স্বামীর অবহেলায় কষ্ট পাওয়া স্ত্রীর জন্য করণীয় কি?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
স্বামীর অবহেলায় কষ্ট পাওয়া স্ত্রীর জন্য ইসলামি দিকনির্দেশনা
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
একজন স্ত্রী তার স্বামীর কাছ থেকে ভালোবাসা, সহানুভূতি ও মানসিক সমর্থন প্রত্যাশা করেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি অবহেলা, ঠান্ডা ব্যবহার ও মানসিক কষ্ট পাচ্ছেন। তিনি জানতে চান—এ পরিস্থিতিতে ইসলাম কী বলে এবং তিনি কী করবেন।
১. প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা: আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَهُوۡا شَیۡئًا وَّهُوَ خَیۡرٌ لَّکُمۡ ؕ وَعَسٰۤی اَنۡ تُحِبُّوۡا شَیۡئًا وَّهُوَ شَرٌّ لَّکُمۡ ؕ وَاللّٰهُ یَعۡلَمُ وَ اَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ
"হয়তো তোমরা কোনো জিনিসকে অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর; আর হয়তো তোমরা কোনো জিনিসকে ভালোবাসছ, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।" — সূরা বাকারা: ২১৬
এবং আরও বলেন:
لَا یُکَلِّفُ اللّٰهُ نَفۡسًا اِلَّا وُسۡعَهَا
"আল্লাহ কারো ওপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" — সূরা বাকারা: ২৮৬
ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) তাঁর রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, বিপদে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর ফয়সালায় রাজি থাকা মুমিনের অন্যতম গুণ। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ১৪০-এর কাছাকাছি)
২. স্বামীর প্রতি দায়িত্ব ও হক — ইসলাম যা বলেছে
ক) স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দায়িত্ব
আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰهُ
"সৎকর্মপরায়ণ স্ত্রীরা অনুগত এবং আল্লাহ যা সংরক্ষণ করেছেন তার ভিত্তিতে গোপন বিষয়েও সংরক্ষণকারী।" — সূরা নিসা: ৩৪
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا صَلَّتِ الْمَرْأَةُ خَمْسَهَا، وَصَامَتْ شَهْرَهَا، وَحَفِظَتْ فَرْجَهَا، وَأَطَاعَتْ زَوْجَهَا، قِيلَ لَهَا: ادْخُلِي الْجَنَّةَ مِنْ أَيِّ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ شِئْتِ
"যখন কোনো নারী তার পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজানের রোজা রাখে, নিজের সতীত্ব রক্ষা করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তাকে বলা হবে: তুমি জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করো।" — সুনানে তিরমিজি: ১১৬৩; মুসনাদে আহমাদ: ১৬৬১
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, স্ত্রীর ওপর স্বামীর আনুগত্য ওয়াজিব, তবে তা গুনাহের কাজে নয়। (আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৫৪৮)
খ) স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দাবি — ইসলাম স্বীকৃত
ইসলাম স্বামীকে স্ত্রীর প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে:
وَعَاشِرُوۡهُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ
"তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — সূরা নিসা: ১৯
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।" — সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫; সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৯৭৭
اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا
"নারীদের ব্যাপারে তোমাদেরকে ভালো আচরণের অসিয়ত করছি।" — সহিহ বুখারি: ৫১৮৬; সহিহ মুসলিম: ১৪৬৮
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তাঁর বেহেশতী জেওর-এ লিখেছেন: "স্বামীর উচিত স্ত্রীর প্রতি স্নেহশীল হওয়া, তার মনের অবস্থা বোঝা এবং তাকে কষ্ট না দেওয়া। স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়া আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয়।" (বহিশতী জেওর, নিকাহ অধ্যায়)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মাআরিফুল কুরআন-এ সূরা নিসা ১৯ নং আয়াতের তাফসিরে লেখেন: "এ আয়াত স্বামীকে স্ত্রীর সাথে সদাচরণ, সহানুভূতি ও ন্যায়বিচারের নির্দেশ দেয়। স্ত্রীর মানসিক কষ্ট দেওয়া এ নির্দেশের পরিপন্থী।" (মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড ২, পৃ. ৩৬০-এর কাছাকাছি)
৩. আপনার করণীয় — ধাপে ধাপে ইসলামি সমাধান
