মিডওয়াইফের চাকরির কারণে ফরজ ইবাদত ঠিকভাবে আদায় করা সম্ভব না হলে চাকরি করা কি জায়েজ হবে?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্নের সারমর্ম: এক মিডওয়াইফ বেসরকারি ক্লিনিকে চাকরি করেন। তিনি ফরজ রোজা ছাড়া অন্যান্য ইবাদত ঠিকভাবে পালন করতে পারেন না। বাবা জীবিত ও তিনিই সংসার চালান। পরিবার চায় সেবামূলক পেশা ও ভালো বিয়ের জন্য চাকরি চালিয়ে যাক। এমতাবস্থায় চাকরি ছাড়ার পরামর্শ কী?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: চাকরি ছাড়া ফরজ নয়; বরং ফরজ ইবাদত (বিশেষত রোজা) ঠিকভাবে আদায় করা ফরজ। তাই সমাধান হলো—চাকরি ছাড়ার আগে চাকরির শর্ত/সময় এমনভাবে সমন্বয় করা, যাতে রোজা ও নামাজ ঠিকভাবে আদায় করা যায়। যদি ক্লিনিকের ব্যবস্থাপনা একেবারেই সমন্বয় করতে না দেয় এবং রোজা রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে দ্বীনের হেফাজতকে অগ্রাধিকার দিয়ে এমন চাকরি/পেশা খোঁজা উত্তম, যেখানে ইবাদত পালনে বাধা না হয়। তবে বাবার সংসার চালানোর দায়িত্ব থাকায় এবং পরিবারের সম্মতি ছাড়া হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়; বরং কষ্টকরে ফরয ইবাদত পালন পূর্বক পরিবারের সঙ্গে পরামর্শ করে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বিস্তারিত:
১) ফরজ বিধান ছেড়ে দেওয়া -চায় আংশকিই হোক না কেন- জায়েজ নয়।
২) চাকরি করা মূলত জায়েজ; বরং হালাল উপার্জন ও সেবামূলক পেশা (মিডওয়াইফরি) প্রশংসনীয়। তবে চাকরি ফরজ ইবাদতের প্রতিবন্ধক হতে পারে না। ইসলামে "লা দারারা ওয়া লা দিরারা" (ক্ষতি করা যাবে না, ক্ষতিগ্রস্তও হওয়া যাবে না) নীতি প্রসিদ্ধ। ফরজ ইবাদত পরিত্যাগ (ترك) করা দ্বীনি ক্ষতি; আর চাকরি ছাড়া দুনিয়াবি ক্ষতি। দ্বীনি ক্ষতি দুনিয়াবি ক্ষতির চেয়ে গুরুতর। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ ফরজ ও ওয়াজিবের গুরুত্ব ও পরিত্যাগের ভয়াবহতা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
৩) প্রথম সমাধান: চাকরির শর্ত/সময় সমন্বয় করা। অনেক ক্ষেত্রে রমজানে ছুটি, শিফট পরিবর্তন, রাতের শিফট, বা কম সময়ের চাকরি নিয়ে ফরজ ইবাদত ঠিকভাবে আদায় করা সম্ভব হয়। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ইসলামি বিধান মেনে ইবাদতের সুযোগ চাওয়া উচিত। এতে চাকরি ও ইবাদত উভয়ই সম্ভব হতে পারে। ফকিহগণ বলেছেন, হারাম বা ফরজ পরিত্যাগের কারণ না হলে সাধারণত চাকরি ছাড়া ওয়াজিব নয়; বরং সমন্বয় করা কর্তব্য।
৪) যদি সমন্বয় একেবারেই সম্ভব না হয়: তখন দ্বীনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। হাদিসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো কিছু ছাড়ে, আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করেন।" (মুসনাদ আহমাদ: ২৩১২৩ — অর্থানুসারে)
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন যা সে কল্পনাও করেনি।" (সূরা তালাক: ২-৩)
তাই ইসলামের ফরজ বিধান ঠিকভাবে আদায়ের জন্য যদি চাকরি পরিবর্তন করতে হয়, তবে তা দ্বীনের হেফাজতের জন্য বৈধ ও কল্যাণকর। তবে হঠাৎ বেকার হয়ে পড়া নয়; বরং আগে বিকল্প চাকরি/পেশা খুঁজে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
৫) পারিবারিক দিক: বাবা জীবিত ও তিনিই সংসার চালান—এটি একটি সুবিধা। আপনার উপার্জন বর্তমানে সংসারের একমাত্র অবলম্বন নয়। তাই পরিবারকে বুঝিয়ে বলা উচিত যে ফরজ ইবাদত পরিত্যাগ করা গুনাহ, এবং দ্বীনের হেফাজতই প্রকৃত কল্যাণ। ভালো বিয়ের জন্য সেবামূলক পেশা সহায়ক হতে পারে, কিন্তু ফরজ ইবাদত পরিত্যাগ করা বিয়ের বরকত নষ্ট করে। নেককার জীবনই উত্তম জীবনসঙ্গী পাওয়ার বড় মাধ্যম। ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ পারিবারিক ও পেশাগত জীবনে দ্বীনি অগ্রাধিকারের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
৬) সতর্কতা: চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে—
- পরিবারের সঙ্গে পরামর্শ করুন;
- ক্লিনিকে ইবাদতের সুযোগ চাওয়ার চেষ্টা করুন;
- বিকল্প হালাল পেশা/চাকরির ব্যবস্থা করে নিন;
- প্রয়োজনে স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতি/আলেমের সঙ্গে সরাসরি পরামর্শ করুন।
উপসংহার: ফরজ ইবাদত পরিত্যাগ করা কোনো অবস্থাতেই জায়েজ নয়। তাই চাকরি ছাড়া ফরজ নয়; বরং চাকরির ব্যবস্থা এমনভাবে করা ফরজ, যাতে রোজা ও নামাজ ঠিকভাবে আদায় করা যায়। সমন্বয় সম্ভব হলে চাকরি চালিয়ে যান; সম্ভব না হলে দ্বীনের হেফাজতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিকল্প হালাল পেশা গ্রহণ করুন—তবে পরিবারের সঙ্গে পরামর্শ ও বিকল্প ব্যবস্থা করে। আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য কল্যাণময় পথ সহজ করুন। আমিন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।