"স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী থাকার কারণে মানসিক কষ্ট, আত্মহত্যার চিন্তা ও পারিবারিক ঝগড়ায় ভুগলে করণীয় কি?

Family Life · Hanafi

Question No: 7843
Questioner: Jannatul ferdous
Question Asked: 03 Nov 2026, 07:54 AM
Reviewed & Published: 03 Nov 2026, 09:08 AM
Views: 10
Tokens: 6,780
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমার স্বামীর আরেকজন স্ত্রী আছেন। বিষয়টি ইসলাম সমর্থন করে, আমি জানি। আর তারও প্রয়োজন আছে, সেটাও আমি বুঝি। শখের বশে তিনি আরেকটি বিয়ে করেননি।

কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, এটি নিয়ে আমার কষ্ট বেড়েই চলেছে। এতটাই কষ্ট লাগে যে কোনো কাজে মন দিতে পারি না। অনেক নেতিবাচক চিন্তা মাথায় আসে। এমন পর্যায়ে গেছে যে এ নিয়ে ঝগড়া হয়। ইচ্ছে করে হয় আমি মরে যাই, নয়তো তাকে বা তার স্ত্রীকে কোনো ক্ষতি করে ফেলি।

অথচ আমি এমন ছিলাম না। কারও প্রতি ঘৃণা বা বিদ্বেষ আমি কখনো মনে রাখিনি। এমন নয় যে আমি ইচ্ছা করেই এমন করছি। আমি শুধু আমার এই কষ্টটাকে কোনোভাবেই কমাতে পারছি না। আমার ভেতরে অনেক কষ্ট হচ্ছে। মনে হয় আমার মস্তিষ্কটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। আমি কোনো কাজ করতে পারি না। আমার জীবনটা মূল্যহীন লাগে।

আমার কী করণীয়?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

ভূমিকা

আপনার কষ্টের অনুভূতি স্বাভাবিক ও মানবিক। ইসলাম বহুবিবাহকে বৈধ করলেও তা প্রত্যেকের জন্য বাধ্যতামূলক করেনি, আর স্বামীর অন্য স্ত্রী থাকার কারণে প্রথম স্ত্রীর মনে কষ্ট হওয়াটা শরীয়ত অস্বীকার করে না। তবে আপনার বর্ণনা অনুযায়ী বিষয়টি এখন শুধু "কষ্ট" নয়—আত্মহত্যার ইচ্ছা, অন্যের ক্ষতির চিন্তা, কাজে অমনোযোগিতা ও মস্তিষ্ক ছিঁড়ে যাওয়ার অনুভূতি পর্যন্ত পৌঁছেছে। এটি একটি মেডিকেল ও মানসিক স্বাস্থ্য সংকট (সম্ভবত ডিপ্রেশন/অ্যাংজাইটি) এবং একই সাথে শরীয়তের দৃষ্টিতে একটি গুরুতর বিপদ। নিচে শরীয়তের দিকনির্দেশনা ও ব্যবহারিক করণীয় ধাপে ধাপে দেওয়া হলো।


১. প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি: আত্মহত্যা ও ক্ষতির চিন্তা সম্পূর্ণ হারাম

আত্মহত্যা ইসলামে চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا "নিজেদের হত্যা করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।" — সূরা আন-নিসা: ২৯

وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ "নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না।" — সূরা আল-বাকারা: ১৯৫

হাদিসে রাসূল ﷺ বলেন: "যে ব্যক্তি নিজেকে হত্যা করল, সে কিয়ামতের দিন নিজ হাতেই নিজেকে শাস্তি দিতে থাকবে।" (সহিহ বুখারি: ১৩৬৪; সহিহ মুসলিম: ১০৯)

আর কারও ক্ষতি করার চিন্তা—তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসূল ﷺ বলেন: "মুসলিম সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।" (সহিহ বুখারি: ১০)

কাজেই এই চিন্তাগুলো শয়তানের ওয়াসওয়াসা। এগুলোকে কখনোই কাজে পরিণত করবেন না। এই ধরনের চিন্তা মাথায় আসলে সাথে সাথে আউযুবিল্লাহ পড়ুন, পানি পান করুন, স্থান পরিবর্তন করুন, এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান।


২. শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার অধিকার ও সীমা

(ক) স্বামীর অন্য স্ত্রী থাকা—এটি আপনার ইখতিয়ারাধীন নয়

স্বামী শরীয়তসম্মতভাবে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, এতে তিনি গুনাহ করেননি—বরং তিনি শরীয়তের অনুমতি ব্যবহার করেছেন। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর সর্বসম্মত মত অনুযায়ী চার স্ত্রী পর্যন্ত বিয়ে বৈধ। (আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১)

তবে শর্ত হলো ইনসাফ ও সমান অধিকার। আল্লাহ বলেন:

فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً "যদি তোমরা ইনসাফ করতে না পারার আশঙ্কা করো, তবে একজনকেই।" (সূরা আন-নিসা: ৩)

(খ) আপনার নাফাকাহ, বাসস্থান ও রাত-বণ্টনে সমান অধিকার

স্বামী যদি আপনার নাফাকাহ, থাকার ঘর বা রাত-বণ্টনে অবিচার করেন, তবে আপনার হক আদায়ের দাবি করা বৈধ। ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেন যে, স্ত্রীদের মধ্যে রাত ও খরচে সমতা ওয়াজিব। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, কিতাবুন নিকাহ)

কিন্তু মনে রাখবেন: স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে হওয়াটা নিজে কোনো জুলুম নয়—জুলুম হলো অবিচার করা। তাই "সে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে" এই কারণে তাকে বা তার স্ত্রীকে গালি দেওয়া, ক্ষতি করা বা তালাকের জন্য চাপ দেওয়া শরীয়তসম্মত নয়।

(গ) আপনি তালাক চাইতে পারেন—কিন্তু তা শেষ উপায়

আপনি যদি মানসিকভাবে একেবারেই সহ্য করতে না পারেন, শরীয়ত আপনাকে খুলা' বা তালাকের আবেদনের অধিকার দিয়েছে। তবে রাসূল ﷺ সতর্ক করেছেন: "যে নারী বিনা কারণে স্বামীর কাছে তালাক চায়, তার উপর জান্নাতের সুগন্ধও হারাম হয়ে যায়।" (সুনানে আবু দাউদ: ২২২৬; তিরমিজি: ১১৮৭) — অর্থাৎ তালাক চাওয়া বৈধ, কিন্তু তা যেন আবেগের বশে না হয়।


৩. মানসিক কষ্টের শরীয়তসম্মত সমাধান

(ক) দুআ ও যিকির—হৃদয়ের প্রশান্তির মূল উৎস

আল্লাহ বলেন:

أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ "জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্ত হয়।" (সূরা আর-রা'দ: ২৮)

প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা এই দুআটি পড়ুন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ "হে আল্লাহ! আমি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ, অক্ষমতা ও অলসতা, কৃপণতা ও ভীরুতা, ঋণের বোঝা ও মানুষের প্রভাব থেকে আপনার আশ্রয় চাই।" (সহিহ বুখারি: ২৮৯৩)

(খ) স্বামীর সাথে শান্তভাবে কথা বলুন

রাগের মুহূর্তে নয়—শান্ত সময়ে বসে তাকে বলুন: "আমি দ্বিতীয় বিয়েকে হারাম বলছি না, কিন্তু আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছি। আমার নাফাকাহ, থাকার ব্যবস্থা ও সম্মানে যেন কোনো অবিচার না হয়, এবং আমার মানসিক চিকিৎসায় আপনি সহযোগিতা করুন।" ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী জেওর"-এ স্ত্রী-স্বামীর পারস্পরিক সহানুভূতি ও সদাচরণের উপর জোর দিয়েছেন।

(গ) ঝগড়া ও তুলনা পরিহার করুন

রাসূল ﷺ বলেন: "নারীদের ব্যাপারে সদুপদেশ গ্রহণ করো।" (সহিহ বুখারি: ৫১৮৬) — তবে স্ত্রীর জন্যও নির্দেশনা হলো, স্বামীর অন্য স্ত্রী নিয়ে তাকে দোষারোপ না করা, কটু কথা না বলা। ঝগড়া পরিস্থিতি আরও খারাপ করে।


৪. মেডিকেল সহায়তা নিন—এটি শরীয়তসম্মত ও জরুরি

আপনার লক্ষণ—কাজে অমনোযোগিতা, জীবন মূল্যহীন লাগা, মস্তিষ্ক ছিঁড়ে যাওয়ার অনুভূতি, আত্মহত্যার চিন্তা—এগুলো ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের লক্ষণ। ইসলাম চিকিৎসাকে সমর্থন করে; রাসূল ﷺ বলেছেন: "আল্লাহ যে রোগ দিয়েছেন, তার চিকিৎসাও দিয়েছেন।" (সহিহ বুখারি: ৫৬৭৮)

