স্ত্রী-শাশুড়ি দ্বন্দ্বঃ পারিবারিক শান্তির জন্য স্ত্রীকে কি পৃথক বাসায় রাখা যাবে? পরামর্শ চাই
Family Life · Hanafi
Question
বিগত ৫ বছরে আমার স্ত্রী আর আমার মায়ের দ্বন্দ্ব চলতে চলতে আজ এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে এখন আমাদের সবারই মনে হচ্ছে এক বাসায় তারা দুজন থাকতে পারবে না। খুবই টক্সিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে আছে। দুজনই ভাবছে তারা অনেক ছাড় দিয়ে আসছে। আমিও নিজের মানসিক সুস্থতার জন্য তাদের এখন আলাদা রাখতে চাচ্ছি। আমার প্রথম প্রশ্ন স্ত্রী আলাদা সংসার/বাসা চাইলে তার গুনাহ হবে কিনা? এমনকি যদি কোন কারণ ছাড়া, শুধু নিজের মত আলাদা থাকার ইচ্ছায় ভিন্ন সংসার চায়, তাহলে সে গুনাহগার হবে কিনা? যেহেতু আমার পারিবারিকভাবে ব্যাপারটা ব্ল্যাসফেমির মত। আমার এক আত্মীয় তো বলেছে আখিরাতে কঠিন জবাব দিতে হবে আমার স্ত্রীকে এজন্য যে সে মা-ছেলেকে আলাদা করার "ষড়যন্ত্র" করেছে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন আমি আমার মায়ের জন্য কি কি করলে আমার মায়ের হক আদায় হবে? মা যদি ভাবে আমার স্ত্রী কে আলাদা রাখার অনুমতি/সুযোগ দিয়ে আমি মায়ের সাথে অন্যায় করেছি তাহলে সেটা ঠিক হবে কিনা? যেহেতু তিনি বিধবা এবং তার আরেকটি মেয়ে আছে যে বিবাহিত। তবে মা আর্থিকভাবে সচ্ছল আলহামদুলিল্লাহ। পেনশনের টাকা পান এবং নিজের নামের একটি ফ্ল্যাটও আছে। অপরদিকে আমি বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি এবং আলাদা (ছোট) বাসা নেয়ার সামর্থ আমার আছে আলহামদুলিল্লাহ। আমার ছোট ২ টি মেয়ে আছে আলহামদুলিল্লাহ।
উল্লেখ্য, বিগত ৫ বছরে মা অনেকবার আলাদা হয়ে যেতে চেয়েছেন, কিন্তু আমি দেই নি। আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করেছিলাম (যদিও ব্যর্থ), কিন্তু এখন আলাদা হওয়াতেই সবার কম ক্ষতি হবে বলে ধারণা করছি। আমি খুবই ইন্ট্রোভার্ট এবং এসব ব্যাপারে মানুষের সাথে কথা বলতে খুবই অস্বস্তি বোধ করি। আমি একজন বিজ্ঞ আলেমের সুপরামর্শ কামনা করছি। জাযাকাল্লাহ
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমত, আপনার পারিবারিক সমস্যার জন্য আমি অত্যন্ত দুঃখিত। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি যেখানে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
প্রথম প্রশ্ন: স্ত্রীর আলাদা বাসা চাওয়া কি গুনাহ?
ইসলামের দৃষ্টিতে, একজন স্ত্রীর জন্য স্বামীর পরিবারের সাথে (বিশেষ করে শাশুড়ির সাথে) এক বাসায় থাকা ফরজ বা ওয়াজিব নয়। বরং স্ত্রীর অধিকার হলো স্বামী তার জন্য পৃথক ও উপযুক্ত আবাসনের ব্যবস্থা করবে। [সূরা আত-তালাক: ৬, আল-হিদায়াহ, ২/৩৪২]
তবে শরীয়তে স্ত্রীর জন্য উচিত হলো সম্ভব হলে স্বামীর পরিবারের সাথে সদ্ভাবে বসবাস করা। কিন্তু যদি পরিবেশ বিষাক্ত হয় এবং দ্বন্দ্বের কারণে পারিবারিক শান্তি নষ্ট হয়, তাহলে স্ত্রীর জন্য পৃথক বাসায় থাকা জায়েজ এবং গুনাহ নয়। বিশেষ করে যখন:
- দ্বন্দ্বের কারণে স্বামীর মানসিক ও পারিবারিক শান্তি নষ্ট হয়।
- সন্তানেরা বিষাক্ত পরিবেশের মধ্যে বড় হচ্ছে বলে মনে হয়।
- মা-ও আলাদা থাকতে চেয়েছিলেন (যেমন আপনি বলেছেন)।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, স্ত্রী যদি স্বামীর পরিবারের সাথে একত্রে বসবাসে অক্ষম হয়, তাহলে স্বামী তার জন্য পৃথক বাসার ব্যবস্থা করবে। [রাদ্দুল মুহতার, ৩/৫৯৭;ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৫৫৮]
আপনার আত্মীয়ের মন্তব্য যে "মা-ছেলেকে আলাদা করার ষড়যন্ত্র" - এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। আপনার স্ত্রী আলাদা বাসা চেয়ে কোনো ষড়যন্ত্র করছে না, বরং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাসের বৈধ অধিকার চাচ্ছে। এতে তার কোনো গুনাহ নেই।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: মায়ের হক কীভাবে আদায় করবেন?
