শ্বাশুড়ির সাথে সম্পর্ক কেমন হবে? শ্বাশুড়িকে এভয়েড করা কি গুনাহ?

Family Life · Hanafi

Question No: 7977
Questioner: Afsana Akhter
Question Asked: 05 Nov 2026, 04:57 AM
Reviewed & Published: 05 Nov 2026, 05:06 AM
Views: 10
Tokens: 12,444
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমার বিবাহিত জীবন ১০-১১ বছরের। তার মধ্যে যৌথ পরিবারে ছিলাম, আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলাম ৭-৮ বছর। এই সময়টাতে আমার শ্বাশুড়ি আমাকে মানসিক ভাবে অনেক আঘাত করেছেন আমি কখনো কিছু প্রতিউত্তর করিনি। আমার স্বামী আমাকে ধৈর্য্য ধরতে বলেছিলেন কারণ তখন শুশুর বাড়ি থেকে আমি বাবার বাড়িতে থাকতাম বেশি। তাই আমি কখনো এটা নিয়ে কিছুই বলিনি। যতদিন থাকতাম ততদিন আমি সব মুখ বুঝে মেনে নিয়েছি। এমনকি উনি আমার সংসার টাও ভাঙতে চেয়েছেন জেনেও আজ অবধি ওনার সাথে আমি কোন খারাপ কথা, আচরণ করিনি। বর্তমানে আমি আমার স্বামীর সাথে আলাদা ভাড়া বাসায় থাকি ৪ বছর। আমি শ্বশুর-শ্বাশুড়ি বা বাদ বাকি সবাই কম বেশি বাসায় থাকেন প্রায়ই। গত ৪ বছের আমি অনেক কষ্ট করে আমার বর্তমান সংসার টা গুছিয়েছি। আমার সংসারে আমি কোন কিছুর অভাব না রাখার চেষ্টা করেছি। আমার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি গ্রামেই থাকেন প্রায় আমার দেবর আর তার ওয়াইফ এর সাথে। ওনারা শহর জীবনে অভ্যস্ত নন তাই। আমার স্বামী ওনাদের ঔষধ খরচ( মাসে প্রায় ১০-১৫ হাজার) নিজে বহন করেন সম্পূর্ণ। এমনকি ডাক্তার খরচ, হসপিটাল খরচ সবই আমার স্বামী দেন। ওনাদের হাত খরচ দিয়েন থাকেন দুজনকেই আলাদাভাবে ৪-৫ হাজার করে। এমনকি প্রয়োজনে এর বেশিও দেন। এছাড়া সংসারে লাগলে আমার দেবর আমার স্বামীর থেকে টাকা নিয়ে যায়। বাড়িতে প্রায় সব কিছুই আমার স্বামী নিজের টাকা থেকে করে দিয়েছেন। এখনো লাগলে করে দেন। আমার বাসায় শ্বশুর -শ্বাশুড়ি আসলে আমার সাধ্যমত করার চেষ্টা করি। বর্তমানে আমার ৩.৫ বছরের একটা বেবি আছে। তাই চাইলেও অনেক কিছু সময়মতো পারিনা।
(এগুলো আমি বিস্তারিত বলেছি কারণ আমি সম্পূর্ণ একটা সিদ্ধান্তে যেতে চাই।)
এবার আমার মূল সমস্যাটা হলো কিছুদিন আগে দূর্ভাগ্যবসত ওনাকে আমি আমার সম্পর্কে মানুষের কাছে আমার নানাভাবে বদনাম করতে শুনি। এমনকি আমার বাসায় আমার সকল কিছু উনি ভিডিও কলে দেখাচ্ছেন আর আমাকে তিরস্কার করেছেন। আমার মনে হলো এখানে তিনি আমার প্রাইভেসি নষ্ট করেছেন। এভাবে ওনি অনেককে বলেছেন ওনার পরিচিত। আমি ওনাদের ঠিকমতো খাওয়াই না, ওনাদের খাবার আমি কেন রেখে আসি কিন্তু ওনাদের কেন খেতে বলিনা। এসব অনেক কথাই বলেছেন যা আসলে সাংসারিক বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। তাছাড়া আমার স্বামী নাকি ওনাদের শুধু ঔষধ খরচ দেন আর কিছু দেননা। তিনি নাকি অনেক অভাবে আছেন থাকেন। অথচ আমার বাসায় ভালো কিছু আসলে আমি ওনাদের জন্য অবশ্যই দেওয়ার চেষ্টা করি। উনি আমার স্বামীকে একপ্রকার অভিশাপ দিচ্ছেন। এটা শুনে আমার কলিজা ছিড়ে যাচ্ছে। আমি স্বীকার করছি আমি ওনাদের থেকে কিছুটা বাড়তি সুবিধা পাই বাসায়। এখানে আমার বাবার ও কিছু প্রতিদান আছে। বর্তমানে আমার বাবা বেঁচে নেই।
এখন আমি আমার শ্বাশুড়ির সাথে কোনভাবেই স্বাভাবিক হতে পারছি না। আমি ওনাকে এক প্রকার সহ্য করতে পারছিনা। ওনাকে দেখলে আমার ওনার বলা কথা গুলো মনে পড়ে, রাগ হয়। আমি আমার স্বামীকে বলতে চাইনা। উনি হয়ত রাগ করে কিছু বলে ফেলে কিনা।
এখন আমি কি আমার শ্বাশুড়িকে এভয়েড করতে পারবো? আমি আসলে ওনার সাথে বাড়তি কোন কথা বলতে চাচ্ছি না। সালামের বাইরে। আমি গুণাহগার হবো কিনা? আশা করি আমাকে ভালো সিদ্ধান্ত দিবেন হাদিসের আলোকে।

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রিয় বোন, আপনার দীর্ঘ ও আবেগমাখা প্রশ্নটি পড়ে বুঝতে পারছি—আপনি দীর্ঘদিন ধরে অনেক ধৈর্য ধরে আছেন, এবং এখন মানসিকভাবে খুব ক্লান্ত। আপনার প্রশ্নের মূল বিষয়গুলো হলো:

১. শ্বাশুড়ির সাথে সম্পর্ক কীভাবে রাখবেন? ২. শ্বাশুড়িকে এভয়েড (এড়িয়ে চলা) করা কি গুনাহ? ৩. সালামের বাইরে কথা না বলা কি ঠিক হবে? ৪. স্বামীকে বিষয়টি জানানো উচিত কি না?

নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দিচ্ছি।


১. শ্বাশুড়ির সাথে সম্পর্কের ইসলামি বিধান

ইসলামে শ্বাশুড়ি (স্ত্রীর জন্য স্বামীর মা) মাহরাম এবং তার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — (সূরা নিসা: ১৯)

আরেক আয়াতে:

وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ "আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে চাওয়া-পাওয়া করো, এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে (সতর্ক থাকো)।" — (সূরা নিসা: ১)

হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।" — (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৬, সহিহ মুসলিম: ৪৭)

হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে: শ্বাশুড়ি আপনার জন্য মাহরাম এবং তার খেদমত ও সদ্ব্যবহার করা ইসলামে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। তবে ইসলাম আপনাকে মানসিক নির্যাতন সহ্য করার নির্দেশ দেয়নি; বরং ধৈর্য ও সংযমের সাথে দূরত্ব বজায় রেখে সদ্ভাব রক্ষা করা হলো উত্তম পথ।


২. শ্বাশুড়িকে এভয়েড করা কি গুনাহ?

সরাসরি সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা (কাটা) হারাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثِ لَيَالٍ "কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয় তার ভাইকে তিন রাতের বেশি ত্যাগ করা।" — (সহিহ বুখারি: ৬০৭৭, সহিহ মুসলিম: ২৫৬০)

তবে সালাম-সালামি ও প্রয়োজনীয় সদ্ভাব বজায় রেখে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও মেলামেশা কমানো জায়েয। এটি সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়; বরং নিজেকে মানসিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করা। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন যে, কেউ যদি কারো দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে সে তার সাথে সাক্ষাত কমিয়ে দিতে পারে, তবে সালাম ও প্রয়োজনীয় সদ্ভাব বজায় রাখতে হবে। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৮০-এর কাছাকাছি আলোচনা)

সুতরাং: আপনি শ্বাশুড়িকে সম্পূর্ণ এভয়েড করবেন না, বরং সালাম দিবেন, প্রয়োজনীয় কথা বলবেন, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় আলাপ-আলোচনা ও মেলামেশা কমিয়ে দিবেন। এটি গুনাহ নয়; বরং এটি একটি বৈধ প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা।


৩. সালামের বাইরে কথা না বলা

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ "তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।" — (সহিহ মুসলিম: ৫৪)

সালাম দেওয়া সুন্নত এবং তা বজায় রাখা আবশ্যক। তবে সালামের বাইরে অপ্রয়োজনীয় কথা না বলা বা কম বলা জায়েয। তবে মনে রাখবেন—এটি যেন দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ক ছিন্নতায় পরিণত না হয়। আপনি সালাম দিবেন, হাসিমুখে সম্ভব হলে সংক্ষিপ্ত কথা বলবেন, কিন্তু যেসব বিষয় আপনাকে মানসিকভাবে কষ্ট দেয়, সেগুলো নিয়ে আলোচনায় যাবেন না।


৪. স্বামীকে বিষয়টি জানানো

আপনার স্বামী আপনার জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক পরামর্শ ও সহযোগিতা থাকা উচিত। কুরআনে আল্লাহ বলেন:

وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا "তুমি তোমার পরিবারকে নামাজের আদেশ দাও এবং তাতে ধৈর্য ধারণ করো।" — (সূরা ত্বহা: ১৩২)

আপনি স্বামীকে রাগ না ধরিয়ে, শান্তভাবে, প্রমাণসহ বিষয়টি জানাতে পারেন। কিন্তু অভিযোগের সুরে নয়; বরং বলুন—"আমি মানসিকভাবে খুব কষ্টে আছি, আপনি একটু বুঝিয়ে দিলে ভালো হতো।" স্বামীকে শ্বাশুড়ির বিরুদ্ধে উসকে দিবেন না; বরং তাকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করুন।

হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

الْمُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا "এক মুমিন আরেক মুমিনের জন্য দেয়ালের মতো, যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্ত করে।" — (সহিহ বুখারি: ৪৮১, সহিহ মুসলিম: ২৫৮৫)


৫. শ্বাশুড়ির গীবত ও বদনাম সম্পর্কে

শ্বাশুড়ি আপনার সম্পর্কে মানুষের কাছে বদনাম করছেন—এটি গীবত এবং ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন:

وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا "তোমরা একে অপরের গীবত করো না।" — (সূরা হুজুরাত: ১২)

তবে আপনি তার গীবত করবেন না; বরং আল্লাহর কাছে তার হেদায়েতের দোয়া করবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

اتَّقِ اللَّهَ وَلَا تُقَابِلِ الْإِسَاءَةَ بِالْإِسَاءَةِ (অর্থ: আল্লাহকে ভয় করো এবং মন্দের জবাব মন্দ দিয়ে দিও না।) — (তিরমিজি: ২০০৭-এর আলোকে)

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.