শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির ইসলামী উপায়, ঈমান ও বিবাহিত জীবনে টেনশন দূর করার দুআ ও আমল সম্পর্কে জানতে চাই?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 7936
Questioner: rida
Question Asked: 04 Nov 2026, 04:38 PM
Reviewed & Published: 04 Nov 2026, 06:18 PM
Views: 16
Tokens: 5,207
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আপনারা আমাকে এখান থেকে উত্তর দিয়েছেন আমার ঈমান বিবাহিত জীবন ঠিক আছে। তাও আমাকে শয়তান বার বার টেনশন দেয়। আসলেই ঠিক আছে তো। আর ঈমানের সাথে যেহেতু বিয়ে রিলেটেড, পরে আমার বিবাহিত জীবন নিয়েও টেনশন বেড়ে যায়। হাসবেন্ড এর কাছে যাই না। ঝামেলা হয়। এখন আমি শয়তান এর সাথে কিভাবে লড়বো? কিভাবে মন কে বুঝাবো যে সব ঠিক আছে?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। শয়তানের ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা) থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফিকহের আলোকে নিম্নোক্ত নির্দেশনাগুলো পেশ করছি।

১. শয়তানের ওয়াসওয়াসা কী এবং কেন হয়?

আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন:

وَقُل رَّبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ "বলুন, হে আমার রব! আমি আপনার আশ্রয় চাই শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে।" (সূরা মুমিনুন: ৯৭)

শয়তানের কাজ হলো—সন্দেহ সৃষ্টি করা, ভয় দেখানো, অহেতুক চিন্তা দিয়ে মানুষকে অস্থির করা। বিশেষত ইবাদত, ঈমান ও পারিবারিক জীবনে সে বেশি কুমন্ত্রণা দেয়। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْتِي أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ: مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ حَتَّى يَقُولَ: مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ؟ "শয়তান তোমাদের কাছে এসে বলে—এটা কে সৃষ্টি করেছে? ওটা কে সৃষ্টি করেছে? এমনকি সে বলে—তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে?" (সহীহ বুখারী: ৩২৭৬, সহীহ মুসলিম: ১৩৪)

অর্থাৎ শয়তানের কুমন্ত্রণা ঈমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়; বরং এটি ঈমানের শক্তিরই লক্ষণ, কারণ সে ঈমানদারকেই বেশি টার্গেট করে। হাদীসে এসেছে, সাহাবীরা বললেন—"আমাদের অন্তরে এমন কিছু চিন্তা আসে যা আমরা মুখে বলতে চাই না, আকাশ থেকে পড়া আমাদের কাছে বেশি পছন্দনীয়।" রাসূল ﷺ বললেন:

ذَاكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ "এটাই খাঁটি ঈমানের প্রমাণ।" (সহীহ মুসলিম: ১৩২)

সুতরাং আপনার এই টেনশন ও ভয়—যে "আমার ঈমান বা বিবাহিত জীবন ঠিক আছে কি না"—এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা, এবং এটি আপনার ঈমানের দুর্বলতা নয়।

২. শয়তানের সাথে লড়াইয়ের পদ্ধতি

(ক) ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়া

হানাফী ফিকহের মূলনীতি হলো—ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ-কুমন্ত্রণা) শরীয়তের দলীল নয়। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ লিখেছেন:

الْوَسْوَاسُ لَا يُعْتَبَرُ فِي الْأَحْكَامِ "ওয়াসওয়াসা আহকামে বিবেচিত হয় না।" (রাদ্দুল মুহতার: ১/১৩৭)

অর্থাৎ শয়তান যা বলে, তা বিশ্বাস করা যাবে না; বরং তা উপেক্ষা করতে হবে। আপনি যত বেশি তার কথা ভাববেন, সে তত বেশি শক্তি পাবে। তাই প্রতিবার টেনশন এলে মনে মনে বলুন—"এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা, আমি আল্লাহর উপর ভরসা করছি" এবং চিন্তাটি সরিয়ে ফেলুন।

(খ) আউযুবিল্লাহ ও যিকিরের মাধ্যমে শয়তানকে বিতাড়িত করা

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ ۖ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ "যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা তোমাকে স্পর্শ করে, তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" (সূরা আরাফ: ২০০)

টেনশন এলে "أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ" পড়ুন এবং আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়ুন। হাদীসে এসেছে, রাসূল ﷺ বলেছেন:

