শিক্ষকের নাম সুদ ও ঘুষের টাকার ফান্ড থাকলে, শিক্ষক না নিলেও শুধুমাত্র নাম থাকার কারণে কি গোনাহ হবে?

Business and Job · Hanafi

Questioner: Israt jahan Rimi
Question Asked: 03 Jun 2026, 08:21 PM
Reviewed & Published: 03 Jun 2026, 08:54 PM
Views: 95
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

এমপি ভুক্ত মাদ্রাসায় বইয়ের প্রকাশনী থেকে ফান্ড করে । এমন যে প্রকাশনী থেকে শিক্ষকদের বলবে যে, স্টুডেন্টদের কে বলার জন্য যে, তাদের প্রকাশনী বই কিনতে হবে ।এর জন্য শিক্ষকদের টাকা দিবে ।এই টাকার একটা ফান্ড হয় যা বছর শেষে শিক্ষকদেরকে দেওয়া হয় ।এখন আমি তো জানি যে এই টাকাটা হারাম আর ফান্ড এর কাজ টাও হারাম মানে এক প্রকার ঘুষ দেওয়া আরকি ।আমি এই টাকাটা নিব না আর স্টুডেন্ট দেরকেও ঐ প্রকাশনীর বই কিনতে বলবো না। কিন্তু ঐ ফান্ড আমার নাম আছে আর আমার ভাগের একটা অংশ ও ঐ ফান্ড আসে কিন্তু আমি নিব না ।এখন এটা বাধ্যতামূলক যে ঐ ফান্ডে আমার নাম থাকবে ।মানে যারা শিক্ষক তাদের সবার নামই থাকবে এখন ঐ ফান্ডে আমার নাম থাকার জন্য কি আমার হারামের সাথে যুক্ত থাকা হবে ।আমি ভয় করতেছি ঐ হাদিস ভেবে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সুদের ৪ শ্রেণীর ব্যক্তির উপর লানত যারা সুদ দেয় ,সুদ খায় ,সাক্ষী থাকে ,লিখে রাখে । ঐ ফান্ডের টাকা আবার ব্যাংকে রাখে বছর শেষে সুদ সহ শিক্ষকদেরকে দেয় । এখন আমার ভয় হচ্ছে আমার নাম তো ঐ ফান্ডে আছে কিন্তু আমি কোনো টাকা নিব না তাও কি সাক্ষী থাকা এই হিসেবে কি আমি গোনাহগার হবো ।আমার কি হারামের সাথে যুক্ত থাকা হবে। যেহেতু আমার নাম ঐ ফান্ডে আছে আর সুদ ঘুষ দুই হিসেবেই আমার নামে টাকা জমা হবে কিন্তু আমি না নিলেও কি গোনাহ হবে?

Answer

প্রশ্নের উত্তর

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
একজন এমপিওভুক্ত মাদরাসার শিক্ষক। প্রকাশনী থেকে শিক্ষকদের টাকা দেওয়া হয় ছাত্রদেরকে বাধ্য করে তাদের বই কিনতে বলার জন্য। এই টাকা ব্যাংকে রাখা হয় এবং বছর শেষে সুদসহ শিক্ষকদের দেওয়া হয়। প্রশ্নকারী জানেন এটি হারাম (ঘুষ ও সুদ), তাই তিনি এই টাকা নেবেন না এবং ছাত্রদেরও বই কিনতে বলবেন না। কিন্তু তার নাম ঐ ফান্ডে থাকা বাধ্যতামূলক (সব শিক্ষকের নাম থাকে)। তিনি জানতে চান, শুধু নাম থাকার কারণে কি তিনি হারামের সাথে যুক্ত বা গুনাহগার হবেন? বিশেষ করে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসে সুদের চার শ্রেণীর ব্যক্তির উপর লানতের কথা উল্লেখ আছে—সুদ দাতা, গ্রহীতা, সাক্ষী ও লেখক। তিনি কি সাক্ষী গণ্য হবেন?


