ইনডোর টার্ফ ফুটবল স্টেডিয়াম পরিচালনা ও মাঠ ভাড়া দেওয়া কি হালাল?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 8144
Questioner: Md Riad Hossain
Question Asked: 08 Nov 2026, 12:27 AM
Reviewed & Published: 08 Nov 2026, 06:29 AM
Views: 53
Tokens: 5,560
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
আমি একটি ইনডোর টার্ফ ফুটবল স্টেডিয়ামের পরিচালক হিসেবে চাকরি করতে চাই। এখানে খেলোয়াড়দের ঘণ্টাভিত্তিক মাঠ ভাড়া দেওয়া হবে।
কিন্তু অধিকাংশ খেলোয়াড় হাফ প্যান্ট পরে ফুটবল খেলেন, যার কারণে তাদের হাঁটু উন্মুক্ত থাকে। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী পুরুষের হাঁটু সতরের অন্তর্ভুক্ত।
পরিচালক হিসেবে আমি শুধু মাঠ ভাড়া দেব। খেলোয়াড়দের পোশাক নির্ধারণ বা নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব আমার থাকবে না। তাদের পোশাকের ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণও থাকবে না।
এ অবস্থায় এই টার্ফ স্টেডিয়াম পরিচালনা করা এবং খেলোয়াড়দের কাছ থেকে মাঠ ভাড়ার টাকা গ্রহণ করা কি শরিয়তসম্মত ও হালাল হবে? এই ব্যবসার উপার্জন কি আমার জন্য হালাল হবে?
জাযাকাল্লাহু খাইরান।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায়—আপনি শুধু মাঠ ভাড়া দেন, খেলোয়াড়দের পোশাক নির্ধারণ বা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব আপনার নয়, এবং আপনার মাঠ ভাড়ার মূল কাজটি নিজে হারাম নয়—এ অবস্থায় মাঠ ভাড়া দেওয়ার চুক্তি ও ভাড়ার টাকা গ্রহণ মূলত জায়েয হওয়ার প্রবল অবকাশ রয়েছে; তবে যেহেতু আপনি জানেন যে অধিকাংশ খেলোয়াড় হাফ প্যান্ট পরে হাঁটু খোলা রেখে খেলে, তাই সতর্কতামূলক ও তাকওয়ার দিক থেকে এমন শর্ত/ব্যবস্থা করা উচিত যাতে প্রকাশ্যে সতর খোলার কাজে সহযোগিতা না হয়। সম্ভব হলে কর্তৃপক্ষকে সতর ঢাকার নিয়ম চালু করতে বলুন; না পারলেও আপনার মূল আয়কে সরাসরি হারাম বলা যাবে না, ইনশাআল্লাহ।


বিস্তারিত আলোচনা

১. মূল নীতি: হারাম কাজে সহযোগিতা নয়

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“নেকি ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।”
(সূরা মায়িদা: ২)

হাদিসে এসেছে:

مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ
“যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের দিশা দেয়, সে কাজটি সম্পাদনকারীর সমান প্রতিদান পাবে।”
(সহিহ মুসলিম: ১৮৯৩)

আরও এসেছে:

مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا
“যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো ভালো পথ চালু করল, তার জন্য তার প্রতিদান এবং যারা তার অনুসরণ করবে তাদের প্রতিদানও থাকবে।”
(সহিহ মুসলিম: ১০১৭)

সুতরাং কোনো কাজ সরাসরি হারাম না হলেও তা যদি প্রকাশ্য গুনাহের সহযোগিতা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা পরিহার করা কর্তব্য।

২. পুরুষের সতর: হানাফি মাজহাব

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী পুরুষের সতর হলো নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত; হাঁটুও সতরের অন্তর্ভুক্ত।
দলিল:

عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تُبْرِزْ فَخِذَكَ، وَلَا تَنْظُرْ إِلَى فَخِذِ حَيٍّ وَلَا مَيِّتٍ»
“তোমার উরু খোলা রাখো না, কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তির উরুর দিকে তাকাও না।”
(সুনানে আবু দাউদ: ৪০১৫; মুসনাদে আহমাদ)

হানাফি ফিকহে এ বিধান সুপ্রতিষ্ঠিত। ইমাম বুরহানুদ্দিন আল-মারগিনানি (রহ.) বলেন:

“পুরুষের সতর হলো নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত।”
(আল-হিদায়া, কিতাবুস সালাত, বাবু শুরুতিস সালাত)

ইবনে আবিদিন (রহ.) শামি কিতাবে উল্লেখ করেন:

“হাঁটু সতরের অন্তর্ভুক্ত—এটি হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত।”
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, সতর অধ্যায়)

৩. মাঠ ভাড়া দেওয়ার চুক্তির প্রকৃতি

আপনার চুক্তি মূলত ইজারা (ভাড়া) চুক্তি—নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মাঠ ব্যবহারের অধিকার বিক্রি করা। ফুটবল খেলা নিজে যদি হারাম না হয়, তবে মাঠ ভাড়া দেওয়া মূলত জায়েয।
তবে প্রশ্ন হলো—খেলোয়াড়দের সতর খোলা থাকা কি আপনার ভাড়া দেওয়ার কাজকে হারাম করে দেয়?

