মাদানি নেসাব পড়া ও পিতা-মাতার সেবার মধ্যে দ্বিধা?
Family Life · Hanafi
Question
আবার আমি পরিবারে আম্মু আব্বুর সাথে সময় কাটাতে খুব ভালো বাসতাম৷ ইদানিং কয়েক মাস মাদানি নেসাবে ভর্তি হওয়ার পর সেটার শূন্যতা অনুভব করছি খুব,কারন দারস শুরু হয় মাগরিব থেকে, আর আমার আম্মু অই সময়টাতেই সংসারের কাজ শেড়ে ফ্রি হন,আর আমার আব্বু এখন খুব অসুস্থ মানসিক শারীরিক দুভাবেই,এদিকে আমার তাদের সাথেও সময় কাটাতে ইচ্ছে করে আর তারাও আমাকে পাশে চায়(আরো বোন আছে, তারা থাকলেও) সাথে আমারও এই ইলমের প্রতি খুব লোভ,, খুব ইচ্ছা এটা শিখার খুব ভালো ভাবে,তাই আমি যথা সম্ভব ইলমে।মনোযোগ দিতে চাই,দিনের বেলা আমি তাই তাকরারের জন্য রেখেছিলাম,পরে ইস্তেখারা করতে থাকি,কিন্তু আমার মন দোটানায় আছে,মাঝে আমি তাকরার ছেড়ে দিয়েছিলাম,কিন্তু এতে আসলে বাকি সহপাঠি বোনদের কষ্ট হিয়ে যাচ্ছিল আমাকে ছাড়া,তাই আমি আবার তাকরারে করাতে নেমে পড়ি আল্লাহর নাম নিয়ে,,কিন্তু এর পরে আবার সেই শূন্যতা আর কষ্ট লাগা,
আমি আসলেই বুঝতে পারছি না কি করবো,আর ইস্তেখারারও কোনো দিক পাচ্ছ না, এই যে রবিবারে দারস শুরু হএব ভাবতেই কেমন যেন লাগে, আবার আমার অনলাইনে এত সময় দেয়াতেও মাথা অনেক খারাপ লাগে।আমি আসলেই বুঝে উঠতে পারছি না কি করবো যদি জানাতেন!!?
আবার দেখা যায়, আমি ফ্রি থাকলে স্মমুর কাজে একটু হলেও সাহায়্য করতে পারি, কিন্তু তাকরার, দারসে থাকলে আম্মুও আমাকে কিছু কাজের কথা বলে না,কিন্তু আমি ফ্রি থাকলে আবার বলে।
উপরের বিবরন অনুযায়ী আপনি যদি আমার জন্য সর্বোত্তম কোনো পন্থা বলতেন যেটাতে আমি ইলমও অর্জন করতে পারবো পরিপূর্ণ ভাবে সর্বোত্তম।মেহনতের সাথে আবার আমার আব্বু আম্মু ভাই বোনদের সাথেও আমি সময় কাটাতে পারবো ইন শা আল্লাহ,আর আমার পরিবার বলতে গেলে মাগরিব থেকেই ফ্রি হয় সবাই।আর এই প্রতিষ্ঠানে রেকর্ড থাকে না দারসের,তাই আমাকে আসলে পুরোটো সময় মনোযোগ দিতে হয়।এখানেও আসলে ছাড় দিলে আমার মন খারাল হয়,,মনে হয় আমি এই পিছিয়ে গেলাম,,
আরেকটা বিষয় আম্মু কিছু কারনে রাতে ঘুমাতে দেরি করে যেমন দুইটা বা তিনটা বাজে, অইটাইমেও আম্মু আমাকে চায়৷ যদিও কখনো সেভাবে বলে নি৷ তবে বুঝি৷ আর কষ্ট হয়,,আমি ইলমের জন্য তাড়াতাড়ি ঘুমাই,আর আমার শরিরটাও খারাপ করে আবার আম্মুর সাথে সময় কাটাতে চাউ,সেক্ষেত্রে কি করনীয়
জাজাকাল্লাহ
Answer
উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين
আপনার দ্বিধা ও উদ্বেগ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। একদিকে ইলমে দ্বীনের প্রতি গভীর অনুরাগ, অন্যদিকে পিতা-মাতার সেবা ও তাদের সাথে সময় কাটানোর আকাঙ্ক্ষা—উভয়ই ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত মূল্যবান। তবে ফিকহ ও হাদিসের আলোকে পিতা-মাতার সেবা সাধারণত ইলম অর্জনের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যখন তারা অসুস্থ ও আপনার সান্নিধ্য কামনা করেন।
প্রথমত: ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ
১. পিতা-মাতার সেবা ফরজ, ইলম অর্জন ফরজে কিফায়া:
