দাম্পত্য কলহ ও সন্তানের প্রতি স্বামীর রুক্ষ আচরণে স্ত্রীর করণীয় কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আসার ২দিন পর আমাদের ভেতর সামান্য মনোমালিন্য হয়েছে সবাইকে ভালো ভালো দামী উপহার দিচ্ছে আর আমার আত্মীয়কে নিম্নমানের দেয়ায়। এরপর সে জোরে চিৎকার শুরু করে দিয়েছে। তার অবস্থা দেখে আমি মাফ চাচ্ছি। কম হলেও ৫ থেকে ৬বার বলেছি মাফ করে দেন। আপনি রাগ হবেন আমি বুঝতে পারিনাই। আর কখনও এসব বিষয় নিয়ে কথা বলবোনা। আমি সাথে সাথে ২রাকাত নামাজেও দাঁড়িয়ে গেছি যে আল্লাহ আমাকে ধৈর্য দেন। আর এই অশান্তি দূর করে দেন। এরপরও সালাম ফিরানোর পর ও উনি বার বার বলে যাচ্ছে উনাকে শান্তি দেইনা। আমি কি সারাজীবন এমনই করবো কিনা সফর থেকে আসার পর। এমন। উনি থামছেনা। আমিও বলছি যে বাদ দেন না। আমি তো মাফ চাইলাম। কিন্তু উনি আমাকে প্রশ্ন করেই যাচ্ছে আর কতদিন এমন করবো। কেনো এমন করি।
তারপর আমি রেগে যাই। বলি যে আপনাকে আসলে ভালোভাবে বললে কাজ হবেনা বুঝছি। আপনেরে মাথা থেকে পা পর্যন্ত গালী দিলে পরে আপনি ঠিক হবেন। জুতার বারির উপযুক্ত আপনি। এমন আরও অনেক বেয়াদবীমূলক কথা বলি। পরে উনি শান্ত হয়। উলটা আমাকে আরও মানায়। আমার রাগ ভাঙায়। উনার সাথে আমার বয়সের পার্থক্যও অনেক।
এভাবে যদি সারাজীবন চলে তাহলে আমার বাচ্চারাও এর প্রভাব পাচ্ছে। আর আমিও জান্নাত থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আমি ঠিক ঐ মুহুর্ত কিভাবে সামলাবো যখন উনি রাগ হয়ে বারবার আমাকে জিজ্ঞেস করতে থাকে? আমি তো বকাবকি না করলে উনার রাগ আরও স্থায়ী হয়। জিদ করতেই থাকে। প্রশ্ন করতেই থাকে। আমার কি করা উচিত?
আর বাচ্চার সাথে যখন অন্যায় করে ঐ মুহুর্তে আমি কি করতে পারি? অনেক কঠিন মুহুর্ত যায়। যেমন ও ফ্ল্যাশ করতে ভয় পায় টয়লেট করার পর। তো ময়লা কমোডে দেখার পর রেগে ওকে লাথি দিতে দিতে বাথরুমে ঢুকিয়ে জোড় করে ফ্ল্যাশ করানো শিখাতে চায় আর যেই জোড়ে জোরে চিৎকার করে যে পাশের ফ্লাট, নিচতলার ফ্লাট থেকে মানুষ চলে আসে। তার চিৎকার আর বাচ্চাকে ভয় দেখানো দেখলে মনে হয় যে ওর মনে হয় কলিজা ফেটে যাবে ভয়ে। তার সাথে রাগ করলেও বাচ্চা প্রশ্রয় পাচ্ছে। নিজেই বলে আমি আমার বাচ্চাকে বেয়াদব বানাচ্ছি। আবার না থামালেও বাচ্চার মানসিক ক্ষতি হচ্ছে।
এখন এই অবস্থায় আমি কি করতে পারি। আমাকে সমাধান দিন। আল্লাহর জন্য আমাকে সাহায্য করুন সমাধান দিয়ে। আমি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছি। সংসার জীবন জাহান্নাম মনে হচ্ছে।
আমাকে এই ২অবস্থায় কি করা উচিত পরামর্শ দিন।
লেখা অনেক বড় হয়ে যাওয়ায় ক্ষমা চাচ্ছি।
Answer
উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
প্রিয় বোন, আপনার কষ্ট আমরা বুঝতে পারছি। দীর্ঘ ৯ বছরের বিবাহিত জীবনে আপনি যে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তা সত্যিই অত্যন্ত কঠিন। আপনি যে ইসলামী পথে সমাধান চাচ্ছেন, তা আপনার ঈমানের দৃঢ়তার পরিচয় বহন করে। নিচে কুরআন-হাদীস ও হানাফী ফিকহের আলোকে আপনার প্রশ্নের সমাধান দেওয়া হলো:
১. স্বামীর আচরণের ইসলামী বিধান
ইসলামে স্বামীকে স্ত্রী ও সন্তানের প্রতি দয়া, নম্রতা ও ধৈর্যের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের জন্য সর্বোত্তম।" (তিরমিযী, হাদীস: ৩৮৯৫)
আপনার স্বামীর রাগী স্বভাব, বাচ্চাকে লাথি মারা, ভয় দেখানো, এবং আপনাকে মানসিকভাবে কষ্ট দেওয়া ইসলামসম্মত নয়। তিনি যদি বাচ্চার সাথে শারীরিক নির্যাতন করেন (যেমন লাথি মারা), তবে তা হারাম এবং এর জন্য তিনি আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবেন। আল্লাহ বলেন:
"আর তোমরা তাদের সাথে (স্ত্রীদের সাথে) সদয়ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা নিসা, ৪:১৯)
২. স্ত্রী হিসেবে আপনার কর্তব্য ও সীমা
