জামায়াতে ইসলামীর আকীদা কি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদার পরিপন্থী?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 7878
Questioner: asaduzzaman
Question Asked: 03 Nov 2026, 06:14 PM
Reviewed & Published: 03 Nov 2026, 06:46 PM
Views: 12
Tokens: 3,555
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

জামায়াতে ইসলামীর আকীদা কি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদার পরিপন্থী?

Answer

জামায়াতে ইসলামীর আকীদা কি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদার পরিপন্থী?

সংক্ষিপ্ত উত্তর

জামায়াতে ইসলামীর মূল আকীদা (ঈমান, তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত, কুরআন-সুন্নাহর প্রামাণ্যতা) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদার সাথে মূলত সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে কিছু মাসআলা ও পরিভাষায় তাদের কতিপয় বক্তব্য ও ব্যাখ্যায় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের (বিশেষত হানাফি মাতুরিদি) আকীদা থেকে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। তাই সামগ্রিকভাবে তাদেরকে "আকীদায় পরিপন্থী" বলে ফতোয়া দেওয়া যায় না; বরং বলা হবে—মূল আকীদায় তারা আহলে সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু কিছু আংশিক মাসআলায় তাদের বক্তব্যে সতর্কতা ও সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে।


বিস্তারিত আলোচনা

১. আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত কারা?

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত বলতে ঐ দলকে বোঝায় যারা আকীদায় রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কিরামের পথ অনুসরণ করে এবং ফিকহে চার মাযহাবের অনুসারী। আকীদার ক্ষেত্রে হানাফিদের নিকট গ্রহণযোগ্য মাযহাব হলো মাতুরিদি আকীদা, যা ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদি (রহ.) কর্তৃক সংকলিত এবং ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর আকীদারই ব্যাখ্যা।

আল-হিদায়াহ ও শরহুল আকায়িদ-এ উল্লেখ আছে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা হলো—আল্লাহ তাআলা এক, তিনি সিফাত সমূহে (যেমন ইলম, কুদরত, হায়াত, সামা', বাসার, ইরাদা, কালাম) চিরস্থায়ী; কুরআন আল্লাহর কালাম; ঈমান আমল থেকে পৃথক বস্তু; সাহাবায়ে কিরামের প্রতি ভালোবাসা ওয়াজিব; ইমামতের ক্ষেত্রে আবু বকর, উমর, উসমান, আলী (রা.)-এর ক্রমধারা; কবর আজাব ও শাফাআত সত্য ইত্যাদি।

২. জামায়াতে ইসলামীর আকীদাগত অবস্থান

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ/পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবুল আ'লা মওদুদী (রহ.) ও পরবর্তী নেতৃত্বের রচনায় আকীদার মূল বিষয়গুলো—তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত, কুরআনের প্রামাণ্যতা, সুন্নাহর অনুসরণ—স্বীকৃত। তাদের "ঈমান" অধ্যায়ে আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব, রাসূল, আখিরাত ও তাকদিরে বিশ্বাসের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, যা আহলে সুন্নাতের মূল আকীদার সাথে মিলে যায়।

তবে নিম্নোক্ত কিছু বিষয়ে তাদের বক্তব্যে ভিন্নতা বা সতর্কতার অবকাশ রয়েছে:

ক) সিফাত (আল্লাহর গুণাবলি) সম্পর্কিত বক্তব্য: মওদুদী (রহ.)-এর কিছু রচনায় সিফাতের ব্যাখ্যায় মুতাযিলি বা আধুনিকতাবাদী ধারার প্রভাবের আশঙ্কা কিছু আলিম উল্লেখ করেছেন। আহলে সুন্নাতের আকীদা হলো—সিফাতকে বিলা কাইফ (কেমনতা ব্যতীত) স্বীকার করা, না তাশবিহ (সাদৃশ্য), না তাতিল (অস্বীকার)। এখানে তাদের কিছু বক্তব্য স্পষ্ট নয়।

