অসুস্থ হওয়ার ভান করে পরিবার থেকে টাকা নিয়ে এখন কি অন্য বাস্তব কোনো অসুস্থতায় খরচ করতে পারবো?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
আপনার ভাই কর্তৃক প্রদত্ত ২৫,০০০ টাকা আপনার জন্য বৈধ এবং তা ফেরত দেওয়া আপনার ওপর ওয়াজিব নয়। তবে শুরুতে অসুস্থতার ভান করে পরিবারের সদস্যদের ধোঁকা দেওয়া একটি গুনাহের কাজ ছিল, যার জন্য আপনাকে তাওবাহ করতে হবে। নিচে বিস্তারিত দলিল ও বিশ্লেষণ দেওয়া হলো।
মূলনীতি ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ
১. টাকাটি কী হিসেবে দেওয়া হয়েছিল?
প্রশ্ন থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, আপনার ভাই আপনাকে চিকিৎসার জন্য টাকাটি দিয়েছিলেন এবং আপনি তা চাননি, বরং তিনি নিজে থেকে দিয়েছিলেন। এমতাবস্থায় শরিয়তে এটি ‘হিবাহ’ (উপহার) বা ‘খয়রাত’ (দান) হিসেবে গণ্য হবে, ঋণ নয়।
- হানাফি ফিকহের কিতাব ‘আল-হিদায়া’ -তে এসেছে:
"الهِبَةُ تَمْلِيكُ الْعَيْنِ بِغَيْرِ عِوَضٍ"
অর্থ: “হিবাহ হলো বিনা বিনিময়ে কোনো সম্পদের মালিকানা দান করা।” (আল-হিদায়া, ৩/২১৩) - যেহেতু আপনার ভাই কখনো টাকা ফেরত চাননি, বরং নীরব থেকেছেন, সেটিও দান হওয়ার প্রমাণ।
২. অসুস্থতার ভান ও পরে বাস্তবিক অসুস্থতা—এর প্রভাব কী?
আপনি প্রথমে মিথ্যা ভান করলেও পরীক্ষায় আসলেই সেই রোগ ধরা পড়েছে। ফলে আপনার ভাই যে উদ্দেশ্যে টাকা দিয়েছিলেন (চিকিৎসা) তা বাস্তবেই বিদ্যমান ছিল। তাই দানটি কোনো ‘ভুল ধারণা’র (গুরার) ভিত্তিতে হয়নি, বরং প্রকৃত কারণ (অসুস্থতা) বিদ্যমান ছিল।
- ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’ -এ বলেন:
"إذَا أَعْطَى شَيْئًا عَلَى ظَنِّ حَاجَةٍ فَبَانَ خِلَافُهُ، فَلَهُ الرُّجُوعُ إنْ كَانَ الْعَطَاءُ بِسَبَبِ ذَلِكَ الظَّنِّ"
অর্থ: “যদি কেউ কোনো প্রয়োজনের ধারণায় কোনো বস্তু দান করে, পরে জানা যায় সে ধারণা ভুল ছিল, তাহলে সে ফেরত নিতে পারবে—যদি দানটি সেই ধারণার কারণে হয়ে থাকে।” (রাদ্দুল মুহতার, ৪/১৬৯)
আপনার ক্ষেত্রে ধারণা (অসুস্থতা) ভুল ছিল না; বরং পরে তা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তাই ফেরত নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
৩. আপনার পক্ষ থেকে প্রাপ্তির যোগ্যতা:
আপনি টাকাটি চাননি, এটি আপনার ভাইয়ের স্বতঃস্ফূর্ত দান। তাই আপনি সৎ নিয়তে তা গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে আপনার ওই রোগের চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলে টাকাটি ব্যবহার করা বৈধ।
- ‘ফাতাওয়া উসমানি’ -তে এসেছে:
"কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় কাউকে কিছু দেয়, তাহলে তা গ্রহণ করা জায়েয, যদি গ্রহীতা তার উপযুক্ত হয়।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫৫)
৪. ভাইয়ের টাকা ফেরত দেওয়ার আবশ্যকতা নেই:
আপনি মিথ্যা বলেছেন বলে টাকাটি হারাম হয়ে যায়নি। কারণ টাকাটি মিথ্যার বিনিময়ে নেওয়া হয়নি; বরং এটি একটি দান, যা বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে মিথ্যা বলার কারণে তাওবাহ করা জরুরি।
সুতরাং সিদ্ধান্ত:
- টাকা ফেরত দেওয়া ওয়াজিব নয়। এটি আপনার বৈধ মাল, আপনি চিকিৎসায় বা প্রয়োজনে ব্যয় করতে পারেন।
- তবে আপনার অসুস্থতার ভান করার কাজটি গুনাহ। আল্লাহর কাছে তাওবাহ করুন এবং ভবিষ্যতে মিথ্যা থেকে বিরত থাকুন।
উল্লেখযোগ্য বিষয়:
- আপনার ভাই যদি কখনো টাকাটি ফেরত চান, তবে সেটি আদায় করা তার অধিকার নয় (যেহেতু এটি দান), কিন্তু পারস্পরিক সম্পর্কের কথা চিন্তা করে আপনি ফেরত দিতে পারেন—এটি সওয়াবের কাজ হবে।
- আপনার ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং তার জন্য দোয়া করা মুস্তাহাব।
দলিলভিত্তিক সারসংক্ষেপ:
"يَجُوزُ أَخْذُ الْمَالِ بِإِعْطَاءِ الْمُعْطِي بِطِيبِ نَفْسِهِ، وَلَا يَلْزَمُ رَدُّهُ إلَّا إذَا كَانَ الْإِعْطَاءُ عَلَى سَبَبٍ كَاذِبٍ لَمْ يَتَحَقَّقْ"
অর্থ: “স্বেচ্ছায় দান করা মাল গ্রহণ করা জায়েয, এবং তা ফেরত দেওয়া আবশ্যক নয়—যদি না দানটি কোনো মিথ্যা কারণের ওপর ভিত্তি করে হয় এবং সেই কারণ বাস্তবে না থাকে।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩২৩)
আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন এবং সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন।