কবিরাজ দ্বারা ঘর বন্ধ করা কি জায়েজ? এগুলো কি কুরআন সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত?

Sunnah and Bid'ah · Hanafi

Questioner: Jakia Khanam
Question Asked: 04 Jun 2026, 05:09 PM
Reviewed & Published: 04 Jun 2026, 05:15 PM
Views: 100
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ইসলামে ঘর বন্ধ কতটুকু জায়েজ আছে? ফ্যামিলিকে না বুঝিয়ে উঠতে পারলে করনীয় কি? অনেক ভাবে বুঝানো হয়েছে তারপর ও বুঝতে চায় না, বলে এ ঘরে অনেক সমস্যা এমন আমলে হবেনা কঠিন ভাবে বন্ধ করা লাগবে? কিন্তু এগুলা বেশির ভাগই করে কবিরাজ টাইপ এর লোকজন কিভাবে সুন্নাহ অনুযায়ী করা যাবে?

Answer

উত্তর:
প্রশ্নে উল্লিখিত ‘ঘর বন্ধ’ বা ঘরকে কোনো বিশেষ আমল বা পদ্ধতির মাধ্যমে ‘সুরক্ষিত’ করার প্রচলন ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকে যাচাই করতে হবে। ইসলামে ঘরকে জিন, শয়তান বা ক্ষতিকর বস্তু থেকে বাঁচানোর জন্য বৈধ পদ্ধতি রয়েছে, তবে ‘কবিরাজ’ বা জাদুকরদের মাধ্যমে অপরিচিত কালাম ও বাক্য দ্বারা ‘বন্ধ’ করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও শিরকের পর্যায়ভুক্ত। নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো।

১. ইসলামে ঘর বন্ধের বৈধ ও সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঘরকে জিন ও শয়তান থেকে বাঁচানোর জন্য নিম্নোক্ত আমল শিখিয়েছেন:

  • আয়াতুল কুরসি পড়া: ঘর থেকে বের হওয়ার সময়, ঘরে প্রবেশের সময়, এবং শোয়ার আগে আয়াতুল কুরসি পড়লে আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘর সুরক্ষিত থাকে। (বুখারি, ২৩১১; মুসলিম, ২৭১০)
  • সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়া: সকাল-সন্ধ্যা এবং শোয়ার আগে তিনবার করে পড়া সুন্নত। (বুখারি, ৫০১৭; মুসলিম, ২৭২০)
  • মাসনূন যিকির ও দোয়া: যেমন, ‘بِسْمِ اللهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ’ (সকাল-সন্ধ্যা তিনবার) – আবু দাউদ, তিরমিযি।
  • ঘরের কোণে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত: রাসূল (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি রাতে সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়ে, তা তার জন্য কাফি (যথেষ্ট) হয়। (বুখারি, ৪০০৯)
  • ঘরের ভেতর তিলাওয়াত ও জিকির: ঘরে কুরআন তিলাওয়াত ও জিকির করলে ঘর জিন ও শয়তানের জন্য অসহনীয় হয়ে যায়। (মুসলিম, ৭৮০)

এই পদ্ধতিগুলোই সুন্নাহসম্মত ‘ঘর বন্ধ’। এতে কোনো প্রকার কবিরাজি, তাবিজ-কবজ, ঝাড়ফুঁক বা কঠোর পদ্ধতির প্রয়োজন নেই।

২. ‘কবিরাজ’ বা জাদুকরদের মাধ্যমে কঠিন বন্ধ করা জায়েজ নয় ।

কবিরাজ, জ্যোতিষী বা তান্ত্রিকদের মাধ্যমে ঘর ‘বন্ধ’ করা বা কোনো ‘আমল’ করানো সম্পূর্ণ হারাম ও শিরক। কেননা তারা প্রায়ই জিনের সাহায্য নেয়, অশুদ্ধ সুর ও মন্ত্র পড়ে, অথবা আল্লাহ ব্যতীত অন্যদের থেকে সাহায্য চায়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-সহ সমস্ত হানাফি ফকিহ এ ধরনের কাজকে হারাম বলেছেন। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৮)

  • কুরআন ও হাদিসে জাদুকর ও গণকের আশ্রয় নেওয়া কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে যায় এবং তাকে কিছু জিজ্ঞেস করে, তার চল্লিশ দিনের নামাজ কবুল হয় না।” (মুসলিম, ২২৩০)
  • কবিরাজদের মাধ্যমে ‘ঘর বন্ধ’ করলে তাতে বিশ্বাস রাখা শিরকে পৌঁছাতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে (কাফিরদের) শিক্ষা দেয়… যে জাদু করে তার ক্ষতি হয়, লাভ নয়।” (সূরা বাকারা, ১০২)

৩. পরিবার যদি না বুঝে এবং কবিরাজের কাছে যেতে চায় তবে করণীয়

পরিবারকে সঠিকভাবে বোঝানোর পরও যদি তারা কবিরাজের মাধ্যমে ‘কঠিন বন্ধ’ করার পীড়াপীড়ি করে, তাহলে নিম্নোক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করুন:

