বেগানা নারীর দিকে অনিচ্ছায় চোখে পড়ে যাওয়া সহ নানাবিধ প্রশ্নের উত্তর জানতে চাই?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 814
Questioner: Arman
Question Asked: 26 May 2026, 09:45 PM
Reviewed & Published: 26 May 2026, 10:10 PM
Views: 90
Tokens: 5,951
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১)উস্তাদের নিকট আমার প্রশ্ন: অনেক সময় চোখ নিচু করে রাস্তায় হাঁটার সময় কেউ ডাক দিলে তার দিকে তাকানোর জন্য চোখ উঠাতে হয়। এ অবস্থায় আশেপাশে কোনো বেগানা নারী চোখে পড়ে গেলে কি এতে গুনাহ হবে?

২) চায়ের দোকান বা ভিড়ের স্থানে বসে বা দাঁড়িয়ে,চোখ নিচু রেখে কথা বলার সময় আশেপাশের বেগানা নারীরা অনিচ্ছায় চোখে পড়ে যায়। এ অবস্থায় অন্যদের সাথে কথা বলার জন্য চোখ খোলা রেখে নিচু রাখা যাবে কি?

৩) ফটোকপি, মোবাইল বা মুদির দোকানে বিজ্ঞাপনের জন্য বেগানা নারীদের ছবি থাকে। চোখ নিচু রেখে স্বাভাবিকভাবে চললেও এসব ছবি অনিচ্ছায় চোখে পড়ে । চোখ আধা বন্ধ বা কুঁচকে নিলে বা এক চোখ বন্ধ রাখলে এগুলো চোখে আসে না। তবে কষ্টকর। সেই হিসেবে চোখ স্বাভাবিক ভাবে খোলা রাখা হালাল হবে?

৪) এই দোকান গুলোতে যখন পণ্য খোঁজা, মোবাইল রিচার্জের জন্য নাম্বার চেক করা, বা অন্য দরকারী কাজে মাথা উঁচু করা লাগলে তো একদম সামনে পড়ে ছবি গুলো এতে গুনাহ হবে?

একজন দ্বীনি ভাই অশ্লীলতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির জন্য দ্রুত একটি ডকুমেন্টারি বানিয়েছিলেন। সেখানে এ-সম্পর্কিত এক মহিলা উপস্থাপিকার সংবাদ পাঠ থাকায় তিনি অংশটি ব্লার করে দেন।
https://www.facebook.com/share/p/18Vcg2i6yL/

৪) যেই তিনটা পুরুষের ছবি দেওয়া আছে blur করা এরকম ভাবে নারীর ছবি ব্লার করলে ভিডিওতে ইউজ করা যাবে দাওয়াতী উদ্দ্যেশে?

৫) সবাই ১ নাম্বার ছবিটার মতো blur করেনা অনেকে দুই নাম্বারের মতো করে, আবার ৩ নাম্বারের মতো করা হতে পারে,ওই ভিডিও গুলো দেখা যাবে যেগুলো দাওয়াতী উদ্দ্যেশে করা এই পদ্ধতি গুলোতে ব্লার করা?

৬) এই যে তিন নাম্বার ছবিটা যেটা তুলনামূলক ভাবে কম স্পষ্ট ওইরকম blur করে কোনো ডকুমেন্টারি তে দাওয়াতী কাজের উদ্দেশ্যে দেওয়া যাবে?

Answer

উত্তর

প্রশ্নগুলোর ক্রমিক নম্বর আপনার দেওয়া অনুযায়ী রাখা হয়েছে। তবে প্রথম ৪ নং প্রশ্নের পর একটি দ্বিতীয় ৪ নং, ৫ ও ৬ নং প্রশ্ন রয়েছে বলে মোট ৭টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।

১) রাস্তায় হাঁটার সময় চোখ নিচু রাখা অবস্থায় কেউ ডাক দিলে চোখ উঠালে অনিচ্ছায় বেগানা নারী চোখে পড়লে গুনাহ হবে কি?

