ব্যবসায় লাভের কোনো সীমা আছে কি?

Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 832
Questioner: English Grammar
Question Asked: 27 May 2026, 05:51 AM
Reviewed & Published: 27 May 2026, 10:25 AM
Views: 57
Tokens: 4,188
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

Aarong এর পাঞ্জাবি ৮–১০ হাজার টাকায় কিনতে সমস্যা নেই, Apple এর ফোন লাখ টাকা দিয়ে কিনতেও সমস্যা নেই, Starbucks এর এক কাপ কফির জন্য হাজার টাকা উড়ালেও সমস্যা নেই, KFC তে এক বালতি চিকেনের পেছনে হাজার হাজার টাকা খরচ করলেও কারো সমস্যা হয় না। কারণ তখন সবাই জানে, মানুষ শুধু জিনিস কেনে না, ব্র্যান্ড, বিশ্বাস, সার্ভিস আর এক্সপেরিয়েন্সেরও দাম দেয়। কিন্তু কেউ নিজের নামে একটা প্রিমিয়াম মার্কেট দাঁড় করালেই হঠাৎ কিছু মানুষের মাথায় অর্থনীতির জ্বর উঠে যায়, আম তো গাছে ধরে, এত দাম কেন? আপনার সামর্থ্য থাকলে কিনবেন, না থাকলে বাজার থেকে কম দামের আম কিনে খাবেন। বাজারে তো আমের অভাব নেই। কেউ কি গলায় ছুরি ধরে বলছে, ভাই, আমার আমই কিনতে হবে? যার ভালো লাগে সে কিনবে, যার লাগে না সে এভয়েড করবে। এত চুলকানি কেন? আর সবচেয়ে হাস্যকর লাগে যখন কিছু মানুষ হারাম-হালাল এর ফতোয়া দিতে আসে। ইসলামে ব্যবসায় লাভ করা হারাম না। হারাম হলো প্রতারণা করা, মিথ্যা বলা, জোর করে ঠকানো, দোষ লুকানো। এখানে কি দাম লুকানো হয়েছে? না। জামশেদ মজুমদারের পেজে পরিষ্কারভাবে দাম লেখা আছে। মানুষ দাম দেখেই কিনছে। কেউ ঠকে কিনছে না, কেউ বাধ্য হয়েও কিনছে না। ইসলামে ক্রেতা-বিক্রেতা দুজন রাজি থাকলে ব্যবসা বৈধ। কিন্তু আমাদের সমাজের কিছু মানুষ অন্যের সফলতা দেখলেই নিজের হিংসাকে হারাম-হালাল এর মোড়ক দিয়ে চালাতে চায়। নিজের পকেটে টান পড়লে সমস্যা নেই, কিন্তু অন্য কেউ নিজের ব্র্যান্ড ভ্যালু দিয়ে লাভ করলে তখন ঈমান হঠাৎ খুব জেগে ওঠে। সোজা কথা আপনি যদি মনে করেন দাম বেশি, তাহলে কিনবেন না। কিন্তু অন্য মানুষ কেন কিনছে সেটা নিয়ে সারাদিন কান্নাকাটি করা আসলে আপনার রুচি আর মানসিকতার পরিচয় দেয়, ব্যবসার না।

Answer

উত্তর

আপনার বক্তব্যের মূল দাবিটি সঠিক যে, ইসলাম ব্যবসায় ন্যায্য লাভ ও ব্র্যান্ড ভ্যালুর মাধ্যমে দাম নির্ধারণকে হারাম করেনি, যতক্ষণ পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে সন্তুষ্ট থাকে এবং কোনো প্রতারণা, মিথ্যা বা জবরদস্তি না থাকে। নিচে কুরআন, হাদিস ও সালাফি উলামাদের দৃষ্টিভঙ্গি সহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।

১. ব্যবসায় লাভ ও মূল্য নির্ধারণের বৈধতা

আল্লাহ তাআলা বলেন:

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রাস করো)” (সূরা আন-নিসা ৪:২৯)।

এই আয়াতের আলোকে, ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে যদি কোনো পণ্যের দাম সম্পর্কে সচেতন হয় এবং স্বেচ্ছায় লেনদেন সম্পন্ন করে, তাহলে তা বৈধ। এমনকি দাম যদি সাধারণ বাজারদরের চেয়ে বেশি হয়, তবুও তা হারাম নয়, যতক্ষণ না প্রতারণা বা জবরদস্তি থাকে।

২. ব্র্যান্ড, সেবা ও অভিজ্ঞতার মূল্য

বর্তমান যুগে মানুষ শুধু পণ্য নয়, বরং ব্র্যান্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা, গুণগত মান, সেবা এবং অভিজ্ঞতার জন্যও অর্থ দেয়। এটি ইসলামী শরিয়তের পরিপন্থী নয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:

“ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে লেনদেন বৈধ, যতক্ষণ না তারা পৃথক হয়। যদি তারা সত্য বলে এবং (পণ্যের দোষ) প্রকাশ করে, তবে তাদের লেনদেনে বরকত দেওয়া হয়। আর যদি তারা মিথ্যা বলে এবং (দোষ) গোপন করে, তবে তাদের লেনদেনের বরকত মুছে ফেলা হয়।” (সহীহ বুখারী, হাদিস ২০৭৯; সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৫৩২)।

