ওয়াসওয়াসা অবস্থায় স্ত্রীকে মনে কল্পনা করলে বা অস্পষ্টভাবে তালাকের শব্দ বললে তালাক পতিত হয় কি না?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7892
Questioner: Sk Muslim
Question Asked: 03 Nov 2026, 09:21 PM
Reviewed & Published: 03 Nov 2026, 10:59 PM
Views: 18
Tokens: 4,025
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুআলাইকুম , ওয়াসওয়াসা ব্যক্তি যদি নিছক মনে যদি স্ত্রী কে কাল্পনিক ভাবে উপস্থাপন করে অসাবধান বসত পরীক্ষাবসত সরীহ শব্দ বলে ফেলে তাহলে কী হবে?

যদি জিভের সাথে বাক্যের হারকত হয় কিন্তু শব্দ যদি একটু অস্পষ্ট ভাবে বের হয় তাহলে কী হবে !?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
শুধু মনে কল্পনা করা বা মনে মনে স্ত্রীকে উপস্থাপন করা দ্বারা তালাক পতিত হয় না। তালাক পতিত হয় যখন স্পষ্ট উচ্চারণে তালাকের শব্দ বলা হয়। আর যদি মুখে “তালাক” জাতীয় সরীহ (স্পষ্ট) শব্দ বের হয়, তবে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে—যদিও ওয়াসওয়াসার কারণে বা অসাবধানতাবশত বলা হয়। পক্ষান্তরে শব্দ যদি একেবারে অস্পষ্ট/অস্পষ্টভাবে বের হয় এবং শ্রবণকারী তা তালাকের শব্দ হিসেবে বুঝতে না পারে, তবে সে ক্ষেত্রে বিস্তারিত বিবেচনা রয়েছে; সাধারণভাবে নিশ্চিতভাবে তালাকের শব্দ বুঝা না গেলে তালাক পতিত হবে না। তবে এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে মুখে যা বলেছেন তা স্মরণ করে স্থানীয় মুফতি/দারুল ইফতাকে সরাসরি মাসআলা বলে ফতোয়া নেওয়া কর্তব্য।


বিস্তারিত আলোচনা

১) শুধু মনে মনে কল্পনা করা বা ওয়াসওয়াসা

তালাক একটি ইনশা (সৃষ্টিমূলক) কর্ম; তা মুখে বা লিখিতভাবে প্রকাশ পাওয়া প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا، مَا لَمْ تَتَكَلَّمْ بِهِ أَوْ تَعْمَلْ بِهِ»
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের ওয়াসওয়াসা/কল্পনাকে ক্ষমা করেছেন, যতক্ষণ না সে তা বলে বা তার উপর আমল করে।”
— সহীহ বুখারী, হাদিস ৫২৬৯; সহীহ মুসলিম, হাদিস ১২৭

ইমাম নববী রহ. এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, শুধু অন্তরের কথা দ্বারা তালাক পতিত হয় না। হানাফি ফিকহেও এটাই মূলনীতি।
রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ৩, কিতাবুত তালাক
  • আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক
  • ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুত তালাক

সুতরাং, শুধু “মনে স্ত্রীকে কাল্পনিকভাবে উপস্থাপন করা” বা ওয়াসওয়াসা মনে আসা—এসব দ্বারা তালাক হয় না।

২) সরীহ শব্দ (স্পষ্ট তালাকের শব্দ) বলে ফেলা

হানাফি মাজহাবে তালাকের শব্দ দুই প্রকার:

  1. সরীহ (স্পষ্ট) — যেমন: “তুমি তালাক”, “তালাক দিলাম”, “তুমি তালাকপ্রাপ্ত” ইত্যাদি।
  2. কিনায়া (ইঙ্গিতমূলক) — যেমন: “তুমি যাও”, “তোমার সাথে সম্পর্ক শেষ” ইত্যাদি; এতে নিয়ত বা অবস্থার প্রমাণ প্রয়োজন।

সরীহ শব্দ উচ্চারণ করলে—যদি তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়—তালাক পতিত হয়, যদিও রাগ, ওয়াসওয়াসা বা অসাবধানতাবশত বলা হয়। কারণ সরীহ শব্দে নিয়তের প্রয়োজন নেই; শব্দই প্রমাণ।
রেফারেন্স:

  • আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক: “فَإِنْ كَانَ صَرِيحًا لَا يَحْتَاجُ إِلَى النِّيَّةِ”
  • রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৩২-২৩৫
  • ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, কিতাবুত তালাক
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ২, কিতাবুত তালাক

তবে হ্যাঁ, যদি কেউ ঘুমন্ত অবস্থায়, পাগল অবস্থায়, বা বেহুঁশ অবস্থায় বলে, তবে তালাক হয় না। আর ওয়াসওয়াসা যদি এত প্রবল হয় যে নিজের ইচ্ছা-নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তবে তা ভিন্ন বিষয়; কিন্তু সাধারণভাবে ওয়াসওয়াসা নিজে থেকে তালাক পতিত করে না।

৩) শব্দ অস্পষ্টভাবে বের হলে

এখানে দুটি দিক:

  • যদি শ্রবণকারী বা নিজে নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারেন যে এটি “তালাক” শব্দই — যেমন মুখে “তালাক” বলেছেন, কিন্তু উচ্চারণে টান বা জিভের হারকতের কারণে একটু বিকৃত হয়েছে; তবে তালাক পতিত হবে।
  • যদি শব্দটি এতটাই অস্পষ্ট হয় যে তা “তালাক” শব্দ হিসেবে বোঝাই যায় না — যেমন শুধু “তা…ক” বা অস্পষ্ট গুনগুন শব্দ, যার দ্বারা তালাকের অর্থ হয় না; তবে সাধারণভাবে তালাক পতিত হবে না। কারণ তালাকের হুকুম শব্দের উপর নির্ভর করে, আর শব্দটি তালাক হিসেবে প্রমাণিত না হলে হুকুমও প্রমাণিত হয় না।

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৪০-২৪৫
  • ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুত তালাক, ফাসলুন ফিল-কিনায়াত
  • বাহিশতী জেওর, তালাক অধ্যায়
  • মাআরিফুল কুরআন, সূরা বাকারা আয়াত ২২৯-এর তাফসীর

৪) ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে বিশেষ নির্দেশনা

ওয়াসওয়াসা শয়তানের প্ররোচনা। এতে তালাকের শব্দ বারবার মনে আসা বা জিভ দিয়ে অস্পষ্ট কিছু বের হয়ে যাওয়া—এসব নিয়ে অতিরিক্ত ভয় পাওয়া উচিত নয়। তবে যদি স্পষ্টভাবে “তালাক” শব্দ মুখে এসে যায়, তাহলে তা লুকানো যাবে না; তখন স্থানীয় মুফতির কাছে গিয়ে বিস্তারিত বলতে হবে।
রাসূল ﷺ ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে বলেছেন, তা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে এবং তা উপেক্ষা করতে।
রেফারেন্স:

  • সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২০
  • ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, ওয়াসওয়াসা ও তালাক প্রসঙ্গ
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ২, ওয়াসওয়াসা অধ্যায়

ব্যবহারিক নির্দেশনা

  1. শুধু মনে কল্পনা বা ওয়াসওয়াসা—এতে তালাক হয় না।
  2. যদি স্পষ্ট “তালাক” শব্দ মুখে বলে থাকেন, তবে তালাক পতিত হয়েছে; এক্ষেত্রে ইদ্দত, রুজু’ বা নতুন বিবাহের বিধান জানতে স্থানীয় মুফতির শরণাপন্ন হোন।
  3. যদি শব্দ একেবারে অস্পষ্ট ছিল এবং তালাকের শব্দ হিসেবে বোঝা যায়নি, তবে সাধারণত তালাক হয়নি; তবে নিশ্চিত হতে সরাসরি ফতোয়া নিন।
  4. ওয়াসওয়াসা নিয়ে বারবার শপথ বা তালাকের কথা ভাববেন না; এতে সমস্যা বাড়ে। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আলিমের পরামর্শ নিন।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন এবং সঠিক ফতোয়া অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দিন। আমিন।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.