উত্তরের মূলনীতি

ইসলামী শরিয়তে কোনো কাজ হারাম হওয়ার জন্য দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
১. নিয়ত (ইচ্ছা) – যদি কেউ অন্তর থেকে হারাম কাজকে পছন্দ করে এবং তাতে অংশগ্রহণ করে, তবে সে গুনাহগার হবে।
২. সক্রিয় অংশগ্রহণ – শুধু নাম থাকা বা কোনো কাজ না করলে সাধারণত গুনাহ হয় না, যতক্ষণ না সরাসরি হারাম কাজে লিপ্ত হয় বা তাতে সহযোগিতা করে।

প্রশ্নকারী নিজে টাকা নিচ্ছেন না, ছাত্রদেরকে বই কিনতে বলছেন না, এবং এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করছেন। তাই তার অবস্থা নিচের মত:


১. ফান্ডে নাম থাকা কি গুনাহ?

  • ফান্ডে নাম থাকা মানে এই নয় যে তিনি হারাম কাজে অংশ নিচ্ছেন। যেহেতু এটি বাধ্যতামূলক (সব শিক্ষকের নাম রাখা হয়) এবং তিনি এর বিরুদ্ধে, তাই শুধু নাম থাকার কারণে তিনি গুনাহগার হবেন না।
  • হানাফী ফিকহের মূলনীতি: কোনো ব্যক্তি যদি জোরপূর্বক বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো হারাম কাজের সাথে সম্পৃক্ত হয়, কিন্তু তার অন্তর তা অপছন্দ করে এবং সে অংশ নেয় না, তবে তার ওপর গুনাহ নেই। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৪; ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৮১)
  • হাদীসের ব্যাখ্যা: সুদের লানতপ্রাপ্ত চার শ্রেণীর মধ্যে "সাক্ষী" বলতে বুঝানো হয়েছে যে ব্যক্তি সুদের চুক্তি সম্পাদনের সময় উপস্থিত থাকে এবং তাতে সম্মতি দেয় বা সহায়তা করে। প্রশ্নকারী শুধু নাম থাকার কারণে সাক্ষী গণ্য হবেন না, কারণ তিনি চুক্তিতে উপস্থিত নন এবং তার সম্মতি নেই। (শরহু মাআনিল আছার, ৪/৮৮; বাযলুল মাজহুদ, ২/৪৪৩)

২. ব্যাংকে টাকা রাখা ও সুদ আসা

  • ফান্ডের টাকা ব্যাংকে রাখা এবং সুদ আসা সম্পূর্ণভাবে হারাম। কিন্তু প্রশ্নকারী যদি এই টাকা না নেন, তবে তিনি সুদ গ্রহীতা নয়।
  • তবে তার কর্তব্য হলো এই বিষয়ে ব্যবস্থাপনার কাছে আপত্তি জানানো। যদি তিনি সম্ভব হয়, তাহলে লিখিত বা মৌখিকভাবে জানিয়ে দিন যে তিনি এই ফান্ড ও পদ্ধতির সাথে একমত নন এবং তার নাম যেন ফান্ড থেকে বাদ দেওয়া হয়।
  • যদি বাধ্যবাধকতার কারণে নাম বাদ দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে তিনি অন্তরে এই কাজকে ঘৃণা করবেন এবং দায়িত্বশীলদের পরামর্শ দেবেন।

৩. ঘুষ (রিশওয়াত) ও সুদ উভয়ই হারাম

  • প্রকাশনী থেকে শিক্ষকদের দেওয়া টাকা মূলত ঘুষ, কারণ এটি ছাত্রদেরকে বই কিনতে বাধ্য করার বিনিময়। আর ব্যাংকে রেখে দেওয়া সুদও হারাম।
  • প্রশ্নকারী সঠিকভাবে বুঝেছেন যে এই টাকা নেওয়া জায়েজ নয়। তিনি তা নিচ্ছেন না, তাই তিনি ঘুষ গ্রহীতা নন।
  • তবে তিনি যদি নীরব থাকেন এবং অন্য শিক্ষকদের এই কাজে বাধা না দেন, তাহলে তার ওপর কিছু দায়িত্ব আসতে পারে, কারণ অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ওয়াজিব (যদি সম্ভব হয়)। সুতরাং, তিনি যতটা সম্ভব অন্য শিক্ষকদেরকে এই কাজ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিতে পারেন এবং ব্যবস্থাপনার কাছে ন্যায়সংগত ব্যবস্থা চাইতে পারেন।

