কন্ট্রাক্টরের দেওয়া উপহার বা খাবার খাওয়া কি জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
কন্ট্রাক্টররা যদি আপনাকে উপহার বা খাবার এমনি শুভেচ্ছা হিসেবে দেয়—কোনো কাজের শর্ত, অনুরোধ বা ঘুষের সম্পর্ক ছাড়া—তবে তা নেওয়া বা খাওয়া মূলত জায়েজ। তবে আপনার অবস্থান যেহেতু এমন যে আপনি তাদের বিল অনুমোদন করেন এবং কাজের মান যাচাই করেন, তাই এতে ঘুষ (রিশওয়াত) বা স্বার্থের দ্বার খুলে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে সতর্কতা ও পরহেজগারির দৃষ্টিতে তা না নেওয়াই উত্তম, বরং অনেক ক্ষেত্রে ওয়াজিব/জরুরি হয়ে পড়ে।
১. মূল নীতি: হাদিয়া (উপহার) হালাল, ঘুষ হারাম
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«هَدَايَا الْعُمَّالِ غُلُولٌ» “কর্মচারীদের (সরকারি/দায়িত্বশীলদের) উপহার হলো খিয়ানত/আত্মসাৎ।” — সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৯৪৫; মুসনাদে আহমাদ; মুস্তাদরাকে হাকিম (হাদিসটি হাসান)
আরেক হাদিসে:
«مَنْ أَهْدَى إِلَيْهِ عَامِلٌ هَدِيَّةً فَقَبِلَهَا فَقَدْ أَتَى بَابًا مِنْ أَبْوَابِ الرِّبَا» “কোনো কর্মচারীকে কেউ উপহার দিলে সে তা গ্রহণ করলে সে সুদের একটি দরজায় পৌঁছে গেল।” — মুসনাদে আহমাদ
ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ (রহ.)-এর ফিকহে ঘুষের সংজ্ঞা:
“যে মাল কোনো অধিকারের বিনিময়ে বা অন্যায় সুবিধা আদায়ের জন্য দেওয়া হয়, তা ঘুষ।”
— রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খ. ৫, ‘বাবুল ইজারাহ’; ফাতাওয়া আলমগিরি, খ. ৩
২. আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান
আপনি যেহেতু কন্ট্রাক্টরদের বিল পাস, কাজের মান যাচাই ও মূল্যায়ন করেন, তাই তাদের পক্ষ থেকে দেওয়া উপহার/খাবার নিম্নোক্ত কারণে সন্দেহজনক ও পরিহারযোগ্য:
-
এতে স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest) তৈরি হয়—আজ উপহার নিলে কাল বিল পাসে বা মান যাচাইয়ে পক্ষপাত হতে পারে।
-
ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন:
«كُلُّ هَدِيَّةٍ تُورِثُ الْمُهْدِيَ عَلَى الْمُهْدَى إِلَيْهِ وِلَايَةً أَوْ شَفَاعَةً فَهِيَ رِشْوَةٌ» “যে উপহারের কারণে দাতার প্রতি গ্রহীতার কোনো আনুগত্য, সুপারিশ বা পক্ষপাত তৈরি হয়, তা-ই ঘুষ।” — রদ্দুল মুহতার; ফাতাওয়া উসমানি, খ. ৩, ‘রিশওয়াত’ অধ্যায়
-
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ‘বেহেশতী জেওর’-এ ও ‘ইমদাদুল ফাতাওয়া’য় স্পষ্ট বলেছেন: চাকরিজীবী বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির জন্য অধীনস্থ বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের উপহার গ্রহণ করা খিয়ানতের অন্তর্ভুক্ত, যদিও তা সরাসরি ঘুষ না হয়।
-
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ‘ফাতাওয়া উসমানি’-তে বলেন: চাকরির সুবাদে প্রাপ্ত উপহার যদি প্রথা বা সম্পর্কের কারণে হয় এবং তাতে কোনো পক্ষপাতের আশঙ্কা না থাকে, তবে জায়েজ; কিন্তু যদি দাতা বা গ্রহীতার মধ্যে কোনো স্বার্থ জড়িত থাকে, তবে তা ঘুষ হিসেবে হারাম।
৩. ব্যবহারিক নির্দেশনা
- সরাসরি ঘুষ বা শর্তযুক্ত উপহার (যেমন: “বিলটা পাস করে দেন, এটা আপনার জন্য”) — সম্পূর্ণ হারাম, কোনোভাবেই নেওয়া যাবে না।
- কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত পক্ষের নিয়মিত উপহার/খাবার — পরিহার করাই উত্তম; নিলে সন্দেহ ও খিয়ানতের আশঙ্কা থাকে।
- সাধারণ শুভেচ্ছা, ঈদ-উৎসবের উপহার, পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে এবং তাতে কোনো স্বার্থ বা পক্ষপাতের আশঙ্কা না থাকলে — জায়েজ।
- সরকারি/প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা যদি উপহার গ্রহণ নিষিদ্ধ করে, তবে তা মানা শরীয়তের দৃষ্টিতেও আবশ্যক (আমিরের আনুগত্য)।
- সন্দেহ হলে না নেওয়াই তাকওয়া; আর যদি ইতোপূর্বে নিয়ে থাকেন এবং তাতে ঘুষের সন্দেহ থাকে, তবে ফিরিয়ে দেওয়া বা সমমূল্য দান করা জরুরি।
উপসংহার
আপনার প্রশ্নের সারকথা: কন্ট্রাক্টরদের দেওয়া উপহার/খাবার নেওয়া মূলত জায়েজ, যদি তা নিছক শুভেচ্ছা হয় এবং কোনো স্বার্থ, শর্ত বা পক্ষপাতের আশঙ্কা না থাকে। কিন্তু আপনার পদ ও দায়িত্বের কারণে সতর্কতামূলকভাবে তা পরিহার করাই উত্তম ও নিরাপদ, এবং ঘুষের সন্দেহ থাকলে তা হারাম।
والله أعلم بالصواب