মায়ের প্রতি আপনার দায়িত্ব অপরিবর্তিত থাকবে, এমনকি স্ত্রী আলাদা থাকলেও। মায়ের হক আদায়ের জন্য:
- মায়ের সাথে নিয়মিত সাক্ষাৎ: সপ্তাহে অন্তত ২-৩ বার মায়ের সাথে দেখা করবেন এবং তার খোঁজ নিবেন। [ফাতাওয়া হাক্কানিয়া, ৬/২০৯]
- আর্থিক সহায়তা: মা আর্থিকভাবে সচ্ছল হলেও, তার প্রয়োজন অনুযায়ী খরচ দিবেন।
- সময় ও মনোযোগ: মায়ের জন্য আপনার সময় বরাদ্দ রাখবেন। তাকে একা অনুভব করতে কখনো দিবেন না।
- মায়ের সম্মান রক্ষা: স্ত্রীকে মায়ের বিরুদ্ধে কথা না বলতে বলুন। তবে মাকেও বুঝিয়ে বলুন যে স্ত্রী তার অধিকার চাচ্ছে, অসম্মান নয়।
সর্বোপরি একথা মনে রাখতে হবে যে, মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের জান্নাত
মা যদি মনে করেন আপনি অন্যায় করেছেন: ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আপনি অন্যায় করছেন না, কারণ:
- আপনি মায়ের হক আদায় করতে চলেছেন (নিয়মিত যোগাযোগ ও সহায়তার মাধ্যমে)।
- আলাদা বাসা নেওয়া আপনার স্ত্রীর বৈধ অধিকার।
- দ্বন্দ্বের পরিবেশে সকলের জন্য আলাদা থাকা উত্তম।
ইমাম কাসানী (রহ.) বলেন: "স্বামীর উপর স্ত্রীর জন্য পৃথক আবাসনের ব্যবস্থা করা ফরজ, যদি স্ত্রী ইচ্ছা করে।" [বাদায়েউস সানায়ে, ৪/২৪]
সুপারিশ:
- মাকে বুঝিয়ে বলুন: মায়ের কাছে ব্যাখ্যা করুন যে আলাদা বাসা মানে তাকে ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং শান্তি রক্ষার জন্য অস্থায়ী ব্যবস্থা।
- একটি মধ্যপন্থা খুঁজুন: সম্ভব হলে একই বিল্ডিং-এ মায়ের জন্য আলাদা ফ্ল্যাট ভাড়া নিন, যাতে নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ সহজ হয়।
- পরিবারের অন্যান্যদের সাহায্য নিন: আপনার বোনকে (মায়ের মেয়ে) দায়িত্ব ভাগ করে নিতে বলুন। মা যাতে একা না হন।
- দোয়া করুন: আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন এবং মা-স্ত্রী উভয়ের জন্য হেদায়েত কামনা করুন।
রেফারেন্স:
- আল-হিদায়াহ (ফিকহ হানাফি)
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন)
- ফাতাওয়া আলমগীরী
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী)
আপনার অবস্থান থেকে হিকমাহ সমৃদ্ধ সিদ্ধান্ত নিন। মায়ের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখুন, স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ভালো রাখুন, এবং স্বীয় মানসিক সুস্থতা রক্ষা করুন। আল্লাহ আপনার জন্য সহজ পথ তৈরি করুন। আমীন।
সর্বোত্তম সমাধান: যদি সম্ভব হয়, কিছু সময়ের জন্য (যেমন ৬ মাস) আলাদা থাকুন। এই সময়ে মা ও স্ত্রী উভয়ের মধ্যে দূরত্ব কমলে এবং দ্বন্দ্ব মিটে গেলে পুনরায় একত্রে বসবাসের চেষ্টা করুন। যদি স্থায়ীভাবে আলাদা থাকা প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটাও জায়েজ।