ধাপ ১: ধৈর্য ও দুআ — প্রথম অস্ত্র
আল্লাহ বলেন:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اسۡتَعِیۡنُوۡا بِالصَّبۡرِ وَالصَّلٰوۃِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الصّٰبِرِیۡنَ
"হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" — সূরা বাকারা: ১৫৩
রাসূলুল্লাহ ﷺ বিপদে পড়লে এই দুআ পড়তেন:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَرَبُّ الْأَرْضِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ
— সহিহ বুখারি: ৬৩৪৫; সহিহ মুসলিম: ২৭৩০
এছাড়া সালাতুল হাজাত পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে স্বামীর হেদায়েত ও নিজের অন্তরের শান্তির জন্য দুআ করুন।
ধাপ ২: শান্তভাবে কথা বলা — সরাসরি অভিযোগ নয়
আল্লাহ বলেন:
وَقُوۡلُوۡا لِلنَّاسِ حُسۡنًا
"মানুষের সাথে সদালাপ করো।" — সূরা বাকারা: ৮৩
স্বামীকে যখন মন খুলে বলবেন, তখন অভিযোগের ভাষায় নয়, বরং নিজের অনুভূতির ভাষায় বলুন। যেমন: "আমি যখন কষ্টে থাকি, তখন আপনি একটু খোঁজ নিলে আমার অনেক ভালো লাগে।" — এভাবে বললে স্বামী সহজে বুঝতে পারবেন।
ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) লিখেছেন: "স্ত্রীর উচিত স্বামীর সাথে নরম ভাষায় কথা বলা এবং কঠোরতা পরিহার করা; কেননা নরম ভাষা হৃদয় জয় করে।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুন নিকাহ)
ধাপ ৩: বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে সমঝোতা
যদি সরাসরি কথা বলেও কাজ না হয়, তাহলে পরিবারের বিশ্বস্ত কেউ (যেমন: স্বামীর বাবা-মা, আপনার বাবা-মা বা কোনো দ্বীনদার আত্মীয়) মাধ্যমে কথা বলাতে পারেন। আল্লাহ বলেন:
وَ اِنۡ خِفۡتُمۡ شِقَاقَ بَیۡنِهِمَا فَابۡعَثُوۡا حَکَمًا مِّنۡ اَهۡلِهٖ وَحَکَمًا مِّنۡ اَهۡلِهَا ۚ اِنۡ یُّرِیۡدَاۤ اِصۡلَاحًا یُّوَفِّقِ اللّٰهُ بَیۡنَهُمَا
"যদি তোমরা তাদের (স্বামী-স্ত্রীর) মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন ও স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন মধ্যস্থতাকারী পাঠাও। তারা যদি সমঝোতা চায়, আল্লাহ তাদের মধ্যে মিলন ঘটাবেন।" — সূরা নিসা: ৩৫
ধাপ ৪: নিজের আত্মসম্মান ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা
- নিজের ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত ও যিকির বাড়ান — এতে অন্তরে শান্তি আসবে। আল্লাহ বলেন: "জিকির দ্বারা অন্তর প্রশান্ত হয়" (সূরা রাদ: ২৮)।
- নিজের শখ, পড়াশোনা বা হালাল কাজে মনোযোগ দিন — নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভাববেন না।
- প্রয়োজনে একজন দ্বীনদার, বিজ্ঞ আলেমের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।
ধাপ ৫: ধৈর্যের প্রতিদান
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ... إِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
"মুমিনের ব্যাপার আশ্চর্যজনক! তার সব কাজই কল্যাণকর... যদি তাকে কষ্ট দেওয়া হয় আর সে ধৈর্য ধরে, তবে তাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।" — সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯
৪. একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
- তালাকের কথা মুখে আনবেন না — রাগের মুহূর্তে তালাকের কথা বললে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী তা কার্যকর হয়ে যেতে পারে। এ ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকুন। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুত তালাক)
- স্বামীকে গালি দেওয়া, অপমান করা বা তার বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো থেকে বিরত থাকুন — এতে সম্পর্ক আরও খারাপ হবে এবং গুনাহ হবে।
- সবর করুন এবং আল্লাহর কাছে দুআ করুন — আল্লাহর কাছে দুআর চেয়ে বড় কোনো সমাধান নেই।
৫. উপসংহার
প্রিয় বোন, আপনার কষ্ট সত্যিই বেদনাদায়ক। কিন্তু মনে রাখবেন—আল্লাহ আপনাকে দেখছেন, শুনছেন এবং জানেন। আপনার প্রতিটি অশ্রু, প্রতিটি কষ্ট আল্লাহর কাছে গণনা হচ্ছে। ধৈর্য ধারণ করুন, দুআ করুন, শান্তভাবে স্বামীর সাথে কথা বলুন, প্রয়োজনে মধ্যস্থতাকারীর সাহায্য নিন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الصّٰبِرِیۡنَ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" — সূরা বাকারা: ১৫৩
আল্লাহ আপনার অন্তরকে শান্তি দিন, আপনার স্বামীকে হেদায়েত দিন এবং আপনার সংসারে ভালোবাসা ও বরকত দান করুন। আমিন।