إِذَا أَتَاكَ الشَّيْطَانُ فَقُلْ: أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْهُ "যখন শয়তান তোমার কাছে আসে, তখন বলো—আমি তার থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই।" (সুনানে আবু দাউদ: ৫০৬)

(গ) নামাজ ও দুআর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া

আপনি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করুন এবং বিশেষভাবে এই দুআটি পড়ুন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ "হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণের বোঝা ও মানুষের প্রভাব থেকে।" (সহীহ বুখারী: ২৮৯৩)

(ঘ) স্বামীর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা

আপনি লিখেছেন—"হাসবেন্ডের কাছে যাই না, ঝামেলা হয়।" ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা নিসা: ১৯)

রাসূল ﷺ বলেছেন:

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।" (সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫)

আপনার উচিত—শয়তানের কুমন্ত্রণাকে পাশ কাটিয়ে স্বামীর সাথে শান্তভাবে কথা বলা, তার কাছে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা, এবং তার সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করা। শয়তান চায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হোক। তাই তার কুমন্ত্রণায় পা দিয়ে দূরত্ব বাড়াবেন না; বরং সালাম-কল্যাণ, ভালোবাসা ও ধৈর্যের মাধ্যমে সম্পর্ক মজবুত করুন।

(ঙ) নিজের মনকে বোঝানোর পদ্ধতি

নিজেকে বোঝানোর জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মনে রাখুন:

  1. আপনার ঈমান ঠিক আছে—কারণ আপনি টেনশন করছেন, উদাসীন নন। উদাসীন ব্যক্তিকে শয়তান টেনশন দেয় না।
  2. আপনার বিবাহিত জীবন ঠিক আছে—কারণ আপনি এর উন্নতির জন্য চিন্তা করছেন। চিন্তা করা মানে সমস্যা নয়; বরং সমাধানের পথ খোঁজা।
  3. শয়তানের কথা বিশ্বাস করবেন না—সে মিথ্যাবাদী। আল্লাহ তাআলা তাকে "خَادِلًا" (প্রতারক) বলেছেন (সূরা নিসা: ১৪২)।
  4. আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন—আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: "وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ"—"যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।" (সূরা তালাক: ৩)

(চ) ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য বিশেষ আমল

  • প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা আয়াতুল কুরসি পড়ুন।
  • ঘরে সূরা বাকারা তিলাওয়াত করুন (হাদীসে এসেছে, যে ঘরে সূরা বাকারা পড়া হয়, শয়তান সে ঘর থেকে পালিয়ে যায়—সহীহ মুসলিম: ৭৮০)।
  • নিয়মিত ইস্তিগফার ও দরুদ শরীফ পড়ুন।
  • সম্ভব হলে কোনো বিশ্বস্ত আলেমা বা বুযুর্গের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।

৩. হানাফী ফিকহের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ নোট

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ এবং মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) মাআরিফুল কুরআন-এ উল্লেখ করেছেন—ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের প্রক্ষেপণ, যা মানুষের অন্তরে সন্দেহ সৃষ্টি করে। এর চিকিৎসা হলো—তা উপেক্ষা করা, আল্লাহর যিকির করা এবং শরীয়তের দলীলের উপর ভরসা করা। শরীয়তের বিধান কখনো ওয়াসওয়াসার ভিত্তিতে পরিবর্তিত হয় না। (রাদ্দুল মুহতার: ১/১৩৭; মাআরিফুল কুরআন, সূরা নাসের তাফসীর)

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বেহেশতী যেওর-এ লিখেছেন—ওয়াসওয়াসা দূর করার সর্বোত্তম উপায় হলো তা ভ্রুক্ষেপ না করা এবং আল্লাহর যিকিরে লিপ্ত থাকা। (বেহেশতী যেওর, ১ম খণ্ড)

উপসংহার

প্রিয় বোন, আপনার ঈমান ও বিবাহিত জীবন—উভয়ই ইনশাআল্লাহ ঠিক আছে। শয়তান আপনাকে অহেতুক টেনশন দিচ্ছে। আপনি আউযুবিল্লাহ পড়ুন, যিকির করুন, নামাজ পড়ুন, স্বামীর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখুন এবং ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দিন। আল্লাহ তাআলা আপনার অন্তরকে প্রশান্তি দান করুন এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.