“প্রাইভেটে গেলে তালাগ।” এভাবে বললে কি তালাক হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম।
আমি হানাফি মাজহাব অনুযায়ী একটি মাসআলা জানতে চাই।
আমি আমার স্বামীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আমি যদি প্রাইভেট না ছাড়ি, তাহলে আপনি কী করবেন?”
উত্তরে আমার স্বামী বলেছিলেন, “প্রাইভেটে গেলে তালাগ।”
তিনি কথাটি স্ত্রীকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, “তালাগ” শব্দটি দিয়ে তিনি তালাকের অর্থ বোঝাননি এবং তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্যও ছিল না।
আমার প্রশ্ন:
১. এ অবস্থায় কি শরিয়ত অনুযায়ী তালাক কার্যকর হয়েছে?
২. তালাকের উদ্দেশ্য না থাকলে এবং শব্দটি দিয়ে তালাকের অর্থ না বোঝালে হানাফি মাজহাবে কী হুকুম হবে?
৩. এটি কি শর্তযুক্ত তালাক হিসেবে গণ্য হবে?
দয়া করে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য ফতোয়া জানাবেন।
জাযাকাল্লাহু খাইরান।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
উত্তর
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আপনার জিজ্ঞাসিত মাসআলাটির হানাফী ফিকহ ও প্রামাণ্য ফাতাওয়া কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ সুনির্দিষ্ট ৩টি প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য শরঈ ফয়সালা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. ১ম প্রশ্নের উত্তর: এ অবস্থায় কি শরীআত অনুযায়ী তালাক কার্যকর হয়েছে?
না, বর্তমান অবস্থায় বা এখন পর্যন্ত কোনো প্রকার তালাক কার্যকর বা পতিত হয়নি।
- প্রামাণ্য ব্যাখ্যা: আপনার স্বামী যেহেতু কথাটি একটি শর্তের সাথে যুক্ত করে বলেছেন ("প্রাইভেটে গেলে..."), তাই শরীআতের দৃষ্টিতে এটি একটি স্থগিত বা শর্তাধীন বক্তব্য। যতক্ষণ না পর্যন্ত শর্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে (অর্থাৎ আপনি প্রাইভেটে না যাচ্ছেন), ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো তালাক পতিত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বর্তমানে আপনাদের বিবাহ ও বৈবাহিক সম্পর্ক শতভাগ বহাল ও হালাল রয়েছে।
২. ২য় প্রশ্নের উত্তর: তালাকের উদ্দেশ্য না থাকলে এবং "তালাগ" শব্দ বললে কী হুকুম?
ক. 'তালাগ' (গ দিয়ে) উচ্চারণের ফিকহী বিধান:
- ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অঞ্চলভেদে বা ভাষাভাষীদের উচ্চারণের সাধারণ ত্রুটি ও বিকৃতির কারণে 'তালাক' (ক) শব্দকে যদি কেউ 'তালাগ' (গ) বা 'তলাগ' বলে উচ্চারণ করে, আর সমাজের প্রচলিত ভাষায় (উর্ফে) এর দ্বারা তালাকই নির্দেশ করা হয়, তবে শরীআতের বিচারে তা 'সরিহ' (স্পষ্ট) তালাকের হুকুমে গণ্য হয়।
খ. ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে বলা ও নিয়ত না থাকার ফিকহী বিধান:
- রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
«ثَلَاثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ: النِّكَاحُ، وَالطَّلَاقُ، وَالرَّجْعَةُ» (অর্থ: "তিনটি বিষয় এমন রয়েছে, যা ইচ্ছাকৃতভাবে করলেও কার্যকর হয় এবং হাসি-ঠাট্টা বা ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে বললেও কার্যকর হয়ে যায়— বিবাহ, তালাক এবং রাজআত/তালাক প্রত্যাহার।") (সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিযী; দরসুল ফিকহ ১/২৬৮)।
- অতএব, স্বামী যদি মুখ দিয়ে তালাকের স্পষ্ট বা প্রচলিত শব্দ উচ্চারণ করে ফেলেন, তবে "ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে বলেছিলাম" বা "মনে তালাকের উদ্দেশ্য ছিল না" বললে শরীআতের বিচারে (ক্বাযা'আন) তা গ্রহণযোগ্য হয় না। শর্ত পূরণ হয়ে গেলে তালাক কার্যকর হয়ে যাবে।
৩. ৩য় প্রশ্নের উত্তর: এটি কি শর্তযুক্ত তালাক হিসেবে গণ্য হবে?