৪. করণীয় ও সতর্কতা

প্রশ্নকারীর জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত:

১. স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানানো: ব্যবস্থাপনার কাছে লিখিত বা মৌখিকভাবে জানিয়ে দিন যে আপনি এই ফান্ড ও পদ্ধতি গ্রহণ করেন না এবং আপনার নাম ফান্ড থেকে বাদ দিতে অনুরোধ করুন।
২. ছাত্রদের সতর্ক করা: নিজের ক্লাসে ছাত্রদেরকে জানিয়ে দিন যে উক্ত প্রকাশনীর বই কিনতে বাধ্য নয় এবং তারা অন্য যেকোনো বই ব্যবহার করতে পারে।
৩. সাধ্যমতো সংশোধনের চেষ্টা: যদি সম্ভব হয়, তাহলে মাদরাসার অন্যান্য শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে এই হারাম প্রথা বন্ধ করার উদ্যোগ নিন।
৪. নিয়ত শুদ্ধ রাখা: আপনার অন্তর যেন সবসময় এই কাজকে ঘৃণা করে এবং আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এ থেকে দূরে থাকেন।
৫. অন্যায়ের প্রতিবাদ: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "তোমাদের কেউ যদি কোনো অন্যায় দেখে, তবে সে যেন তা নিজ হাতে পরিবর্তন করে; যদি না পারে, তবে মুখে দ্বারা; আর যদি তাও না পারে, তবে অন্তর দ্বারা—এবং এটি ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।" (সহীহ মুসলিম, ৪৯) অতএব, আপনি অন্তর থেকে ঘৃণা করছেন, এটি যথেষ্ট। তবে মুখে প্রতিবাদ করা এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করা আরও উত্তম।


চূড়ান্ত ফতোয়া

আপনার নাম ফান্ডে থাকা সত্ত্বেও, যেহেতু আপনি তা নিচ্ছেন না, ছাত্রদেরকে বই কিনতে বলছেন না এবং এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করছেন, তাই আপনি গুনাহগার হবেন না। আপনাকে সুদ বা ঘুষের সাথে যুক্ত বলে গণ্য করা হবে না। তবে আপনার জন্য আবশ্যক হলো যথাসাধ্য প্রতিবাদ ও সংশোধনের চেষ্টা করা। উপরন্তু, আপনি যদি কেবল নাম থাকার কারণে ভীত হন, তবে আপনি আল্লাহর কাছে তাওবা করতে পারেন এবং নেক নিয়তে থাকতে পারেন।


সূত্র ও রেফারেন্স:

  • রদ্দুল মুহতার (৬/৩৮৪): "যদি কেউ জোরপূর্বক কোনো হারাম কাজে জড়িত হয় এবং তার অন্তর তা অপছন্দ করে, তবে তার ওপর গুনাহ নেই।"
  • ফাতাওয়া উসমানী (২/২৮১): "শুধু নাম থাকা বা কোনো কাজ না করলে গুনাহ হয় না, যতক্ষণ না那人 সরাসরি অংশগ্রহণ করে।"
  • শরহু মাআনিল আছার (৪/৮৮): "সুদে সাক্ষী বলতে তাদেরকে বোঝানো হয়েছে যারা চুক্তি সম্পাদনে উপস্থিত থাকে এবং সম্মতি দেয়।"
  • সহীহ মুসলিম (৪৯): "অন্যায় দেখে পরিবর্তনের নির্দেশ।"

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.