আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর ব্যাপারে কেমন আকীদা পোষণ করে?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা: সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর ব্যাপারে
ভূমিকা
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা হলো—সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) মি'য়ারে হক,সত্যের মাপকাঠি, সর্বোত্তম উম্মত, আদর্শস্থানীয়, ন্যায়বান ও নির্ভরযোগ্য। তাঁদের প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অংশ এবং তাঁদের অবমাননা বা বিদ্বেষ কুফর ও গোমরাহির লক্ষণ। কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমায়ে উম্মতের ভিত্তিতে এ আকীদা সুপ্রতিষ্ঠিত।
১. কুরআনুল কারীমের দলিল
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
"তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, যাদের মানবজাতির কল্যাণের জন্য বের করা হয়েছে; তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ করো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখো।" — (সূরা আলে ইমরান: ১১০)
আরও ইরশাদ করেন:
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ
"মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছে—আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।" — (সূরা তাওবা: ১০০)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে বাইআত করছিল।" — (সূরা ফাতহ: ১৮)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন: সাহাবায়ে কেরামের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির ঘোষণা কুরআনে সুস্পষ্ট; সুতরাং তাঁদের সমালোচনা করা বা তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণার বিরোধিতা।
২. হাদীস শরীফের দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
لَا تَسُبُّوا أَصْحَابِي، فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيفَهُ
"তোমরা আমার সাহাবীদের গালি দিও না। কেননা তোমাদের কেউ যদি উহুদ পরিমাণ স্বর্ণ দান করে, তবুও তাদের এক মুদ (বা অর্ধ মুদ) দানের সমতুল্য হবে না।" — (সহীহ বুখারী: ৩৬৭৩; সহীহ মুসলিম: ২৫৪১)
অন্য হাদীসে ইরশাদ করেন:
أَصْحَابِي كَالنُّجُومِ، بِأَيِّهِمْ اقْتَدَيْتُمْ اهْتَدَيْتُمْ
"আমার সাহাবীরা নক্ষত্রের মতো; তোমরা তাদের যে কারো অনুসরণ করলে হেদায়াত পাবে।" — (মিশকাত, হাদীস নং ৬০১৮; তবে মুহাদ্দিসীনে কেরাম এ হাদীসের সনদ নিয়ে আলোচনা করেছেন, তবে অর্থগতভাবে এটি সহীহ)
আরও ইরশাদ করেন:
خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ
"সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের লোকেরা (সাহাবীগণ), তারপর তাদের পরবর্তীরা (তাবেঈন), তারপর তাদের পরবর্তীরা (তাবে-তাবেঈন)।" — (সহীহ বুখারী: ২৬৫২; সহীহ মুসলিম: ২৫৩৩)
ইমাম তহাবী (রহ.) «আল-আকীদাতুত তহাবিয়্যাহ»-তে বলেন:
"আমরা সাহাবীদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করি এবং তাঁদের কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি না। আমরা তাঁদের অনুসরণ করি এবং তাঁদের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরি।"
৩. আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা (বিস্তারিত)
(ক) সাহাবায়ে কেরাম ন্যায়বান ও নির্ভরযোগ্য (عُدُولٌ ثِقَاتٌ)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ এবং ইমাম তহাবী (রহ.) «আল-আকীদাতুত তহাবিয়্যাহ»-তে স্পষ্ট করেন—সাহাবায়ে কেরাম সকলেই ন্যায়বান (আদল) ও নির্ভরযোগ্য (সিকা)। তাঁদের রিওয়ায়েত ও সাক্ষ্য সর্বদা গ্রহণযোগ্য। কারণ আল্লাহ তাআলা নিজেই কুরআনে তাঁদের ন্যায়বান বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
(খ) তাঁদের প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অংশ, বিদ্বেষ নিফাকের লক্ষণ
ইমাম তহাবী (রহ.) বলেন:
"যে ব্যক্তি সাহাবীদের ভালোবাসে, সে মুমিন; আর যে তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, সে মুনাফিক ও বিদআতী।"
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন: সাহাবীদের প্রতি ভালোবাসা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্যতম মূলনীতি; আর তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ রাফেজী ও খারেজীদের লক্ষণ।
(গ) তাঁদের মাঝে মতভেদ হলেও তাঁরা সবাই মুজতাহিদ ও ন্যায়বান
সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কিছু ইজতিহাদী মতভেদ ঘটেছিল (যেমন জঙ্গে জামাল ও সিফফিনের ঘটনা)। আহলে সুন্নাতের আকীদা হলো—তাঁরা সবাই মুজতাহিদ ছিলেন; যেখানে সঠিক হয়েছে সেখানে দুটি প্রতিদান, আর যেখানে ভুল হয়েছে সেখানে একটি প্রতিদান। তাঁদের কেউ ফাসিক বা গুনাহগার নন; বরং তাঁরা ইজতিহাদের ভিত্তিতে কাজ করেছেন।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন—
"আমরা সাহাবীদের প্রশংসা করি এবং তাঁদের কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি না। আমরা তাঁদের সবাইকে ন্যায়বান ও নির্ভরযোগ্য মনে করি।"
(ঘ) সাহাবীদের গালি দেওয়া হারাম ও কুফরের নিকটবর্তী
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন: সাহাবীদের গালি দেওয়া বা তাঁদের অবমাননা করা হারাম ও কবীরা গুনাহ; বরং এটি রাফেজীদের আলামত। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পোষণ করে।
ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) «হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা»-তে বলেন: সাহাবায়ে কেরামের প্রতি ভালোবাসা ও তাঁদের অনুসরণই উম্মতের জন্য হেদায়াতের পথ।
(ঙ) সাহাবীদের অনুসরণই হেদায়াতের পথ
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ
"তোমরা আমার সুন্নাহ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরো।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৪৬০৭; তিরমিজি: ২৬৭৬)
ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) «ইনসাফ»-এ বলেন: সাহাবায়ে কেরামের ইজমা ও অনুসরণই উম্মতের জন্য সর্বোত্তম পথ; তাঁদের বিরোধিতা করা গোমরাহির কারণ।
৪. ফিকহী ও আকীদাগত সতর্কতা
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:
- সাহাবীদের গালি দেওয়া বা তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা হারাম।
- যে ব্যক্তি সাহাবীদের সবাইকে গালি দেয় বা তাঁদের কাফির বলে, সে রাফেজী ও গোমরাহ।
- আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা হলো—সাহাবায়ে কেরাম সর্বোত্তম উম্মত, তাঁদের প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অংশ।