হ্যাঁ, এটি ফিকহের পরিভাষায় 'তালীকুত তালাক' (تعليق الطلاق - শর্তযুক্ত তালাক) হিসেবে গণ্য হবে।
- তালীকুত তালাকের সুনির্দিষ্ট শরঈ ফয়সালা: ১. প্রাইভেটে গেলে: আপনি যদি পরবর্তীতে ওই প্রাইভেটে যান (অর্থাৎ স্বামীর আরোপিত শর্ত বাস্তবায়িত হয়), তবে সাথে সাথে আপনার ওপর ১টি তালাকে রাজয়ী (প্রত্যাখ্যানযোগ্য তালাক) পতিত হয়ে যাবে। (সেক্ষেত্রে ইদ্দতের ভেতরে স্বামী মুখে বা আচরণের মাধ্যমে রাজআত/ফেরত নিলেই নতুন বিয়ে ছাড়াই দাম্পত্য সম্পর্ক বহাল হয়ে যাবে)। ২. প্রাইভেটে না গেলে: আর আপনি যদি প্রাইভেটে যাওয়া বাদ দেন বা না যান, তবে শর্ত অপূরণীয় থাকার কারণে কখনোই কোনো তালাক পতিত হবে না এবং আপনার সংসার সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে।
সংযুক্ত কিতাবসমূহের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
-
ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড - বাংলা সংস্করণ):
- পৃষ্ঠা: ২৫৭ (হিন্দিয়াহ ১/৩৫৭) (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক, ২য় পরিচ্ছেদ: তালাক পতিত করা — 'তালাক শব্দ বিকৃত বা অস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা (যেমন: তলাগ, তালাগ ইত্যাদি) এবং সমাজের প্রচলিত উরফে তা সরীহ তালাক গণ্য হওয়া সংক্রান্ত ফিকহী মাসআলা')।
- পৃষ্ঠা: ৩৫৪, ৩৫৫ (হিন্দিয়াহ ১/৪২০) (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক, ৪থ পরিচ্ছেদ: শর্তের সাথে তালাক দেওয়ার বিবরণ — 'তালীকুত তালাক বা শর্তযুক্ত করার মাসআলা: শর্ত না পাওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর না হওয়া এবং শর্ত পাওয়া মাত্রই তালাক পতিত হওয়া')।
- পৃষ্ঠা: ২৪৭ (হিন্দিয়াহ ১/৩৫৩) (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক, ১ম পরিচ্ছেদ: যে যে ব্যক্তির তালাক পতিত হয় — 'পরিহাসচ্ছলে বা ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে তালাক বললেও তালাক কার্যকর হওয়ার ফিকহী বর্ণনা')।
-
দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ২৬৭, ২৬৮ (দরসুল ফিকহ ১/২৬৭, ২৬৮) (অধ্যায়: 'তালাক ও ডিভোর্সের শর'য়ী বিধান — ভয় দেখানো বা হাস্যাচ্ছলে তালাক প্রদান সংক্রান্ত আবু দাউদ ও তিরমিযীর হাদীসের বিবরণ')।
- পৃষ্ঠা: ২৭০, ২৭১ (দরসুল ফিকহ ১/২৭০, ২৭১) (অধ্যায়: 'তালাক তাফবীয ও শর্তযুক্ত তালাকের (তালীক) সুনির্দিষ্ট হুকুম')।
-
ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৩শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ২৭, ২৮, ৩৫ (মাহমুদিয়া ১৩/২৭, ২৮, ৩৫) (অধ্যায়: বাব তা'লীকুত তালাক — 'শর্ত সাপেক্ষে তালাক ঝুলন্ত রাখা এবং শর্ত পাওয়া সাপেক্ষে তালাক কার্যকর হওয়ার ফতোয়া')।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ ও আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