ভুল তথ্যে বৃত্তি, জিলহজ্জ মাসে নখ কাটা সহ নানাবিধ মাসআলা জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১.আমার দাদা মুক্তিযোদ্ধা সেই হিসেবে একটা বৃত্তি পাই। বৃত্তির ইনফরমেশন দেওয়ার সময় বাবার পেশা এবং ইনকাম ভুল দি। কিন্তু যতটুকু জানি বৃত্তি রেজাল্ট দেওয়া হয় SSC ও HSC পরিক্ষার রেজাল্টের উপর নির্ভর করে। এখন বাবার ইনফরমেশন ভুল দেওয়ার কারণে টাকা কি আমার জন্য হালাল হবে?
২. কর্যে হাসানা নিয়ে কুরবানি করলে কুরবানি হবে? শতভাগ হালাল টাকা হলে?
৩l আমরা একটা বাসায় উঠছি নতুন,আমাদের আগের ফ্যামিলি যাওয়ার সময় মিটারে প্রায় ১৭০টাকা রেখে গেছে।আমরা এইটা ব্যবহার করতেছি।এইটা কি হারাম হচ্ছে?
হারাম হলে করণীয় কি?
৪/কোনকারনে ওয়াক্তের মধ্যে সাহু সেজদা না দিলে নামাযে যে ত্রুটি হয়েছে এতে কি নামাযটা বাতিল হয়ে কাযা হয়ে যাবে?
৫/একজন শাইখুনা হাফিযাহুল্লাহ বলছিলেন,ভাগের মধ্যে একজনের ইনকাম একটু সমস্যা থাকলে এইটা নিয়ে চিন্তিত না হতে।
কুরবানির ভাগের মধ্যে একজনের ইনকামে সমস্যা থাকলে বাকি ভাগ যারা থাকবে তাদের সমস্যা হবেনা?
৬.বটি দিয়ে কাজ করার সময় নখের একটা অংশ কেটে গিয়েছে,যা দ্বারা গুতা লাগলে ব্যথা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।এ পর্যায়ে নখের ওই অংশটা কেটে ফেললে কি কুরবানির সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবো?
৭.কেউ যদি জিলহজ্জের প্রথম দশকে নিয়ত না করেই রোজা রাখে, (অর্থাৎ সে কাযা রোজা বা নফল রোজা কোনোটির নিয়ত করে নি। গতানুগতিক ভাবে রোজা রেখেছে) তাহলে কি রোজার সওয়াব পাবে? এটা কি রোজা হিসেবে গণ্য হবে?
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين
প্রশ্ন ১: মুক্তিযোদ্ধা বৃত্তি ও বাবার তথ্য ভুল দেওয়া
উত্তর:
বৃত্তিটি যদি শুধু এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে দেওয়া হয় (মেধাভিত্তিক), এবং বাবার পেশা ও আয় তথ্য ভুল দেওয়া সত্ত্বেও বৃত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে সেই তথ্যের কোনো প্রভাব না থাকে, তাহলে বৃত্তির টাকা হালাল হবে। তবে তথ্য গোপন করা বা মিথ্যা বলা গুনাহের কাজ। আপনাকে এজন্য তওবা করতে হবে। আর যদি বৃত্তি পাওয়ার শর্ত আর্থিক অসচ্ছলতা হয় এবং আপনি সেই শর্ত পূরণের জন্য মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকেন, তাহলে টাকা হারাম হবে।
সূত্র:
- "বৃত্তি যদি মেধাভিত্তিক হয় এবং আর্থিক অবস্থা শর্ত না হয়, তবে ভুল তথ্য দেওয়া সত্ত্বেও টাকা হালাল। তবে মিথ্যা বলার গুনাহ থাকবে।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৫/২৫৫)
- "যদি কোনো শর্ত পূরণের জন্য মিথ্যা বলা হয়, তবে সেই সম্পদ হারাম।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৫)
সিদ্ধান্ত:
আপনার ক্ষেত্রে টাকা হালাল, তবে মিথ্যা বলার জন্য তওবা করুন।
প্রশ্ন ২: করযে হাসানা দিয়ে কুরবানি
উত্তর:
কর্যহাসানা (সুদবিহীন ঋণ) গ্রহণ করলে তা আপনার মালিকানায় চলে আসে। তাই এই টাকা হালাল। শতভাগ হালাল টাকা দিয়ে কুরবানি করলে তা সহিহ হবে এবং সওয়াব পাওয়া যাবে। তবে ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব থাকবে।
সূত্র:
- "ঋণ গ্রহণ করলে তা গ্রহণকারীর মালিকানায় চলে যায়, তাই তা হালাল।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/১৫১)