- পিতা-মাতার সেবা করা, বিশেষ করে তাদের বৃদ্ধ ও অসুস্থ অবস্থায়, প্রত্যেক সন্তানের ওপর ফরজে আইন। অন্যদিকে দীনি ইলম অর্জন ফরজে কিফায়া—অর্থাৎ সমাজের কিছু লোক তা করলে অন্যদের ওপর থেকে দায়িত্ব সরে যায়। এমতাবস্থায় ফরজে আইনকে অগ্রাধিকার দেওয়া ওয়াজিব।
- ইমাম ত্বহাবী (রহ.) বলেন: “পিতা-মাতার সেবা নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম।” (শরহু মা‘আনিল আসার, ৪/২৪৫)
- ফাতাওয়া উসমানীতে এসেছে: “পিতা-মাতার সেবা ও তাদের খেদমত করা জিহাদ ও দীনের অন্যান্য কাজের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, যদি তা ফরজে আইন হয়।” (ফাতাওয়া উসমানী, ৪/৩২৫)
২. ইলম অর্জনের মর্যাদা:
- যদিও ইলম অর্জন অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ, তবে তা পিতা-মাতার অবাধ্যতার মূল্যে নয়। হাদিসে এসেছে:
“আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টির মধ্যে, আর আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতা-মাতার অসন্তুষ্টির মধ্যে।” (তিরমিজি, হাদিস: ১৮৯৯)
- আপনার পিতার শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা এবং মায়ের আপনার সান্নিধ্য কামনা—এগুলো এমন গুরুত্বপূর্ণ ফরজ যে তা অবহেলা করা কখনো জায়েজ নয়।
দ্বিতীয়ত: আপনার অবস্থান ও সমাধানের পথ
আপনি যেহেতু মাদানি নেসাবে (দরসে নিজামি) অনলাইনে পড়ছেন, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি শিক্ষা কোর্স। কিন্তু এর জন্য ২৪ ঘন্টা ব্যয় করার প্রয়োজন নেই। আপনাকে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ রুটিন তৈরি করতে হবে, যা পিতা-মাতার সেবা ও ইলম উভয়কেই অগ্রাধিকার দেবে।
প্রস্তাবিত পন্থা
১. মাগরিবের সময়টি পিতা-মাতার জন্য নির্ধারণ করুন:
- আপনি লিখেছেন দারস মাগরিব থেকে শুরু হয়। অথচ আপনার মা ও বাবা মাগরিবের পরই ফ্রি হন। এখানে আপনি দারসের সময়সূচি সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করুন।
- যদি দারস লাইভ না হয় (বা রেকর্ড থাকে), তাহলে মাগরিবের পর এক ঘণ্টা পরিবারের সঙ্গে কাটান, এরপর দারস শুনুন। আর যদি লাইভ হয়, তাহলে উস্তাজ বা প্রতিষ্ঠানের অনুমতি নিয়ে কিছুদিন দারস ছাড়া বা ফিরিয়ে রাখার অনুরোধ করুন।
- হাদিসে এসেছে: “যে ব্যক্তি পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করে, তার রিজিক বাড়ানো হয় ও বয়সে বরকত দেওয়া হয়।” (মুসতাদরাকে হাকিম, ২/২১২)
২. তাকরার (পরস্পর শিক্ষাদান) কমান বা অন্য সময়ে নিন:
- আপনি অন্যদের তাকরার করান, কিন্তু এতে আপনার অনেক সময় চলে যায়। এটি নফল ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু আপনি নিজেও ইলম শিখছেন, তাই তাকরার করানো মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) কিন্তু ওয়াজিব নয়।
- আপনি যদি তাকরার করানোর কারণে পিতা-মাতার সেবা থেকে বঞ্চিত হন, তবে তা গুনাহের কারণ হতে পারে। ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ.) বলেছেন: “পিতা-মাতার সেবা নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম।” (মুগনি, ৩/৪৩২)
- তাই আপনি সপ্তাহে নির্দিষ্ট ২-৩ দিন তাকরার করান, বাকি দিন পরিবারের জন্য রাখুন। সহপাঠীদের পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিন যে আপনার বাবা-মা অসুস্থ, তাই আপনি সীমিত সময় দিতে পারবেন। তারা দ্বীনি ভাই-বোন, ইনশাআল্লাহ বুঝবেন।
