মায়ের সাথে রাগ করে কোনো কথার উত্তরে ইচ্ছা করে মিথ্যা কথা বলে ফেললে কি কুফুরী হবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তরঃ
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, কোনো মুসলিম যখন ভয় করে যে তার কোনো কথা বা কাজ কুফরী হয়ে গেছে কিনা, এটি তার ঈমানের দলিল। নিম্নে হানাফী ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ ও ফতোয়া প্রদান করা হলো।
বিষয়টির বিশ্লেষণ
আপনার আম্মু বলেছেন: "আল্লাহ কি এই কাজটা তোমার চোখের সামনে দেখায়নি?"
এর অর্থ: আল্লাহ তাআলা কি তোমাকে এই কাজটি দেখিয়ে দেননি? (অর্থাৎ, তুমি কি এটি চোখের সামনে দেখনি? বা আল্লাহ কি তোমার জন্য এটি প্রকাশ করেননি?)
আপনি রাগের মাথায় "না" বলে দিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন হলো: এই "না" বলার মাধ্যমে আপনি কি আল্লাহর একটি গুণ বা কাজ অস্বীকার করেছেন?
হানাফী ফিকহের মূলনীতি
হানাফী মাযহাবে কুফরী বলতে বুঝায়: দ্বীনের অপরিহার্য কোনো বিষয়কে জেনেশুনে অস্বীকার করা বা আল্লাহ, রাসূল, কুরআন ইত্যাদির প্রতি অবমাননা করা। (আল-হিদায়া, রদ্দুল মুহতার)
এখানে আপনার "না" বলার অর্থ কী হতে পারে:
-
যদি আপনার উদ্দেশ্য হয়: "আল্লাহ এ কাজটি আমার চোখের সামনে দেখাননি" (অর্থাৎ আপনি অস্বীকার করছেন যে আল্লাহ আপনার জন্য বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন) — তাহলে এটি একটি ভুল কথা, কারণ আল্লাহ সবকিছুই দেখেন ও দেখান, তবে এটি কুফরী নয় বরং একটি অজ্ঞতাপূর্ণ কথা বা ভুল ধারণা।
-
যদি আপনার উদ্দেশ্য হয়: "আল্লাহ এ কাজটি দেখাননি" — অর্থাৎ আপনি আল্লাহর কাজ বা কুদরতকে অস্বীকার করতে চেয়েছেন, তাহলে এটি কুফরীর শামিল হতে পারে। কিন্তু আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, আপনি রাগের মাথায় এবং আবেগের বশবর্তী হয়ে বলেছেন। রাগের অবস্থায় বলা কথাকে কুফরী বলার ব্যাপারে হানাফী ফুকাহা সতর্কতা অবলম্বন করেছেন।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন:
"যদি কোনো ব্যক্তি রাগান্বিত অবস্থায় এমন কথা বলে যা কুফরী মনে হয়, কিন্তু তার অন্তর ঈমানের উপর স্থির, তাহলে তা কুফরী বলে গণ্য হবে না, যদি না সে ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরী করে।" (ফতোয়া হিন্দিয়া, ২/২৫২)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) লিখেছেন:
"অজ্ঞতা, ভুল বা অসাবধানতাবশত কোনো কথা বললে কুফরী হয় না, যতক্ষণ না অন্তরে কুফরীর বিশ্বাস থাকে।" (ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/২২৮)
সুতরাং আপনার ক্ষেত্রে কী বিধান?
- আপনি রাগের মাথায় "না" বলেছেন। আপনার অন্তর আল্লাহ ও ইসলামের প্রতি ঈমানদার।
- আপনি এখন ভয় পাচ্ছেন এবং তওবা করতে চাচ্ছেন — এটি আপনার ঈমানের প্রমাণ।
- আপনার কথাটি কুফরী নয়, বরং এটি একটি গুনাহ (মায়ের সাথে অসন্তোষজনক কথা বলা) এবং তওবাহ করার মতো বিষয়।
তওবা ও সতর্কতাঃ
-
আল্লাহর কাছে তওবা করুন এবং বলেন:
"আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযু বিকা মিন সামাদা ইল্মি বা লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায জালিমীন।" -
আপনার আম্মুর কাছে ক্ষমা চান। মায়ের সাথে রাগ করে কথা বলা বড় গুনাহ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"মায়ের রাগে আল্লাহর রাগ হয়।" (তিরমিজি) -
ভবিষ্যতে সাবধান থাকুন। রাগের সময় ভাষা নিয়ন্ত্রণ করুন।
-
আকীদার ব্যাপারে জ্ঞান অর্জন করুন। যেমন: "আল্লাহ সবকিছু জানেন ও দেখেন" — এটা ঈমানের অপরিহার্য অংশ।
উপসংহার
আপনার উক্তিটি কুফরী নয়। তবে এটি একটি গুনাহ, কারণ আপনি রাগ করে মায়ের সাথে উত্তম ভাষায় কথা বলেননি। এখনই তওবা করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আপনার ঈমান ঠিক আছে, ইনশাআল্লাহ।
উল্লেখিত গ্রন্থঃ
- ফতোয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী), ২/২৫২
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন), ৬/৪১৪
- ইমদাদুল ফতোয়া (মুফতি মুহাম্মদ শফি), ৪/২২৮
- ফতোয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানী), ২/১২৩