কুরবানী সহিহ হওয়া নিয়ে
Qurbani-Slaughtering · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
প্রশ্নে উল্লেখিত ঘটনায় কুরবানীর পশুটি কুরবানীর দিন সকালে হেলে পরে, মাটিতে শুয়ে যায় এবং এমন অবস্থা হয় যে সে যেকোনো মুহূর্তে মারা যেতে পারে। এই অবস্থায় মালিকের অনুমতি নিয়ে তাকে যবেহ করা হয়। নিচে হানাফী ফিকহের আলোকে কুরবানীর শুদ্ধতা ও দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
১. কুরবানীর শুদ্ধতা
হানাফী মাযহাব অনুযায়ী কুরবানীর পশু সুস্থ, সবল এবং ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। পশুর মধ্যে যদি এমন কোনো ত্রুটি থাকে যা তার গমনশক্তি বা জীবনীশক্তিকে গুরুতরভাবে ব্যাহত করে, তাহলে তা কুরবানীর জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে:
-
فَتاوَى عَالَمْكِيرِيَّة ও رَدُّ الْمُحْتَار-এ বলা হয়েছে:
“যে পশু এত বেশি অসুস্থ বা দুর্বল যে সে নিজে হেঁটে যবেহের স্থানে যেতে পারে না, তার কুরবানী জায়েয নয়।”
(আল-হিদায়া, ফাতাওয়া আলমগীরী, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৪) -
ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) লিখেছেন:
“যদি কুরবানীর পশু এমন অসুস্থ হয় যে তা দাঁড়াতে বা চলতে পারে না, তাহলে সে পশু কুরবানী করলে তা আদায় হবে না; বরং অন্য পশু কুরবানী করতে হবে।”
(ইমদাদুল ফাতাওয়া ২/২২৩)
আপনাদের বর্ণনায় গরুটি এমন অবস্থায় ছিল যে সে মাটিতে শুয়ে পরে এবং মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। অর্থাৎ সে নিজে দাঁড়াতে বা যবেহের স্থানে যেতে সক্ষম ছিল না। তাই হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী এই কুরবানী শুদ্ধ হয়নি। মালিকের ওপর কুরবানীর ফরজ/ওয়াজিব রহিত হয়নি; বরং তাকে পুনরায় অন্য একটি সুস্থ পশু কুরবানী করতে হবে।
- যদি তার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে তিনি গরীব-মিসকিনদের জন্য এ মাংস দান করে দেবেন এবং কুরবানীর নিয়ত ছাড়াই এটি সাধারণ যবেহ বলে গণ্য হবে। তবে কুরবানী আদায় হবে না।
✅ ব্যতিক্রমী মত: কিছু হানাফী উলামা (যেমন ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ) বলেন: যদি পশুটি জীবিত অবস্থায় যবেহ করা হয় এবং তার নড়াচড়া বা কোনো প্রতিক্রিয়া থাকে, তাহলে কুরবানী আদায় হয়ে যাবে, যদিও তা মাকরূহ। কিন্তু অধিকাংশ মুফতী ও ফকীহর মতে এটি শুদ্ধ নয়। তাই সতর্কতামূলক পুনরায় কুরবানী করা উত্তম।
২. দায়-দায়িত্ব কার?
ঘটনায় দুইজন ব্যক্তি জড়িত: গরুর মালিক এবং গরুটি যে ব্যক্তি দেখাশোনা করছিলেন। দায়িত্ব নির্ভর করবে কার অযত্ন-অবহেলায় পশুটির অবস্থা খারাপ হয়েছে।
-
যদি খাওয়ানো বা যত্নে গাফিলতি না থাকে:
বর্ণনা অনুযায়ী গরুটির অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণ ধারণা করা হয়: যা খাওয়ানো হয়েছে তার গ্যাস এবং বৃষ্টির ঠান্ডা। এটি আকস্মিক ও অনিয়ন্ত্রিত ঘটনা। সেক্ষেত্রে দেখাশোনাকারী ব্যক্তি (আমিন) দায়ী নন, কারণ তিনি আমানতদার এবং অবহেলা প্রমাণিত না হলে ক্ষতিপূরণ দিতে হয় না। মালিকই এ ক্ষতির ভার বহন করবেন।
(রদ্দুল মুহতার ৫/৫৩০, ফাতাওয়া উসমানী ২/১৮৫) -
যদি দেখাশোনাকারী ব্যক্তি অতিরিক্ত বা ক্ষতিকর খাবার দেন:
যেমন গ্যাস সৃষ্টিকারী খাদ্য বা বেশি খাওয়ানোর ফলে এটি ঘটে, তাহলে তিনি গুনাহগার হবেন এবং গরুর মূল্য মালিককে ফেরত দিতে হবে। তবে মালিক নিজেই যবেহ করতে অনুমতি দিলে তা দায় মাফের কারণ হতে পারে, কিন্তু ক্ষতিপূরণ থেকে তাকে মুক্তি দেবে না যদি অবহেলা প্রমাণিত হয়। -
মালিকের দায়:
তিনি নিজেই পশুটি অন্য কারো কাছে আমানত রেখেছিলেন। আমানতদার নির্বাচন ও খরচ দেওয়া সত্ত্বেও গরুটি অসুস্থ হয়ে গেলে মালিকের কোনো দায় নেই যদি তিনি আমানতদারকে সতর্ক করে দেন বা বিশেষ নির্দেশনা দেন। তবে কুরবানীর দিন নিজে উপস্থিত না থেকে অপেক্ষার নির্দেশ দেওয়ায় তার সামান্য দায়িত্বহীনতা থাকতে পারে, কিন্তু সেটি ফিকহী দায় নয়।
সারমর্ম:
- দেখাশোনাকারী ব্যক্তি দায়ী হবেন যদি প্রমাণ হয় যে তিনি অবহেলা বা অজ্ঞতাবশত ক্ষতিকর খাবার দিয়েছেন। তা না হলে তিনি দায়ী নন।
- মালিক কুরবানীর শুদ্ধতার জন্য দায়ী। যেহেতু কুরবানী শুদ্ধ হয়নি, তাই তাকে পুনরায় কুরবানী করতে হবে অথবা যদি অক্ষম হন তবে সদকা করতে হবে। মালিকের জন্যই এখানে অধিক দায়িত্ব।
চূড়ান্ত ফতোয়া
১. কুরবানী শুদ্ধ হয়নি। মালিকের ওপর কুরবানীর ওয়াজিব বহাল আছে। তাকে সামর্থ্য থাকলে অপর একটি পশু কুরবানী করতে হবে, অন্যথায় গরীবদের মাংস দান করে দেবেন।
২. দায়: পশুর অসুস্থতা যদি দেখাশোনাকারীর অবহেলায় না হয়ে থাকে, তাহলে তিনি দায়ী নন। অবহেলা প্রমাণিত হলে তিনি পশুর মূল্যের ক্ষতিপূরণ দেবেন। তবে মালিক তার অনুমতি দিয়ে কিছুটা দায় গ্রহণ করেছেন।
উল্লেখ্য: ভবিষ্যতে কুরবানীর পশু তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট খাদ্য ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, এবং অসুস্থতার সম্ভাবনা থাকলে দ্রুত পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
রেফারেন্স:
- আল-হিদায়া (কুরবানীর শর্তাবলী)
- রদ্দুল মুহতার (৬/৩২৪-৩২৬)
- ফাতাওয়া আলমগীরী (৫/২৯৬)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২২৩)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/১৮৫-১৮৬)
- বাহিশ্তী জেওর (কুরবানী অধ্যায়)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক আমল করার তাওফীক দান করুন।