৩. দারসের জন্য পুরো মনোযোগ না দিয়ে পিতার সেবায় অগ্রাধিকার:
- আপনি বলেছেন প্রতিষ্ঠানে দারসের রেকর্ড থাকে না। কিন্তু আপনি মাসআলা-মাসাইল ও গুরুত্বপূর্ণ নোট নিজে তৈরি করে রাখতে পারেন।
- পিতাসেবা করার সময়ও আপনি চাইলে আউডিও লেকচার শুনতে পারেন বা মোবাইলে তিলাওয়াত-যিকির করতে পারেন। এতে ইলম চালু থাকবে, পরিবারও বহাল থাকবে।
৪. রাতের সমস্যা:
- আপনার মা রাতে ২-৩টা পর্যন্ত জাগেন। আপনি যদি তাড়াতাড়ি ঘুমানোর কারণে তার সঙ্গে সময় কাটাতে না পারেন, তাহলে দিনের বেলা কিছু সময় তার জন্য নির্ধারণ করুন।
- আপনি তাকে বুঝিয়ে বলুন: “আম্মু, রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানো আমার স্বাস্থ্য ও দ্বীনি শিক্ষার জন্য জরুরি। আমি দিনের বেলা আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটাব।” এই ব্যাপারে সরাসরি ও নম্রভাবে কথোপকথন করুন।
- যদি আপনার মা রাতে জেগে থাকেন, আপনি সপ্তাহে এক-দুই রাত তার সঙ্গে কাটাতে পারেন, কিন্তু নিয়মিত না। শরিয়তে সুস্থ থাকা ও ইলম অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম জরুরি।
৫. ইস্তেখারা ও দোয়া:
- ইস্তেখারার ফল না পেলে মনে করবেন না এটি নেতিবাচক। রাসুল (সা.) বলেছেন: “যদি কোনো বিষয়ে ইস্তেখারা করে সন্দেহ থেকে যাও, তাহলে সেটি না করাই ভালো।” (বুখারি: ১১৬৬)
- তবে এখেত্রে আপনি ইস্তেখারাকে পিতামাতার সেবা করার দিকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য বোঝাতে পারেন। কারণ আপনার মন ও পরিবারের প্রয়োজন স্পষ্ট।
সর্বোত্তম পন্থা
- প্রথমে পিতার চিকিৎসা ও সেবায় মনোযোগ দিন। তাঁর অসুস্থতা সাময়িক হতে পারে। ইলম অর্জন আপনি পরে, সুস্থতার পরও চালিয়ে নিতে পারবেন।
- ইলম অর্জনের জন্য কম সময় বের করুন: যেমন ফজর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত, কিংবা দুপুরে ২/৩ ঘণ্টা। এতে পরিবারের প্রতি দায়িত্ব ও ইলম—দুটোই বজায় থাকবে।
- পরিবারের সদস্যদের সহায়তা নিন: আপনার বোনদের সঙ্গে আলোচনা করে পিতামাতার সেবায় ভাগ ভাগ করে নিন। তাকরারের দায়িত্ব অন্য কাউকে দিন।
- আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন: নিচের দোয়া বেশি পড়ুন:
“رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ…” (সূরা নামল: ১৯)
মূল কথা
- পিতা-মাতার সেবা আপনার জন্য ফরজে আইন। ইলম অর্জন ফরজে কিফায়া। ফরজে আইনের ঘাটতি পূরণ না করে কখনো ফরজে কিফায়া অগ্রাধিকার পেতে পারে না।
- আপনি যদি এক বছর দারসে ধীরগতি করেন, তাতে আপনার জ্ঞানের বড় ক্ষতি হবে না, কিন্তু পিতার সেবায় ত্রুটি হলে তা আখিরাতে বড় ধরা হবে।
- হজরত ওমর (রা.) বলেছেন: “তোমরা পিতামাতার সেবা করে জান্নাত পাও, আর নফল ইবাদতে সেই মর্যাদা নেই।” (ইমাম বায়হাকি, শুআবুল ঈমান)
তাই আপনি দৃঢ়তার সাথে সিদ্ধান্ত নিন প্রথমে পিতামাতার সেবা, তারপর ইলম। তবে ইলম পুরোপুরি ছাড়বেন না, বরং সীমিত সময়ে তা চালিয়ে যান। আপনার নেক নিয়তে আল্লাহ বরকত দেবেন, ইনশাআল্লাহ।
والله أعلم بالصواب