- "কুরবানি হালাল মাল দ্বারা হতে হবে।" (বাহিশ্তি জেওর, ২/২৩৫)
প্রশ্ন ৩: আগের ভাড়াটিয়ার রেখে যাওয়া মিটারের টাকা
উত্তর:
আগের পরিবার যদি জেনেশুনে বা দান হিসেবে না রেখে যায়, তবে সেই টাকা ব্যবহার করা হারাম। কারণ এটি তাদের সম্পদ। করণীয়:
- সম্ভব হলে তাদের খুঁজে টাকা ফেরত দিন।
- যদি খুঁজে না পান, তাহলে সদকা করে দিন তাদের পক্ষ থেকে।
সূত্র:
- "হারাম মাল ভোগ করা জায়েজ নয়। মালিকের অভাবে সদকা করতে হবে।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/২৫০)
- "কারো সম্পদ তার অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হারাম।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/২৪)
প্রশ্ন ৪: ওয়াক্তের মধ্যে সাহু সেজদা না দেওয়া
উত্তর:
সাহু সেজদা ওয়াজিব। যদি ভুলবশত বা ইচ্ছাকৃতভাবে তা ওয়াক্তের মধ্যে (সালাম ফেরানোর আগে) না দেওয়া হয়, তাহলে সালাত বাতিল হবে না। তবে এটি মাকরূহ তাহরিমি (নিষিদ্ধ) এবং সালাত দুর্বল হবে। যদি সময় পার হয়ে যায়, তাহলে আর সাহু সেজদা দেওয়া জরুরি নয়, তবে তওবা করতে হবে। সালাতের কাজা আবশ্যক নয়।
সূত্র:
- "সাহু সেজদা ওয়াজিব, কিন্তু তা ছুটে গেলে সালাত বাতিল হয় না, বরং মাকরূহ তাহরিমি হয়।" (আল-হিদায়া, ১/১৪২)
- "সালামের পর সাহু সেজদা না দিলে সালাত সহিহ, তবে ইচ্ছাকৃত ছেড়ে দিলে গুনাহ।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৫৪১)
প্রশ্ন ৫: কুরবানির ভাগে কারো আয়ে সমস্যা
উত্তর:
কুরবানির প্রতিটি ভাগ একটি অপরটির সাথে সংযুক্ত। যদি কোনো অংশীদারের আয় হারাম হয়, তাহলে কারো কুরবানি সহিহ হবে না।
সূত্র:
- "হারাম মাল দ্বারা কুরবানি সহিহ নয়।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/১৪২)
প্রশ্ন ৬: জিলহজ্জের প্রথম দশকে নখ কাটা
উত্তর:
কুরবানি থাকুক বা নাই থাকুক, সবার জন্য জিলহজ্জের প্রথম দশ দিনে চুল ও নখ না কাটা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) ওয়াজিব নয়। যদি কোনো প্রয়োজনে (যেমন ব্যথা বা আঘাত) নখ কাটতে হয়, তাহলে কাটা জায়েজ এবং কুরবানির সওয়াবে কোনো ঘাটতি হবে না। তাই আপনার নখের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কাটলে কোনো সমস্যা নেই।
সূত্র:
- "প্রয়োজনে চুল ও নখ কাটা জায়েজ। এতে কুরবানির সওয়াব কমে না।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩২১)
- "অপ্রয়োজনে কাটা মাকরূহ, তবে ওয়াজিব নয়।" (বাহিশ্তি জেওর, ৩/১৫২)
প্রশ্ন ৭: জিলহজ্জের প্রথম দশকে নিয়ত ছাড়া রোজা
উত্তর:
রোজার জন্য নিয়ত জরুরি। নিয়ত ছাড়া উপবাস থাকলে তা রোজা হিসেবে গণ্য হবে না এবং সওয়াব পাওয়া যাবে না। যদি কেউ শুধু অভ্যাসবশত বা কোনো নির্দিষ্ট নিয়ত না করে উপবাস থাকে, তা রোজা নয়। তবে যদি দিনের প্রথম ভাগে (যাওয়ালের আগে) নিয়ত করে নেয়, তাহলে নফল রোজা সহিহ হবে। জিলহজ্জের প্রথম দশকের রোজার বিশেষ ফজিলত পেতে হলে স্পষ্ট নিয়ত করতে হবে।
সূত্র:
- "প্রত্যেক রোজার জন্য নিয়ত আবশ্যক। নিয়ত ছাড়া রোজা হয় না।" (আল-হিদায়া, ১/১২৩)
- "নফল রোজার নিয়ত যাওয়াল পর্যন্ত করা যায়।" (রদ্দুল মুহতার, ২/৩৭৮)
- "জিলহজ্জের রোজার বিশেষ সওয়াব নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।" (মাআরিফুল কুরআন, ৮/৫৪২)
والله أعلم بالصواب