উত্তর: যদি আপনার ইচ্ছা বা সংকল্প না থাকে এবং এটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ও আকস্মিকভাবে ঘটে, তবে তাতে কোনো গুনাহ হবে না। তবে সঙ্গে সঙ্গেই দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া আবশ্যক (মানে দ্বিতীয়বার তাকানো যাবে না)। হাদিসে এসেছে, প্রথম দৃষ্টি (অনিচ্ছাকৃত) ক্ষমার যোগ্য, কিন্তু দ্বিতীয় দৃষ্টি হারাম (তিরমিজি, সহিহ)। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেছেন, “অনিচ্ছাকৃত নজর পড়লে গুনাহ নেই, তবে ইচ্ছাকৃত তাকানো হারাম” (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৫)। তাই এ ধরনের অবস্থায় চোখ উঠিয়ে ডাক দেওয়া ব্যক্তির দিকে তাকানো জরুরি হলে, দৃষ্টি শুধু তার দিকেই সীমিত রাখুন এবং পাশের নারীদের দিকে না তাকানোর চেষ্টা করুন।

২) চায়ের দোকান বা ভিড়ের স্থানে অন্যদের সাথে কথা বলার সময় চোখ নিচু রেখে কথা বললে অনিচ্ছায় বেগানা নারীরা চোখে পড়লে গুনাহ হবে কি? এ অবস্থায় চোখ খোলা রেখে নিচু রাখা যাবে কি?

উত্তর: এ ধরনের জায়গায় চোখ নিচু রাখা সুন্নত এবং উত্তম। যদি অনিচ্ছায় কোনো বেগানা নারী চোখে পড়ে যায়, তাতে গুনাহ হবে না। তবে কথা বলার জন্য চোখ খোলা রাখা যদি জরুরি হয়, তাহলে দৃষ্টি মাটি বা নির্দিষ্ট বস্তুর দিকে রেখে (অর্থাৎ সম্পূর্ণ নিচু না করে) কথা বলতে পারেন। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কখনো কখনো কথোপকথনের সময় সামনের দিকে তাকাতেন, কিন্তু অপ্রয়োজনে নারীর দিকে তাকাতেন না (বুখারি, মুসলিম)। সুতরাং প্রয়োজনে চোখ খোলা রাখা যাবে, কিন্তু দৃষ্টি যেন বেগানা নারীর দিকে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

৩) ফটোকপি, মোবাইল বা মুদির দোকানে বেগানা নারীদের বিজ্ঞাপনের ছবি অনিচ্ছায় চোখে পড়লে গুনাহ হবে কি? চোখ স্বাভাবিক খোলা রাখা হালাল হবে?

উত্তর: এ ধরনের স্থানে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করলে যদি অনিচ্ছায় ছবি চোখে পড়ে, তবে তাতে গুনাহ নেই। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে তাকানো বা দৃষ্টি আটকে রাখা হারাম। চোখ কুঁচকে বা আধা বন্ধ করে এড়িয়ে চলা উত্তম, তবে কষ্টকর হলে বাধ্যতামূলক নয়। তবে যেখানে এসব ছবি প্রচুর, সেখানে অপ্রয়োজনে যাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, নারীর ছবির দিকে তাকানোও নজরের অন্তর্ভুক্ত (ফতোয়া আলমগিরি, ৫/৩২১)। তাই স্বাভাবিক চোখ খোলা রাখা হালাল তো নয়ই, বরং দেখার সংকল্প না থাকলে অনিচ্ছাকৃত পড়াকে গুনাহ বলা যাবে না। তবে দোকানের মালিকের জন্য এসব ছবি রাখা গুনাহের কাজ।

৪) দোকানে পণ্য খোঁজা, নাম্বার চেক করা ইত্যাদি প্রয়োজনে মাথা উঁচু করলে যদি সামনে ছবি পড়ে, তবে গুনাহ হবে কি?

উত্তর: প্রয়োজনে মাথা উঁচু করা জরুরি হলে, সেই সময় যদি ছবিটি দৃষ্টির সামনে এসে পড়ে, তবে ইচ্ছা না থাকায় গুনাহ হবে না। তবে চেষ্টা করতে হবে যাতে ছবির দিকে সরাসরি না তাকানো যায়। যেমন চোখ কিছুটা অন্যদিকে সরিয়ে রাখা বা দ্রুত কাজ শেষ করে চোখ নামিয়ে নেওয়া। যদি ছবি বড় ও স্পষ্ট হয় এবং দেখার আশঙ্কা থাকে, তাহলে দোকান পরিবর্তন করার চেষ্টা করা উচিত। ইমদাদুল ফতোয়ায় বলা হয়েছে, “অনিচ্ছায় নজর পড়লে মাফ, কিন্তু যদি জানা থাকে সামনে হারাম ছবি আছে, তবুও সেদিকে তাকানো ইচ্ছাকৃত বলে গণ্য হবে” (ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/৪৩২)।