করণীয়:

  1. একজন বিশ্বস্ত মুসলিম সাইকিয়াট্রিস্ট বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট-এর সাথে দেখা করুন। প্রয়োজনে ওষুধ ও কাউন্সেলিং নিন।
  2. একজন মুসলিম ফ্যামিলি কাউন্সেলর/মুফতি-এর সাথে স্বামী-স্ত্রী একসাথে বসুন।
  3. আপনার ঘনিষ্ঠ বিশ্বস্ত কাউকে (মা, বোন, বান্ধবী) আপনার অবস্থা জানান—একা লড়বেন না।

৫. নিজের জীবনে ইতিবাচক ব্যস্ততা তৈরি করুন

  • প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করুন—এটি মানসিক চিকিৎসারও সহায়ক।
  • কুরআন তিলাওয়াত, বিশেষত সূরা ইয়াসিন, আর-রাহমান, এবং সূরা দুহা নিয়মিত পড়ুন।
  • ঘরে বাইরে কিছু হালাল কাজ, পড়াশোনা, হাতের কাজ বা সেবামূলক কাজে নিজেকে যুক্ত করুন।
  • ঘুম, খাওয়া ও শরীরচর্চার রুটিন ঠিক করুন—ডিপ্রেশনে এগুলো খুবই প্রভাব ফেলে।

৬. সবচেয়ে বড় কথা: ধৈর্য ও আল্লাহর উপর ভরসা

আল্লাহ বলেন:

وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ "হয়তো তোমরা এমন কিছু অপছন্দ করছ, যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।" (সূরা আল-বাকারা: ২১৬)

إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ "নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের পুরস্কার বিনা হিসাবে দেওয়া হবে।" (সূরা আয-যুমার: ১০)

আপনার এই কষ্টের প্রতিদানে আল্লাহ বিপুল প্রতিদান রাখবেন—ইনশাআল্লাহ। কিন্তু ধৈর্য মানে নিজেকে ধ্বংস করা নয়; ধৈর্য মানে চিকিৎসা নেওয়া, দুআ করা, স্বামীর সাথে শান্তভাবে কথা বলা এবং হারাম পথ (আত্মহত্যা, ক্ষতি, অবৈধ সম্পর্ক) থেকে দূরে থাকা।


সারসংক্ষেপ করণীয়

| ধাপ | করণীয় | |---|---| | ১ | আত্মহত্যা ও ক্ষতির চিন্তা সম্পূর্ণ বর্জন; আউযুবিল্লাহ ও দুআ পড়া | | ২ | স্বামীর সাথে শান্তভাবে কথা বলে নাফাকাহ, বাসস্থান ও সম্মানের অধিকার নিশ্চিত করা | | ৩ | অবিলম্বে মুসলিম সাইকিয়াট্রিস্ট/কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া | | ৪ | নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও যিকিরে নিয়মিত থাকা | | ৫ | ঝগড়া, তুলনা ও কটু কথা পরিহার করা | | ৬ | বিশ্বস্ত কাউকে নিজের অবস্থা জানানো; একা না থাকা | | ৭ | তালাকের সিদ্ধান্ত নিলে আবেগে নয়—ইস্তিখারা ও আলেমের পরামর্শের পর |

আল্লাহ তাআলা আপনার কষ্ট দূর করুন, আপনার হৃদয়ে প্রশান্তি দান করুন এবং আপনার পরিবারকে শান্তি ও ইনসাফের সাথে একত্রে রাখুন। আমিন।


রেফারেন্স: সূরা আন-নিসা ৩, ২৯; সূরা আল-বাকারা ১৯৫, ২১৬; সূরা আর-রা'দ ২৮; সূরা আয-যুমার ১০; সহিহ বুখারি ১০, ২৮৯৩, ৫১৮৬, ৫৬৭৮; সহিহ মুসলিম ১০৯; সুনানে আবু দাউদ ২২২৬; তিরমিজি ১১৮৭; আল-হিদায়া (কিতাবুন নিকাহ); ফাতাওয়া আলমগিরি (খণ্ড ১); রাদ্দুল মুহতার (খণ্ড ৩); বেহেশতী জেওর; ইমদাদুল ফাতাওয়া; ফাতাওয়া উসমানি।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.