কিভাবে মানুষকে আল্লাহর জন্য মোহাব্বত করতে হয়।

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 7960
Questioner: Mohammed Mahtab Hossain
Question Asked: 04 Nov 2026, 10:30 PM
Reviewed & Published: 05 Nov 2026, 02:31 AM
Views: 11
Tokens: 3,922
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আস-সালামু আলাইকুম। আমি ছেলে, কোনো ভাইকে আল্লাহর জন্য মোহাব্বত করলে কিভাবে করতে হয়? যাকে মোহাব্বত করা হয় সে খারাপ কিছু করলে খুব কষ্ট হয়। এটা মনেহয় নরমাল কারণ রাসূল সাহাবি, ওনারাও কষ্ট পেতেন। কিভাবে কোনো ভাইকে আল্লাহর জন্য মোহাব্বত করতে হয়, আলেমকে করতে হয় কিভাবে?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় ভাই, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসলামের মৌলিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসা (মুহাব্বাত ফিল্লাহ) ঈমানের অন্যতম শর্ত ও সুন্নাহ। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দিচ্ছি।


১. আল্লাহর জন্য ভালোবাসার মর্যাদা ও ভিত্তি

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَالْمُؤْمِنُونَ أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّهِ "আর মুমিনগণ আল্লাহর প্রতি অত্যন্ত দৃঢ় ভালোবাসা রাখে।" (সূরা বাকারা: ১৬৫)

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ "তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।" (সহীহ বুখারী: ১৫)

আল্লাহর জন্য ভালোবাসার বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে কুদসিতে এসেছে:

وَجَبَتْ مَحَبَّتِي لِلْمُتَحَابِّينَ فِيَّ، وَالْمُتَجَالِسِينَ فِيَّ، وَالْمُتَزَاوِرِينَ فِيَّ، وَالْمُتَبَاذِلِينَ فِيَّ "যারা আমার জন্য পরস্পরকে ভালোবাসে, আমার জন্য একত্রে বসে, আমার জন্য একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং আমার জন্য একে অপরের জন্য ব্যয় করে—তাদের প্রতি আমার ভালোবাসা অবধারিত হয়ে গেছে।" (মুয়াত্তা মালিক, হাদিস: ১৭১০; মুসনাদ আহমাদ: ৮৮৫৫)


২. আল্লাহর জন্য ভালোবাসার সঠিক পদ্ধতি

(ক) নিয়ত পরিশুদ্ধ করা

ভালোবাসার উদ্দেশ্য হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি—ব্যক্তিগত স্বার্থ, দুনিয়াবি লাভ বা আবেগ নয়। ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, সমস্ত আমলের মূল্য নিয়তের উপর নির্ভরশীল; নিয়ত আল্লাহর জন্য হলে তা ইবাদত, নইলে তা নিছক অভ্যাস।

(খ) দ্বীনদারির ভিত্তিতে ভালোবাসা

রাসূল ﷺ বলেন:

الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ "মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর থাকে; অতএব তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ্য করে সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৩৩; তিরমিজি: ২৩৭৮)

অতএব, আল্লাহর জন্য ভালোবাসা হবে দ্বীনদার, নেককার ও আল্লাহভীরু ব্যক্তিদের সাথে। আলেমদের সাথে ভালোবাসা বিশেষভাবে কাঙ্ক্ষিত, কারণ তারা নবী ﷺ-এর ওয়ারিস। রাসূল ﷺ বলেন:

الْعُلَمَاءُ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ "আলেমগণ নবীদের ওয়ারিস।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৪১; তিরমিজি: ২৬৮২)

(গ) ভালোবাসার প্রকাশ ও সীমা

  • ভালোবাসা প্রকাশ করা: রাসূল ﷺ বলেন: "যখন কোনো ব্যক্তি তার ভাইকে ভালোবাসে, সে যেন তাকে জানিয়ে দেয়।" (সুনানে আবু দাউদ: ৫১২১; তিরমিজি: ২৩৯২)
  • সীমা রক্ষা করা: ভালোবাসা যেন আল্লাহর সীমা অতিক্রম না করে। ইমাম তাহাবি (রহ.) আল-আকিদাতুত তাহাবিয়্যাহ-তে বলেছেন, ভালোবাসা ও ঘৃণা উভয়ই আল্লাহর জন্য হওয়া চাই; ব্যক্তিপূজা বা অতিরঞ্জন ইসলামে নিষিদ্ধ।
  • সহানুভূতি ও ক্ষমা: ভাই ভুল করলে কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু ইসলাম শিক্ষা দেয় ক্ষমা ও নসীহত। আল্লাহ বলেন: وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا "তারা যেন ক্ষমা করে ও উপেক্ষা করে।" (সূরা নূর: ২২)

(ঘ) ভাই ভুল করলে কী করবেন?

আপনি বলেছেন—ভাই খারাপ কিছু করলে কষ্ট হয়। এটি স্বাভাবিক; সাহাবিগণও কষ্ট পেতেন। কিন্তু কষ্টের প্রতিক্রিয়া হবে নরম ভাষায় নসীহত, দোয়া ও ধৈর্য। আল্লাহ বলেন:

وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ۚ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ "মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী—তারা একে অপরের বন্ধু; তারা সৎকাজের আদেশ দেয় ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে।" (সূরা তাওবা: ৭১)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নীতি ছিল: আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার নরমভাবে, প্রজ্ঞার সাথে। ফাতাওয়া আলমগিরি ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে যে, নসীহত প্রকাশ্যে অপমান করে নয়, বরং গোপনে ও সহানুভূতির সাথে করতে হবে।

(ঙ) আলেমকে ভালোবাসার পদ্ধতি

  • তাদের ইলম ও তাকওয়ার কারণে সম্মান করা।
  • তাদের কাছে দ্বীন শেখা ও পরামর্শ নেওয়া।
  • তাদের জন্য দোয়া করা ও তাদের খেদমত করা।
  • তাদের ভুল হলে গোপনে নরমভাবে নসীহত করা—কটুক্তি বা অপমান নয়। ইমাম শাফি (রহ.)-এর বিখ্যাত উক্তি: "আমি আমার ভাইয়ের ভুল ধরিয়ে দিই, কিন্তু তাকে দোষারোপ করি না।"

৩. ব্যবহারিক করণীয় (সারসংক্ষেপ)

| বিষয় | করণীয় | |------|--------| | নিয়ত | একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসা | | বন্ধু নির্বাচন | দ্বীনদার, নেককার, আল্লাহভীরু | | প্রকাশ | ভালোবাসা জানিয়ে দেওয়া, সালাম-মুসাফাহা | | ভুল হলে | গোপনে নরম নসীহত, দোয়া, ক্ষমা | | আলেমদের সাথে | সম্মান, ইলম অর্জন, খেদমত, দোয়া | | সীমা | আল্লাহর সীমা অতিক্রম না করা, ব্যক্তিপূজা নয় |


৪. উপসংহার

আল্লাহর জন্য ভালোবাসা মানে—ব্যক্তিকে আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে ভালোবাসা, তার দ্বীনদারির কারণে সম্মান করা, তার ভুলে নরমভাবে নসীহত করা এবং তার হেদায়েতের জন্য দোয়া করা। কষ্ট পাওয়া দুর্বলতা নয়; বরং তা ঈমানের নিদর্শন—যেমন সাহাবিগণ কষ্ট পেতেন। কিন্তু কষ্ট যেন ঘৃণা বা সম্পর্কচ্ছেদে পরিণত না হয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর জন্য খাঁটি ভালোবাসা দান করুন। আমিন।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.