হায়েজ ও নেফাসগ্রস্ত নারীর আযানের জবাব দেওয়ার বিধান কী?
Faith and Belief · Hanafi
Question
এখানে হায়েজ/নেফাসগ্রস্ত নারীকে কি আযানের জবাব দিতে নিষেধ করা হয়েছে নাকি এটা তার জন্য সুন্নাত না,এটা বোঝানো হয়েছে?
Answer
আযানের জবাব সম্পর্কে হায়েজ/নেফাসগ্রস্ত নারীর বিধান
প্রশ্নের সারমর্ম
প্রশ্নটি হলো—হায়েজ/নেফাসগ্রস্ত নারীকে আযানের জবাব দিতে নিষেধ করা হয়েছে, নাকি এটা বোঝানো হয়েছে যে তার জন্য জবাব দেওয়া সুন্নাত নয়?
উত্তর
মূল হাদিস ও ফিকহি ভিত্তি
আযানের জবাব দেওয়ার বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
«إِذَا سَمِعْتُمُ الْأَذَانَ فَقُولُوا مِثْلَ مَا يَقُولُ الْمُؤَذِّنُ»
"যখন তোমরা আযান শুনবে, তখন মুয়াযযিন যা বলে তোমরাও তা বলো।" — সহিহ বুখারি: ৬১১; সহিহ মুসলিম: ৩৮৪
এই হুকুম সাধারণভাবে সব শ্রোতার জন্য প্রযোজ্য। তবে ফুকাহায়ে কেরাম এখানে কিছু ব্যতিক্রম উল্লেখ করেছেন।
হায়েজ/নেফাসগ্রস্ত নারীর ক্ষেত্রে হানাফি মাযহাবের অবস্থান
হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত হলো: হায়েজ/নেফাসগ্রস্ত নারীর জন্য আযানের জবাব দেওয়া সুন্নাত নয় (অর্থাৎ জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকাই তার জন্য করণীয়)। এটি নিষেধাজ্ঞা (হারাম/মাকরুহ) নয়, বরং সুন্নাত না হওয়ার বিষয়।
দলিল:
১. ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত: হায়েজ অবস্থায় নারী যিকর-আযকার ও দুআ করতে পারেন, কিন্তু আযানের জবাব দেওয়া—যা নামাজের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি ইবাদত—তার জন্য সুন্নাত হিসেবে গণ্য নয়। কারণ হায়েজ অবস্থায় নারী নামাজ থেকে বিরত থাকেন, আর আযানের জবাব মূলত নামাজের প্রস্তুতির অংশ।
২. আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:
وَالْحَائِضُ لَا تُجِيبُ الْأَذَانَ وَلَا الْإِقَامَةَ
"হায়েজগ্রস্ত নারী আযান ও ইকামতের জবাব দেবে না।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৩৯৭ (দারুল ফিকর সংস্করণ)
৩. আল্লামা হাসকাফি (রহ.) «আদ-দুররুল মুখতার»-এ বলেন:
وَلَا تُجِيبُ الْحَائِضُ الْأَذَانَ
"হায়েজগ্রস্ত নারী আযানের জবাব দেবে না।" — আদ-দুররুল মুখতার, খণ্ড ১, পৃ. ৩৯৭
৪. ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে:
الْحَائِضُ وَالنُّفَسَاءُ لَا تُجِيبَانِ الْأَذَانَ
"হায়েজ ও নেফাসগ্রস্ত নারী আযানের জবাব দেবে না।" — ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৫৮
কেন এই বিধান?
হানাফি ফুকাহায়ে কেরামের ব্যাখ্যা হলো:
- আযানের জবাব দেওয়া মূলত নামাজের প্রস্তুতিমূলক ইবাদত। হায়েজ/নেফাস অবস্থায় নারী নামাজ আদায় করতে পারেন না, তাই এই ইবাদতও তার জন্য সুন্নাত হিসেবে নির্ধারিত নয়।
- এটি নিষেধাজ্ঞা বা হারাম নয়—বরং সুন্নাত না হওয়া। অর্থাৎ যদি কোনো হায়েজগ্রস্ত নারী জবাব দেন, তাহলে তিনি গুনাহগার হবেন না, তবে সুন্নাতের সওয়াব পাবেন না।
- এটি অন্যান্য ইবাদতের মতোই—যেমন হায়েজ অবস্থায় নারী নামাজ পড়েন না, রোজা রাখেন না, কিন্তু দুআ-যিকর করতে পারেন।
ইমাম মুহাম্মদ শায়বানি (রহ.)-এর বক্তব্য
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান শায়বানি (রহ.) «আল-আসল»-এ উল্লেখ করেন যে, হায়েজগ্রস্ত নারী আযানের জবাব দেবেন না, কারণ এটি নামাজের সাথে সংশ্লিষ্ট। তবে তিনি দুআ ও যিকর করতে পারেন।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর ফতোয়া
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে উল্লেখ করেন:
"হায়েজ ও নেফাসগ্রস্ত নারীর জন্য আযানের জবাব দেওয়া সুন্নাত নয়। তবে যদি কেউ জবাব দেন, তাহলে তা নিষিদ্ধ বা গুনাহের কাজ হবে না।" — ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ২৮৭
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর বক্তব্য
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «ইমদাদুল ফাতাওয়া»-তে উল্লেখ করেন:
"হায়েজগ্রস্ত নারী আযানের জবাব দেবেন না—এটি সুন্নাত নয়। কিন্তু এটি নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং নামাজের সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ার কারণে তার জন্য এই সুন্নাতটি রহিত।" — ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃ. ১৪৫
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|--------| | হায়েজ/নেফাসগ্রস্ত নারীর আযানের জবাব দেওয়া | সুন্নাত নয় | | জবাব দেওয়া কি নিষিদ্ধ/হারাম? | না | | জবাব দিলে গুনাহ হবে? | না | | জবাব দিলে সুন্নাতের সওয়াব পাবেন? | না | | দুআ-যিকর করতে পারবেন? | হ্যাঁ |
সিদ্ধান্ত: হাদিসে বর্ণিত "সব শ্রোতার জবাব দেওয়া" সাধারণ হুকুম, তবে হানাফি মাযহাবের ফুকাহায়ে কেরাম হায়েজ/নেফাসগ্রস্ত নারীকে এই সুন্নাত থেকে ব্যতিক্রম করেছেন। এটি নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং সুন্নাত না হওয়া—অর্থাৎ তার জন্য জবাব দেওয়া সুন্নাত হিসেবে গণ্য নয়। যদি তিনি জবাব দেন, তাহলে গুনাহ হবে না, কিন্তু সুন্নাতের সওয়াব পাবেন না। এটি নামাজের সাথে সংশ্লিষ্ট ইবাদত হওয়ার কারণেই এই বিধান।
আল্লাহ ভালো জানেন।