একই বিষয়ে কি একাধিক জন ইস্তেখারা করতে পারবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
ইস্তেখারা: একই বিষয়ে একাধিক ব্যক্তি ইস্তেখারা কি ইস্তেখারা করতে পারবে?
ফতওয়া (সার-সংক্ষেপ)
হ্যাঁ, একই বিষয়ে একাধিক ব্যক্তি (যেমন স্বামী-স্ত্রী) পৃথকভাবে ইস্তেখারা করতে পারে। শরিয়তে এর কোনো বাধা নেই। তবে ইস্তেখারা একটি ব্যক্তিগত আমল; প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান ও আকিদা থেকে ইস্তেখারা করবেন। এর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া হয়। যদি স্বামী-স্ত্রী উভয়েই একই সিদ্ধান্তের জন্য ইস্তেখারা করেন, তাহলে সেটি বৈধ এবং সুন্নাহর বিপরীত নয়।
কোরআন ও হাদিসের দলিল
ইস্তেখারার হাদিস (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১১৬২):
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يُعَلِّمُنَا الِاسْتِخَارَةَ فِي الْأُمُورِ كُلِّهَا كَمَا يُعَلِّمُنَا السُّورَةَ مِنَ الْقُرْآنِ...
অর্থ: জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের সব বিষয়ে ইস্তেখারা শেখাতেন, যেমন তিনি কুরআনের সূরা শেখাতেন।
ব্যাখ্যা: হাদিসে বলা হয়েছে "কুল্লি উমুরিন" (সব বিষয়ে)। একই বিষয়ে একাধিক ব্যক্তি ইস্তেখারা করলে তাতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। বরং প্রত্যেকের জন্য স্বতন্ত্রভাবে ইস্তেখারা করা সুন্নাহ।
সূরা আল-ফুরকান (২৫:৭৭):
قُلْ مَا يَعْبَأُ بِكُمْ رَبِّي لَوْلَا دُعَاؤُكُمْ
অর্থ: বলুন, তোমাদের দোয়া না থাকলে আমার রব তোমাদের কোনো গুরুত্ব দিতেন না।
ইঙ্গিত: ইস্তেখারা দোয়ার একটি বিশেষ রূপ। তাই একাধিক ব্যক্তির দোয়া আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।
হানাফি ফিকহের রেফারেন্স
১. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন):
الإستخارة مستحبة في كل أمر، وتكون مرة واحدة، ولا بأس بتكرارها إذا لم يظهر أثرها.
অনুবাদ: ইস্তেখারা প্রতিটি কাজের জন্য মুস্তাহাব। একবার করলেই যথেষ্ট, তবে যদি ফলাফল স্পষ্ট না হয়, তাহলে পুনরায় করাতে কোনো দোষ নেই।
২. ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি):
একই বিষয়ে একাধিক ব্যক্তি ইস্তেখারা করতে পারে। যেমন স্বামী-স্ত্রী উভয়ে নিজ নিজ ইস্তেখারা করলে তা জায়েজ। ইস্তেখারা হলো আল্লাহর কাছে হেদায়েত চাওয়া, আর একাধিকের হেদায়েত চাওয়া অধিক কল্যাণকর।
৩. ফাতাওয়া আলমগীরি (১/২৭৪):
إذا استخار الرجل في أمر، فله أن يستخير مرة أخرى إذا لم يظهر له الخير.
অনুবাদ: যদি কোনো ব্যক্তি কোনো বিষয়ে ইস্তেখারা করে এবং কল্যাণ স্পষ্ট না হয়, তাহলে সে পুনরায় ইস্তেখারা করতে পারে।
ইমামদের মতামত
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর শিষ্য (ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ) ইস্তেখারাকে মুস্তাহাব বলেছেন। তাদের মতে, এটি ব্যক্তিগত আমল, যা একাধিক ব্যক্তি আলাদাভাবে করতে পারে।
- ইমাম তহাবি (রহ.) (শরহু মাআনিল আসার): ইস্তেখারা দোয়ার একটি রূপ, তাই একাধিক ব্যক্তির অংশগ্রহণে কোনো বাধা নেই।
ব্যবহারিক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম
১. ইস্তেখারা শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের জন্য নয়: যদি স্বামী-স্ত্রী একসাথে কোনো সিদ্ধান্ত নেন (যেমন চাকরি পরিবর্তন, বাসস্থান পরিবর্তন), তাহলে উভয়েই ইস্তেখারা করতে পারেন।
২. ইস্তেখারা করার পর কোনো স্বপ্ন বা ইঙ্গিত না পেলেও চলবে: বরং মনের প্রশান্তি ও কাজের সহজতা দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
৩. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পরামর্শ জরুরি: ইস্তেখারা করার পর উভয়ের মধ্যে আলোচনা ও সহমত হওয়া উচিত।
৪. সঠিক নিয়ত: ইস্তেখারা করার সময় নিয়ত করবেন, "হে আল্লাহ! তুমি আমার জন্য যা কল্যাণকর, তা সহজ করে দাও।"
নোট (Important Clarification)
- ইস্তেখারা শুধু দোয়া: এটি কোনো স্বপ্ন বা গণনার মাধ্যম নয়, বরং দোয়া ও তাওয়াক্কুলের একটি আমল।
- শয়তানের প্রভাব থেকে বাঁচুন: ইস্তেখারার পর নিজের পছন্দকে "ইস্তেখারার ফল" বলে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। বরং পরামর্শ ও বাস্তব যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন।
সংক্ষেপে উত্তর
হ্যাঁ, একই বিষয়ে একাধিক ব্যক্তি ইস্তেখারা করতে পারে, এবং বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর জন্য এটি উত্তম। কারণ উভয়ের দোয়া অধিক বরকতপূর্ণ এবং আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনার মাধ্যম বেশি হয়। তবে ইস্তেখারার পর পারস্পরিক সমঝোতা ও শরিয়তের সীমার মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
আল্লাহ সর্বোত্তম জ্ঞানী।
রেফারেন্স:
- সহিহ বুখারী (হাদিস নং ১১৬২)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
- ফাতাওয়া আলমগীরি
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি শফি)