৫) দাওয়াতী ডকুমেন্টারিতে নারীর ছবি সম্পূর্ণ ব্লার (অস্বচ্ছ) করে ব্যবহার করা যাবে কি? (প্রদত্ত তিন ধরনের ব্লারের মধ্যে ১ নম্বরের মতো)

উত্তর: যদি ব্লার এতটাই ঘন হয় যে নারীর চেহারা বা শরীরের কোনো অংশ চেনা যায় না (অর্থাৎ শুধু অস্পষ্ট আভা থাকে), তাহলে দাওয়াতী উদ্দেশ্যে অপ্রয়োজনে তা ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে উত্তম হলো সম্পূর্ণ পরিহার করা। কারণ এই ক্ষেত্রেও একটি প্রকারের নজর থেকে যায়। ফতোয়ায়ে উসমানীতে এসেছে, “নারীদের ছবি যতই অস্পষ্ট করা হোক, যতক্ষণ নারীর আকৃতির আভাস থাকে, তাকানো থেকে বিরত থাকা উচিত; তবে প্রয়োজনে অত্যন্ত অস্পষ্ট করা যেতে পারে” (ফতোয়ায়ে উসমানী, ২/২৩৪)। তবে শর্ত হলো, ছবিটি কোনোরূপ লালসা বা আকর্ষণের উদ্রেক করবে না এবং দাওয়াতি কাজের জন্যই সীমাবদ্ধ থাকবে।

৬) দাওয়াতী ডকুমেন্টারিতে ২ ও ৩ নম্বরের মতো আধা ব্লার (যেখানে কিছুটা স্পষ্টতা থাকে) ছবি ব্যবহার করা যাবে কি?

উত্তর: ২ ও ৩ নম্বরের ব্লার যেখানে মুখ বা দেহের কিছু অংশ চেনা যায় (যেমন চোখ, নাক বা আকৃতি স্পষ্ট), সেটি ব্যবহার করা জায়েজ নয়। কারণ এর মাধ্যমেও নারীর সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হতে পারে এবং এটি শরিয়তে নিষিদ্ধ। ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, “নারীদের ছবি দেখার যে বিধান, তা তাদের উপস্থিতি সম্পর্কিত বিধানের মতোই; বরং দর্শনযোগ্য ছবি দেখলেও একই গুনাহ হয়” (রাদ্দুল মুহতার, ১/৪৬১)। তাই শুধু যদি সম্পূর্ণ অস্পষ্ট করা না হয়, তবে তা জায়েজ হবে না। দাওয়াতি উদ্দেশ্য হলেও নিষিদ্ধ উপায় গ্রহণ করা যাবে না।

৭) ৩ নম্বরের মতো তুলনামূলক কম স্পষ্ট (কিন্তু মুখের কিছুটা ইঙ্গিত থাকে) ব্লার ব্যবহার করা যাবে কি?

উত্তর: না, এটি ব্যবহার করা যাবে না। যখনই কোনো নারীর চিহ্ন বা আকৃতি বোধগম্য হয়, তা দেখার অনুমতি নেই। শুধুমাত্র সম্পূর্ণ অচেনা করে দেওয়া (যেমন পুরোপুরি পিক্সেলেট বা অস্পষ্ট) ব্লারই দাওয়াতী প্রয়োজনে সীমিতভাবে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া যায়। তাই প্রশ্নোক্ত ৩ নম্বর ব্লার জায়েজ নয়। উত্তম হলো এমন ছবি ব্যবহার না করেই ডকুমেন্টারি তৈরি করা, অথবা শুধু পাঠ্য বা প্রতীক দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া।


সার-সংক্ষেপ: অনিচ্ছাকৃত নজর পড়লে গুনাহ নেই, কিন্তু ইচ্ছাকৃত তাকানো হারাম। বেগানা নারীর ছবি দেখা নিষিদ্ধ; শুধুমাত্র সম্পূর্ণ অচেনা করার পর দাওয়াতী উদ্দেশ্যে অপ্রয়োজনে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সর্বোত্তম হলো সম্পূর্ণ পরিহার।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.