বাথরুমে মাথা ঢেকে রাখার কারণে অজুর মাসেহ বিলম্বিত হলে অজু হবে কি?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 7927
Questioner: Sultana_34
Question Asked: 04 Nov 2026, 02:00 PM
Reviewed & Published: 04 Nov 2026, 07:04 PM
Views: 10
Tokens: 5,465
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১. বাথরুমে মাথা ঢেকে রাখি তাই সেখানে মাথা খুলিনা৷ তো মাথা মাসেহ বাদে সবগুলো অজুর ফরজ করার পরে বাথরুম থেকে বের হয়ে পরে 'গুফরানাক..' দুয়াটা পড়ে এরপর মাথা মাসেহ করলে কি অজু হবে?
২. আবার আমার বাবা বাহ্যিকভাবে একজন কাফির। ইসলামকে মানুষের বানানো মনে করেন, কটূক্তি করেন বিভিন্ন নিয়ম নিয়ে। তার প্রতি সদাচরণ করতে হবে এটা তো জানি৷ কিন্তু তার প্রতি ঘৃণা রাখব কীভাবে? যদি তিনি না জেনে এসব করে থাকেন? আমার তো তার প্রতি ঘৃণা আসেনা, তার জন্য মায়া লাগে কষ্ট লাগে। একইসাথে ঘৃণা করব আবার ভালোবাসব?

Answer

উত্তর

প্রথম প্রশ্ন: অজুর ধারাবাহিকতা।

** উত্তর:** এভাবে অজু হবে। তবে এটি সুন্নাতের খেলাফ।

আপনি অযুর অঙ্গ ধোয়ার ক্ষেত্রে মাথা মাসাহ এর সময়েই মাথা মাসাহ করবেন,মাথা খুলে মাসাহ করে পুনরায় মাথা ঢাকবেন,বাথরুম থেকে বের হয়ে দোয়া পাঠ করবেন।

অজুর ফরজ চারটি:

  1. সমস্ত মুখ ধোয়া,
  2. দুই হাত কনুইসহ ধোয়া,
  3. মাথার এক-চতুর্থাংশ মসেহ করা,
  4. দুই পা টাখনুসহ ধোয়া।

(আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩-৪; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৯৫)

হানাফি মাযহাব মতে অজুর মধ্যে তারতিব (ধারাবাহিকতা রক্ষা করা) সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।


দ্বিতীয় প্রশ্ন: কাফির পিতার প্রতি সদাচরণ ও ঘৃণার ভারসাম্য

সংক্ষিপ্ত উত্তর: আপনার অনুভূতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও ইসলামসম্মত। পিতার কুফরি ও ইসলামের প্রতি অবমাননার বিষয়টি ঘৃণা করা হবে, কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে পিতাকে ঘৃণা করা বা তার প্রতি সদাচরণ বর্জন করা যাবে না। এটাই ইসলামের নির্দেশ।

কুরআনের দলিল:

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا ۖ وَإِن جَاهَدَاكَ لِتُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا ۚ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ

"আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তবে তারা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরিক করতে বাধ্য করে, যার জ্ঞান তোমার নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না।" (সূরা আনকাবুত: ৮)

وَإِن جَاهَدَاكَ عَلَىٰ أَن تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا ۖ وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا

"তবে যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শরিক করতে বাধ্য করে, তবে তাদের আনুগত্য করো না; কিন্তু দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস করো।" (সূরা লুকমান: ১৫)

এই আয়াত দুটি স্পষ্ট করে দেয়: আকিদা ও দ্বীনের বিষয়ে তাদের আনুগত্য করা যাবে না, কিন্তু দুনিয়াবী সম্পর্ক ও সদাচরণে কোনো ছাড় নেই।

হাদিসের দলিল:

আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

قَدِمَتْ عَلَيَّ أُمِّي وَهِيَ مُشْرِكَةٌ فِي عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَاسْتَفْتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قُلْتُ: إِنَّ أُمِّي قَدِمَتْ وَهِيَ رَاغِبَةٌ، أَفَأَصِلُهَا؟ قَالَ: نَعَمْ، صِلِي أُمَّكِ

"রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে আমার মা মুশরিক অবস্থায় আমার কাছে এলেন। আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম: আমার মা এসেছেন, তিনি (ইসলাম গ্রহণে) আগ্রহী নন — আমি কি তার সাথে সদাচরণ করব? তিনি বললেন: হ্যাঁ, তোমার মায়ের সাথে সদাচরণ করো।" (সহিহ বুখারি: ২৬২০; সহিহ মুসলিম: ১০০৩)

হানাফি ফিকহের ব্যাখ্যা:

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতারে লিখেন — কাফির পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ, তাদের খোঁজখবর নেওয়া, উপহার দেওয়া জায়েয; বরং কর্তব্য, যদি তাতে দ্বীনের ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯৭-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মাআরিফুল কুরআনে সূরা লুকমানের ১৫ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: "দুনিয়ার সম্পর্কে সদাচরণের নির্দেশ — অর্থাৎ তাদের সাথে সদ্ব্যবহার, সেবা-যত্ন, উপকার করা; কিন্তু দ্বীনের বিষয়ে তাদের অনুসরণ করা যাবে না।" (মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড ৬)

ঘৃণা ও ভালোবাসার ভারসাম্য — কীভাবে বুঝবেন:

  1. ঘৃণা হবে কুফরি ও ইসলামের অবমাননার প্রতি, ব্যক্তির প্রতি নয়। আপনি তার কুফরি, ইসলাম নিয়ে কটূক্তি, দ্বীনের নিয়ম নিয়ে উপহাস — এসব কাজকে ঘৃণা করবেন। এটা ঈমানের দাবি। কিন্তু তার সত্তাকে ঘৃণা করা ইসলাম চায় না।

  2. সদাচরণ বন্ধ করবেন না। তার সাথে কথা বলা, খোঁজ নেওয়া, সেবা করা, উপহার দেওয়া — এসব চালিয়ে যাবেন। এতে আপনার দ্বীনের ক্ষতি নেই; বরং এটাই ইসলামের সৌন্দর্য, যা তাকে দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারে।

  3. "না জেনে করছে" — এতে দায়িত্ব হালকা হয় না, তবে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়। কুফরির বিধান সে না জেনে করলেও কাফির হিসেবেই গণ্য, তবে তার প্রতি আপনার মায়া-কষ্ট স্বাভাবিক। আপনি তার জন্য দুআ করুন — আল্লাহ তাকে হেদায়াত দিন। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজ চাচা আবু তালিবের জন্য হেদায়াতের দুআ করেছিলেন।

  4. ঘৃণা ও ভালোবাসা একসাথে রাখা সম্ভব — কারণ দুটি ভিন্ন জিনিসের প্রতি। কুফরিকে ঘৃণা করা আর পিতাকে ভালোবাসা — এ দুটিতে কোনো বৈপরীত্য নেই। সাহাবায়ে কেরামের অনেকের পিতা-মাতা মুশরিক ছিলেন; তারা তাদের সন্তানদের হত্যা করতে চেয়েছিল, তবুও সাহাবীরা পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করেছেন এবং কুফরিকে ঘৃণা করেছেন।

  5. আপনার অনুভূতি গুনাহ নয়। আপনার মনে ঘৃণা আসে না, বরং মায়া লাগে — এটা দোষের নয়; বরং এটি স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি। ইসলাম আপনার কাছে যা চায় তা হলো: আকিদায় তার কুফরিকে অস্বীকার করা, মুখে ইসলামের পক্ষে থাকা, এবং ব্যবহারে সদাচরণ করা। এটাই আপনি করছেন।

একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: তার সামনে ইসলামের নিয়ম-কানুন নিয়ে তর্কে জড়াবেন না, যা তাকে আরও কটূক্তিতে উৎসাহিত করতে পারে। বরং আপনার চরিত্র ও সদাচরণ দিয়েই ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:

ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ

"তোমার রবের পথে ডাকো হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।" (সূরা নাহল: ১২৫)

আল্লাহ তাআলা আপনার পিতাকে হেদায়াত দান করুন এবং আপনাকে সঠিক পথে রাখুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.