  • ধৈর্য ও হিকমতের সাথে পুনরায় বোঝান: প্রমাণসহ বোঝান যে সুন্নাহতে কোনো কঠোর আমল নেই। বরং কুরআন তিলাওয়াত ও যিকিরই যথেষ্ট। আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন, “সুন্নাহ অনুযায়ী বাঁচা–ই যথেষ্ট, বাড়তি কিছু লাগে না।” (বেহেশতি জেওর, ৩/৪০)
  • নিজে সুন্নাহ আমল চালিয়ে যান: যদি পরিবার কবিরাজের কাজ করায় জোর না করে, তবে আপনি নিজে সুন্নাহ আমল করে ঘরকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন, “যে নিজের ঘরে কুরআন পড়ে এবং নামাজ পড়ে, তার ঘর মালাইকায় পূর্ণ হয় এবং শয়তান পালায়।” (রদ্দুল মুহতার, ১/৬৫৬)
  • স্পষ্টভাবে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকুন: যদি পরিবার কবিরাজের মাধ্যমে কোনো ‘বন্ধ’ করে, তবে আপনি তাতে বিশ্বাস করবেন না এবং সহযোগিতা করবেন না। আল্লাহ বলেন, “তোমরা অসত্যকে মিথ্যা বলো না, আর তাতে অংশগ্রহণ করো না।” (সূরা আল-মায়িদা, ৩)
  • দোয়া করুন: পরিবারের হিদায়াতের জন্য এবং শিরক ও বিদআত থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।

৪. ‘কঠিন বন্ধ’ বা ‘তীব্র আমল’ বলে কিছু নেই

যারা বলে ‘ঘরে অনেক সমস্যা, তাই কঠিন আমল লাগবে’, তারা প্রায়ই অজ্ঞ বা ধোঁকাবাজ। ইসলামে কোনো সমস্যার জন্যই ‘কঠিন বন্ধ’ বা ‘হার্ড কোর’ আমল বিধান করা হয়নি। বরং কুরআন ও হাদিসের সহজ আমলই সবচেয়ে কার্যকর। যেমন:

  • ইমাম কাসানী (রহ.) বলেন, “রুকইয়া (কুরআনী ঝাড়ফুঁক) জায়েজ, তবে তা কুরআনের আয়াত ও জিকির দ্বারা হতে হবে, অজ্ঞেয় মন্ত্র ও তাবিজ নয়।” (বাদায়ি’উস সানায়ি’, ২/২৬৩)
  • মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন, “যে সব তাবিজে কুরআনের আয়াত ও নামের বদলে জিন ও শয়তানের নাম থাকে বা অর্থহীন শব্দ থাকে, তা জায়েজ নয়।” (মাআরিফুল কুরআন, ২/২২৮)

৫. হানাফি ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা

  • রদ্দুল মুহতার (৬/৩৬১) এ এসেছে: “যে ব্যক্তি জাদুকর বা গণকের কাছে গিয়ে কোনো কাজ করায়, তা যদি কেবল কথা হয় তবুও তা গুনাহ; আর যদি তাতে বিশ্বাস রাখে তবে কুফরি পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।”
  • ফাতাওয়া উসমানী (২/৩১২) তে বলা হয়েছে: “ঘর সুরক্ষিত রাখার জন্য আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক ও নাস পড়াই যথেষ্ট। পূর্বপুরুষদের প্রচলিত ‘ঘর বন্ধ’ বা ‘লক’ কোনো সুন্নাহ নয়।”
  • বেহেশতি জেওর (৩/৪১)-এ বলেছেন: “যারা কবিরাজের কাছে গিয়ে বাড়ি ‘বন্ধ’ করায়, তারা মারাত্মক গুনাহগার হয়। বরং নিজেই কুরআন পড়ে ঘরকে সুরক্ষিত করবে।”

সংক্ষিপ্ত উত্তর

  • ইসলামে ঘর বন্ধ জায়েজ কতটুকু? শুধু কুরআন তিলাওয়াত, যিকির, রুকইয়া ও মাসনূন দোয়ার মাধ্যমে সুরক্ষা নেওয়া জায়েজ। কবিরাজি পদ্ধতি, জাদুটোনা, অমঙ্গলমূলক তাবিজ ইত্যাদি হারাম ও শিরক।
  • পরিবার না বুঝলে করণীয়? ধৈর্য নিয়ে বারবার বোঝান, নিজে সুন্নাহ পদ্ধতি মেনে চলুন, কবিরাজের কাজে অংশ নেবেন না।
  • কঠিন বন্দি (হার্ড লক) করা জায়েজ নয়। সব সমস্যার সমাধান কুরআন ও হাদিসের সহজ আমলে আছে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বিদআত ও শিরক থেকে বাঁচান এবং authentic আমল করার তওফিক দিন। (আমিন)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.