুন্নাত, কিন্তু গোশত দেরিতে এলে অপেক্ষা করতে হবে না; অন্য কিছু খেয়ে নিলে সুন্নাতের খিলাফ হবে না।”
- বাহিশতী জেওর (৩/২২): “যে ব্যক্তি কুরবানী করবে, তার জন্য ভালো হলো যে, ঈদের নামাযের আগে কিছু না খায় এবং নামাযের পর নিজের কুরবানীর গোশত খায়। কিন্তু যদি গোশত দেরিতে আসে, তাহলে অন্য কিছু খেতে পারবে।”
- ফাতাওয়া উসমানী (২/২৯৬): “কুরবানীকারীর জন্য মুস্তাহাব হলো গোশত দিয়ে এফতার করা, তবে তা না পেলে অন্যান্য খাবার খাওয়া জায়েয।”
-
মুফতী তাকী উসমানী (দা.বা.)-এর ফাতাওয়া:
তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি কুরবানী করবে, তার জন্য মুস্তাহাব হলো ঈদের দিন নিজের কুরবানীর গোশত থেকে খাওয়া। কিন্তু যদি গোশত দেরিতে আসে, তবে অন্য খাবার খেতে অসুবিধা নেই। বরং সারাদিন না খেয়ে থাকা মাকরূহ হতে পারে, কারণ তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর।” (ফিকহী মাকালাত, ২/২২৫)
সুতরাং আপনার প্রশ্নের উত্তর:
-
আপনার করণীয়:
- যদি আপনি কুরবানী করে থাকেন, তাহলে চেষ্টা করুন ঈদের নামায ও কুরবানীর পর নিজের গোশত খেতে। কিন্তু গোশত রাতে আসলে সকাল-দুপুরে অন্য খাবার খেতে পারেন। এতে সুন্নাতের খিলাফ হবে না।
- যদি আপনি কুরবানী না করে থাকেন, তাহলে ঈদের দিন সকাল থেকে স্বাভাবিকভাবে খেতে পারেন; কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
-
সারাদিন না খেয়ে থাকা জরুরি নয়:
এটি একটি মুস্তাহাব আমল, ওয়াজিব নয়। তাই সুবিধামতো আমল করুন। বেশি অপেক্ষা করলে অসুবিধা হলে খেয়ে নিন।
ঈদুল আযহার অন্যান্য মুস্তাহাব আমল:
- ঈদের দিন সকালে গোসল করা।
- মিসওয়াক করা ও সুগন্ধি ব্যবহার করা।
- নতুন বা পরিষ্কার পোশাক পরা।
- ঈদগাহে যাওয়ার পথে তাকবীর (الله أكبر الله أكبر لا إله إلا الله والله أكبر الله أكبر ولله الحمد) উচ্চারণ করা।
- ঈদের নামাযের পূর্বে কিছু না খাওয়া (কুরবানীকারী ব্যক্তি ক্ষেত্রে)।
- নামাযের পর নিজের কুরবানীর গোশত খাওয়া।
- কুরবানীর গোশত তিনভাগ করা— একভাগ নিজের, একভাগ আত্মীয়-স্বজনকে, একভাগ গরিব-মিসকীনকে।
- ঈদের দিন বেশি বেশি দান-সাদকা করা।
উপসংহার:
সারাদিন না খেয়ে থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। মুস্তাহাব হলো গোশত দিয়ে এফতার করা, কিন্তু তা সম্ভব না হলে অন্য খাবার খাওয়া জায়েয। সুতরাং আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন— রাতে গোশত আসলেও সকাল-দুপুরে অন্য খাবার খেতে পারবেন। আল্লাহতায়ালা আপনার কুরবানী ও ইবাদত কবুল করুন। (আমীন)