এখানে দুটি দিক বিবেচ্য:

  1. আপনি পোশাক নির্ধারণ বা নিয়ন্ত্রণ করেন না—এটি আপনার পক্ষে একটি ওজর।
  2. কিন্তু আপনি জানেন যে অধিকাংশ খেলোয়াড় হাঁটু খোলা রেখে খেলে—এটি প্রকাশ্য গুনাহের প্রতি সহযোগিতার সাদৃশ্য তৈরি করে।

ফিকহি মূলনীতি হলো:

الْإِعَانَةُ عَلَى الْمَعْصِيَةِ حَرَامٌ، وَمَا أَدَّى إِلَى الْحَرَامِ فَهُوَ حَرَامٌ
“গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হারাম; আর যা হারামের দিকে নিয়ে যায়, তাও হারাম।”
(আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর, ইবনে নুজাইম)

তবে এখানে সরাসরি সহযোগিতা নয়; বরং পরোক্ষ সহযোগিতা। ফকিহদের মধ্যে এ ধরনের মাসআলায় تفصيل রয়েছে।

৪. হানাফি ফকিহদের বক্তব্য

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) “রাদ্দুল মুহতার” গ্রন্থে ভাড়া সংক্রান্ত আলোচনায় বলেন:

“যদি ভাড়াটিয়া উক্ত বস্তু দ্বারা গুনাহের কাজ করে এবং মালিক তা জানে, তবে মালিকের জন্য ভাড়া দেওয়া মাকরুহে তাহরিমি হবে; আর যদি না জানে, তবে জায়েয।”
(রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল ইজারা)

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) “বেহেশতী জেওর” গ্রন্থে বলেন:

“যে কাজে গুনাহের সহায়তা হয়, তা থেকে বিরত থাকা উচিত।”
(বেহেশতী জেওর, ব্যবসা অধ্যায়)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) “মাআরিফুল কুরআন”-এ সূরা মায়িদার ২ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:

“গুনাহের কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা ইসলামে নিষিদ্ধ।”
(মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড ৩)

৫. আপনার নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর

আপনি লিখেছেন:

  • আপনি শুধু মাঠ ভাড়া দেবেন।
  • খেলোয়াড়দের পোশাক নির্ধারণ বা নিয়ন্ত্রণ আপনার দায়িত্ব নয়।
  • তাদের পোশাকের ওপর আপনার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

এ অবস্থায়:

  • মাঠ ভাড়া দেওয়ার চুক্তি ও টাকা গ্রহণ মূলত জায়েয হওয়ার প্রবল অবকাশ রয়েছে, কারণ মাঠ ভাড়া দেওয়া নিজে হারাম নয়; ফুটবল খেলা নিজেও যদি শরিয়তের সীমা রক্ষা করে হয়, তবে তা জায়েয।
  • তবে যেহেতু আপনি জানেন যে অধিকাংশ খেলোয়াড় হাঁটু খোলা রেখে খেলে, তাই এটি প্রকাশ্য গুনাহের প্রতি পরোক্ষ সহযোগিতার সাদৃশ্য তৈরি করে। এ কারণে তাকওয়া ও সতর্কতার দিক থেকে এমন ব্যবস্থা করা উত্তম যে, সতর ঢাকার নিয়ম চালু হয় বা অন্তত কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে বলা হয়।
  • যদি আপনি নিজে পোশাক নির্ধারণ বা নিয়ন্ত্রণ না করেন এবং শুধু মাঠ ভাড়া দেন, তবে আপনার আয়কে সরাসরি হারাম বলা যাবে না; ইনশাআল্লাহ তা হালাল হওয়ার প্রবল অবকাশ রয়েছে।
  • তবে সর্বোত্তম ও নিরাপদ পথ হলো: স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষকে সতর ঢাকার নিয়ম চালু করতে বলা, অথবা এমন শর্তে ভাড়া দেওয়া যে খেলোয়াড়রা সতর ঢেকে খেলবে। সম্ভব না হলে, অন্তত নিজের নিয়ত ও অবস্থান পরিষ্কার রাখা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।

৬. উপসংহার

  • মাঠ ভাড়া দেওয়ার চুক্তি ও ভাড়ার টাকা গ্রহণ মূলত জায়েয হওয়ার প্রবল অবকাশ রয়েছে, ইনশাআল্লাহ।
  • তবে প্রকাশ্য গুনাহের প্রতি পরোক্ষ সহযোগিতা এড়াতে সতর্কতা অবলম্বন করা কর্তব্য।
  • সম্ভব হলে সতর ঢাকার নিয়ম চালু করুন; না পারলে অন্তত কর্তৃপক্ষকে বলুন এবং নিজের নিয়ত পরিষ্কার রাখুন।
  • আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.