খ) "ইসলামী রাষ্ট্র" ও খিলাফত সম্পর্কিত ধারণা: আহলে সুন্নাতের নিকট খিলাফত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তবে এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও ফিকহি বিধান নিয়ে তাদের ব্যাখ্যায় ভিন্নতা রয়েছে।

গ) সাহাবায়ে কিরাম ও ইমামদের সম্পর্কে ভাষা: কিছু ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কিরাম, ইমামগণ বা ফিকহি মাযহাব সম্পর্কে তাদের রচনায় এমন ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে যা আহলে সুন্নাতের আদব ও আকীদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে সমালোচনা হয়েছে।

ঘ) ফিকহি মাযহাবের অনুসরণ: জামায়াতে ইসলামী ফিকহি মাযহাবের তাকলিদকে বাধ্যতামূলক মনে করে না; তারা সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিধান গ্রহণের উপর জোর দেয়। আহলে সুন্নাতের নিকট ইজতিহাদযোগ্য মাসআলায় মুজতাহিদ ইমামের অনুসরণ (তাকলিদ) অত্যাবশ্যকীয়।

৩. ফতোয়ার মূলনীতি

রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন) ও ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.)-এ উল্লেখ আছে—কোনো দল বা ব্যক্তির আকীদা সম্পর্কে ফতোয়া দেওয়ার সময় শুধু নাম বা সংগঠনের পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়; বরং তাদের প্রকৃত বক্তব্য ও বিশ্বাস যাচাই করে ফতোয়া দিতে হবে। যদি মূল আকীদায় (তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত) কোনো ইনকার(অস্বীকার) না থাকে, তবে তাকে কাফির বা বিদআতি বলা যাবে না; বরং ভুল মাসআলায় সংশোধন করা হবে।

ফাতাওয়া উসমানি-তে ও উল্লেখ আছে, আকীদার মূল বিষয়ে মুসলিম থাকলে এবং কোনো সুস্পষ্ট কুফরি বক্তব্য না থাকলে তাকে আহলে সুন্নাতের বাইরে বলা থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।

৪. সতর্কতা

  • কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি শুধু রাজনৈতিক মতভেদের কারণে "আকীদা পরিপন্থী" বা "বিদআতি" ফতোয়া দেওয়া ঠিক নয়।
  • তবে যদি কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্যে সুস্পষ্ট কুফরি বা আহলে সুন্নাতের আকীদার সাথে স্পষ্ট সাংঘর্ষিক বিষয় থাকে, তবে আলিমগণ তা যাচাই করে বিধান দেবেন।
  • সাধারণ মুসলিমের কর্তব্য—আকীদার মাসআলায় নির্ভরযোগ্য আলিম ও আহলে সুন্নাতের কিতাবের দিকে রুজু করা।

উপসংহার

জামায়াতে ইসলামীর মূল আকীদা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মূল আকীদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ; তবে কিছু আংশিক মাসআলা ও পরিভাষায় তাদের বক্তব্যে ভিন্নতা ও সংশোধনের অবকাশ রয়েছে। তাই সামগ্রিকভাবে তাদেরকে "আকীদায় পরিপন্থী" বলা ঠিক নয়; বরং বলা হবে—মূল আকীদায় তারা আহলে সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত, তবে কিছু মাসআলায় সতর্কতা ও সংশোধন প্রয়োজন। আল্লাহ তাআলা সবাইকে সঠিক আকীদা ও আমলের তাওফিক দান করুন। আমিন।

আল্লাহ ভালো জানেন।


রেফারেন্স

  1. আল-হিদায়াহ — ইমাম বুরহানুদ্দিন আল-মারগিনানি (রহ.)
  2. শরহুল আকায়িদ — ইমাম নাসাফি (রহ.)
  3. রাদ্দুল মুহতার — ইবনে আবিদিন শামি (রহ.)
  4. ইমদাদুল ফাতাওয়া — মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)
  5. ফাতাওয়া উসমানি — মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দা.বা.)
  6. মা'আরিফুল কুরআন — মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)
  7. বেহেশতি যেওর — মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)
  8. ফাতাওয়া আলমগিরি — আলমগিরি ফতোয়া সংকলন


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.