এখানে মূল শর্ত হলো সত্য বলা ও দোষ গোপন না করা। দাম প্রকাশ্যে লেখা থাকলে এবং ক্রেতা তা জেনে কিনলে কোনো সমস্যা নেই।

৩. অতিরিক্ত লাভ ও ‘গবন’ (প্রতারণামূলক বেশি দাম)

ইসলামী ফিকহে ‘গবন ফাহিশ’ (চরম প্রতারণামূলক অতিরিক্ত মূল্য) নিষিদ্ধ, তবে তা শুধু তখনই প্রযোজ্য যখন—

  • ক্রেতার জ্ঞানের অভাবের সুযোগ নিয়ে দাম বাড়ানো হয়,
  • পণ্যের প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে ক্রেতা অজ্ঞ থাকে,
  • অথবা ক্রেতাকে জোর করে কেনানো হয়।

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:

“যদি কেউ স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্ট চিত্তে কোনো জিনিস ক্রয় করে, তবে তা বৈধ। আর যদি বিক্রেতা অতিরিক্ত মূল্য নেয়, তবে তা জুলুম নয়, বরং ক্রেতার ইচ্ছা ও জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল।” (মাজমু’ ফাতাওয়া, ২৯/৩২৭)।

৪. হিংসা ও ভিত্তিহীন হারাম-হালাল ফতোয়া

আপনি যা বলেছেন—অনেকে সফলতা দেখে হিংসা করে এবং তা হারাম-হালালের মোড়কে উপস্থাপন করে—তা সত্য। ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন:

“যে ব্যক্তি আল্লাহর অনুমতি ও রাসূলের সুন্নাত অনুযায়ী ব্যবসা করে, তার বিরুদ্ধে ‘হারাম’ বলা জুলুম।” (ইলামুল মুওয়াক্কিঈন, ৪/৩৫৬)।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

“আর তোমরা একে অপরের দোষ খুঁজে বেড়াবে না” (সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১২)।

অতএব, কোনো ব্যবসায়ী যদি স্পষ্ট দাম উল্লেখ করে, কোনো প্রতারণা না করে, তবে তার ব্যবসাকে ‘হারাম’ বলা গুনাহ।

৫. সালাফি উলামাদের বক্তব্য

শাইখ ইবন বায (রহ.) বলেন:

“বৈধ ব্যবসায় লাভের কোনো নির্দিষ্ট হার নেই। ক্রেতা ও বিক্রেতা যদি দাম নিয়ে রাজি হয়, তবে তা বৈধ। তবে মুসলিমের উচিত উদারতা ও সততার সাথে ব্যবসা করা।” (মাজমু’ ফাতাওয়া ইবন বায, ১৯/৮৩)।

শাইখ আল-আলবানী (রহ.) বলেন:

“রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো দাম নির্ধারণ করে দেননি, বরং বাজারকে তার স্বাভাবিক গতিতে চলতে দিয়েছেন। তবে জরুরি অবস্থায় বা একচেটিয়া ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।” (সিলসিলাতুল হুদা ওয়াননূর, ক্যাসেট নং ৩৪০)।

শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন:

“যদি কেউ একটি পণ্য সাধারণ দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে রাজি হয়, তাহলে তা জায়েয। কারণ ক্রেতা স্বেচ্ছায় সেই মূল্য দিচ্ছে।” (শারহুল মুমতি’, ৮/২৮৪)।

শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন:

“প্রচলিত বাজারদরের চেয়ে বেশি দাম নেওয়া হারাম নয়, যদি না ক্রেতার জ্ঞানের অভাব বা জবরদস্তি থাকে। বর্তমান ব্র্যান্ডিং ও সার্ভিসের মূল্য সাধারণ দামের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।” (আল-মুনতাকা, ৩/২৪৮)।

৬. জামশেদ মজুমদারের আমের প্রসঙ্গ

আপনি যেমন বলেছেন, জামশেদ মজুমদারের পেজে দাম পরিষ্কার লেখা, ক্রেতা দাম দেখেই কিনছে, কেউ ঠকছে না বা বাধ্য হচ্ছে না। এ অবস্থায় এটি সম্পূর্ণ বৈধ। ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:

“ক্রেতা যদি দাম জেনে এবং পণ্যের গুণাগুণ বুঝে ক্রয় করে, তাহলে সেটি পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে লেনদেন।” (মাজমু’ ফাতাওয়া, ২৯/৩৩০)।

৭. উপসংহার

আপনার বক্তব্য ইসলামী শরিয়তের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্র্যান্ড, সার্ভিস, বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতার জন্য বেশি দাম নেওয়া হারাম নয়, যদি প্রতারণা, মিথ্যা বা জবরদস্তি না থাকে। অন্যদের হিংসা বা ভিত্তিহীন ফতোয়া থেকে সাবধান থাকা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন:

“আর যারা মুমিন পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয় তাদের কোনো অপরাধ ছাড়াই, তারা তো অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।” (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৮)।

আমরা সবাই যেন সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে ব্যবসা করি এবং অন্যের ব্যবসা সম্পর্কে অজ্ঞতাবশত ফতোয়া দেওয়া থেকে বিরত থাকি।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.