আপনার কথায় বোঝা যাচ্ছে যে, আপনি ধৈর্য ধরে চুপ থাকলেও সমস্যা হচ্ছে, আবার প্রতিবাদ করলেও স্বামী আরও উত্তেজিত হচ্ছে। তবে ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পরস্পরের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা। আপনি যদি মনে করেন যে, আপনার গালিগালাজ বা চিৎকার করা ছাড়া স্বামী শান্ত হয় না, তবে এটি একটি দুর্বল সমাধান দীর্ঘমেয়াদে নয়। বরং তা আপনাকে "বেয়াদব" করে তুলতে পারে, যা আপনি নিজেই স্বীকার করছেন।
উত্তম পন্থা:
- ধৈর্য (সবর) ও প্রার্থনা: রাগের মুহুর্তে চুপ থাকুন এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা বাকারা, ২:১৫৩)
- ভালোভাবে বোঝান: রাগ কমলে স্বামীকে নরম ভাষায় বোঝান। আপনি বলেন যে, একবার তিনি শান্ত হলে আপনার কথা শোনেন। সেই সুযোগটি কাজে লাগান।
- পরিবারের বড়দের মধ্যস্থতা: স্বামীর পরিবারের সম্মানিত সদস্য (যেমন বাবা-মা বা ভাই) অথবা আপনার পরিবারের কেউ যদি দ্বিনদার হন, তাদের মাধ্যমে সমাধান করুন।
- কাউন্সেলিং: কোনো ইসলামী মনোবিজ্ঞানী বা মসজিদের ইমামের শরণাপন্ন হন।
৩. সন্তানের প্রতি স্বামীর আচরণ কেমন হওয়া উচিত?
শিশুদের সাথে নিষ্ঠুরতা (যেমন বালতিতে চুবানো, লাথি মারা, জোরে জোরে চিৎকার করা) ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসূল (সা.) বলেছেন:
"যে শিশুদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের প্রতি সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (তিরমিযী, হাদীস: ১৯২১)
যদি স্বামী সন্তানকে শারীরিকভাবে আঘাত করে বা মানসিকভাবে ভয় দেখায়, তাহলে মা হিসেবে আপনার কর্তব্য হলো সন্তানকে রক্ষা করা। আপনি সরাসরি বাধা দিতে পারেন। প্রয়োজনে আপনি স্বামীকে স্পষ্টভাবে বলুন:
"আপনি যদি সন্তানকে লাথি মারেন বা এমন আচরণ করেন, তবে আমি আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব।"
ইসলামী রাষ্ট্রে কোনো ব্যক্তি যদি সন্তানের ক্ষতি করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আপনি স্থানীয় মাদ্রাসা বা ইসলামিক সংস্থার সাহায্য চাইতে পারেন।
৪. হজ-এর পরেও আচরণ না বদলালে কী করবেন?
হজ একটি পবিত্র ইবাদত, যা মানুষকে পরিবর্তন করে। যদি আপনার স্বামী হজ করার পরেও তার আচরণ না বদলায়, তবে এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে আপনি তার জন্য দোয়া করতে থাকুন এবং ধৈর্য ধরুন। তবে যদি পরিস্থিতি অসহনীয় হয়, তাহলে আপনি ফিকাহবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নিতে পারেন:
ক. পৃথক থাকা:
তালাক না দিয়ে কিছুদিন আলাদা থাকার চেষ্টা করুন (যেমন আপাতত বাবার বাড়ি চলে যাওয়া)। এতে তিনি তার ভুল বুঝতে পারবেন।
খ. তালাকের ইচ্ছা:
যদি কোনোভাবেই সংসার চালানো সম্ভব না হয় এবং স্বামী পরিবর্তন না হয়, তাহলে ইসলামে তালাকের অনুমতি আছে। তবে এটি সর্বশেষ সমাধান। কুরআনে বলা হয়েছে:
"তবে যদি তারা পৃথক হয়ে যায়, তবে আল্লাহ তাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অনুগ্রহে সমৃদ্ধ করবেন।" (সূরা নিসা, ৪:১৩০)
৫. বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয়:
- রাগের সময় নীরব থাকুন: স্বামী যখন রাগান্বিত থাকেন, তখন কোনো কথা বলবেন না। চুপ থাকুন। তিনি যদি প্রশ্ন করতে থাকেন, তাহলে বলুন: "দয়া করে এখন বিরক্ত করবেন না। আমি পরে কথা বলবো।"
- বাচ্চাকে নিরাপদে রাখুন: যখনই স্বামী বাচ্চার প্রতি রাগ দেখান, বাচ্চাকে সরিয়ে নিন। তাকে অন্য ঘরে নিয়ে যান। প্রয়োজনে বাচ্চাকে আপনার বাবা বা আত্মীয়ের বাসায় পাঠিয়ে দিন।
- নিজের মানসিক স্বাস্থ্য: আপনি যদি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহলে একজন ডাক্তারের কাছে যান। ইসলামে নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া ফরজ।
উপসংহার:
আপনার উচিত সর্বোচ্চ ধৈর্য ধরা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। তবে যদি স্বামীর আচরণে আপনার ও সন্তানের জীবন দুর্বিষহ হয় এবং কোনো পরিবর্তন না হয়, তাহলে ইসলামী পদ্ধতিতে বিচ্ছেদের পথ বিবেচনা করতে পারেন। আল্লাহ কখনো অত্যাচারীকে ভালোবাসেন না।
আপনার জন্য দোয়া:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
(সূরা ফুরকান, ২৫:৭৪)