মেসেজের মাধ্যমে রাগের বশে তিন তালাক দেওয়ার পর সমঝোতায় আসা যাবে কি?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 8071
Questioner: Rahat Sheikh
Question Asked: 06 Nov 2026, 06:04 PM
Reviewed & Published: 06 Nov 2026, 06:14 PM
Views: 43
Tokens: 4,036
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু'আলাইকুম,
আমি আমার স্ত্রীকে উত্তপ্ত বাকবিতন্ডায় রাগের বশে ম্যাসেজের মাধ্যমে তিন তালাকের ঘোষনা দিই।কিন্তু পরবর্তীতে আবার আমরা সমাঝোতায় এসেছি। এখন আমাদের নিকাহ কি বহমান আছে হযরত?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর

না, আপনার নিকাহ বহাল নেই। মেসেজের মাধ্যমে তিন তালাকের ঘোষণা দেওয়ার কারণে আপনার স্ত্রী উপর তিন তালাক পতিত হয়েছে এবং নিকাহ সম্পূর্ণরূপে ভেঙে গেছে। পরবর্তীতে সমঝোতায় আসা বা একসাথে সংসার করার দ্বারা নিকাহ পুনরুদ্ধার হবে না। তবে শরীয়তসম্মত পন্থায় (হালালা) নতুন করে নিকাহ করা সম্ভব।


বিস্তারিত আলোচনা

১. মেসেজ/লিখিত ঘোষণায় তালাক পতিত হয়

তালাক পতিত হওয়ার জন্য মুখে উচ্চারণ শর্ত নয়; লিখিত বা লিখিত-সদৃশ (মেসেজ, চিঠি, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদি) ঘোষণাও তালাক হিসেবে গণ্য হয়। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, স্পষ্ট লিখিত তালাক (তালাকুন সারীহ) পতিত হয়, এমনকি তালাকের নিয়ত না করলেও।

রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ৩, পৃ. ২৪৪:
"الكتابة كالخطاب" — অর্থাৎ লিখন মুখের কথার মতো।

আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক:
"ولو كتب الطلاق على وجه الاستخفاف أو الاستهزاء يقع" — তালাক লিখলে তা পতিত হয়।

২. রাগের বশে তালাক দিলেও তা কার্যকর হয়

রাগের কারণে তালাক পতিত না হওয়ার শর্ত হলো—রাগ এত তীব্র হওয়া যে জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পায় (যেমন পাগল হয়ে যাওয়া বা অচেতন হওয়া)। শুধু "রাগের বশে" বলা বা লেখা তালাক পতিত হওয়া থেকে রক্ষা করে না।

রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৩৫:
"الغضب لا يمنع وقوع الطلاق إلا إذا زال العقل" — রাগ তালাক পতিত হওয়া রোধ করে না, তবে যদি জ্ঞান লোপ পায় (তাহলে নয়)।

ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুত তালাক:
"الغضب الذي لا يزيل العقل لا يمنع وقوع الطلاق" — যে রাগ জ্ঞান নষ্ট করে না, তা তালাক পতিত হওয়া রোধ করে না।

৩. তিন তালাক একসাথে দিলে তিনটিই পতিত হয়

এক বৈঠকে বা একই ঘোষণায় তিন তালাক দিলে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী তিনটিই কার্যকর হয় এবং বাইন তালাক (চূড়ান্ত বিচ্ছেদ) সংঘটিত হয়। এরপর স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার কোনো অধিকার স্বামীর থাকে না।

আল-হিদায়া:
"إذا طلقها ثلاثًا في مجلس واحد وقعن ثلاثًا" — এক বৈঠকে তিন তালাক দিলে তিনটিই পতিত হয়।

রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৫৬:
"الثلاث في مجلس واحد تقع ثلاثًا عندنا" — আমাদের (হানাফি) মতে এক বৈঠকে তিন তালাক তিনটিই পতিত হয়।

সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৭২ (ইবনে আব্বাস রা. থেকে):
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে, আবু বকর (রা.)-এর যুগে এবং উমর (রা.)-এর খিলাফতের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত এক বৈঠকে তিন তালাক এক তালাক হিসেবে গণ্য হতো। এরপর উমর (রা.) তা তিনটিই কার্যকর করেন এবং মুসলিমরা তা মেনে নেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এই ইজমা ও আমলকে গ্রহণ করেছেন।

৪. সমঝোতা বা পুনর্মিলনে নিকাহ ফিরে আসে না

তিন তালাক পতিত হলে নিকাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। শুধু "সমঝোতায় আসা" বা একসাথে থাকা শরীয়তসম্মত নিকাহ পুনরুদ্ধার করে না। এ অবস্থায় একসাথে বসবাস করা হারাম এবং যিনার সমতুল্য।

সূরা বাকারা, আয়াত ২৩০:
"فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ"
"অতঃপর যদি সে তাকে (তৃতীয়) তালাক দেয়, তবে তারপর সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য কোনো স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।"

রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৫৬:
তিন তালাকের পর স্ত্রী স্বামীর জন্য হালাল হয় না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীর সাথে সহবাসসহ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং সেই স্বামী তাকে তালাক দেয় বা মৃত্যুবরণ করে।

৫. সমাধানের পথ

  1. তওবা ও ইস্তিগফার: রাগের বশে তালাক দেওয়া এবং পরবর্তীতে বিনা নিকাহতে একসাথে থাকা—উভয়ের জন্য আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা করুন।
  2. বিচ্ছেদ মেনে নিন: শরীয়ত অনুযায়ী ইদ্দত পূর্ণ করুন এবং পৃথক থাকুন।
  3. হালালা (শরীয়তসম্মত পন্থা): স্ত্রীকে শরীয়তসম্মতভাবে অন্য একজন মুসলিম পুরুষের সাথে প্রকৃত নিয়তে বিবাহ করতে হবে (শুধু হালালা করার উদ্দেশ্যে নয়—এটি নিষিদ্ধ ও অভিশপ্ত)। সেই বিবাহ যদি স্বাভাবিক কারণে ভেঙে যায় (তালাক বা মৃত্যু), এবং ইদ্দত শেষ হয়, তখন পূর্বের স্বামীর সাথে নতুন মোহর ও সাব্যস্ত কেরে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যাবে।

সতর্কতা

  • তালাক নিয়ে ঠাট্টা বা রাগের বশে ঘোষণা দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তিনটি বিষয়ে ঠাট্টাও গুরুত্বপূর্ণ—নিকাহ, তালাক ও রাজআত" (তিরমিজি, হাদিস ১১৮৪)।
  • বিনা নিকাহতে একসাথে থাকা হারাম। এটি কেবল শরীয়তবিরোধী নয়, বরং গুরুতর গুনাহ।
  • স্থানীয় মুফতির সরাসরি পরামর্শ নিন — কারণ তালাকের শব্দ, সংখ্যা, নিয়ত, পরিস্থিতি ইত্যাদি বিস্তারিত জানা ছাড়া চূড়ান্ত ফতোয়া দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।

রেফারেন্স সারসংক্ষেপ

| কিতাব | বিষয় | |---|---| | সূরা বাকারা ২৩০ | তিন তালাকের পর হালালা ছাড়া ফেরা নিষিদ্ধ | | সহিহ মুসলিম ১৪৭২ | এক বৈঠকে তিন তালাকের হুকুম | | আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক | লিখিত তালাক ও তিন তালাক একসাথে | | রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩ | রাগ, লিখন, তিন তালাকের বিস্তারিত | | ফাতাওয়া আলমগিরি | রাগ তালাক রোধ করে না | | ইমদাদুল ফাতাওয়া | তালাকের শব্দ ও নিয়ত | | ফাতাওয়া উসমানি | সমকালীন মাসআলা (মেসেজ/লিখিত তালাক) |


والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.