কালোজাদুর কার্যকারিতা, ক্ষতিকর প্রভাব ও তা থেকে বাঁচার ইসলামি উপায় কি?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 7828
Questioner: Rimi
Question Asked: 02 Nov 2026, 08:30 PM
Reviewed & Published: 02 Nov 2026, 09:05 PM
Views: 31
Tokens: 3,606
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কোনো ব্যক্তির ওপর যদি কালোজাদু করা হয়, তাহলে সেটা থেকে বাঁচার জন্য সে কি কি ধরনের আমল করবে? কি কি নিয়ম মেনে চলবে? আমল গুলো যদি সে ব্যক্তির স্ত্রী করে তাহলে কি সেটা সেই ব্যক্তির জন্য কার্যকর হবে?

Answer

কালোজাদু থেকে বাঁচার ইসলামি উপায় ও করণীয়

ভূমিকা

ইসলামে কালোজাদু (সিহর) একটি বাস্তব ও নিষিদ্ধ বিষয়। কুরআন-হাদিসে এর অস্তিত্ব স্বীকৃত এবং তা থেকে বাঁচার বৈধ উপায়ও নির্দেশিত হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে—কালোজাদু কেবল আল্লাহর অনুমতিক্রমেই কার্যকর হয়; আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল ও বৈধ আমলই প্রকৃত প্রতিরোধ।


১. কালোজাদুর ইসলামি বিধান

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"তারা এমন বিষয় শিখছিল, যা তাদের ক্ষতি করে এবং উপকার করে না।" (সূরা বাকারা: ১০২)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

"সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে দূরে থাকো... (তন্মধ্যে) সিহর (কালোজাদু)।" (সহিহ বুখারি: ৫৭৬৪; সহিহ মুসলিম: ৮৯)

হুকুম: কালোজাদু করা, করানো বা বিশ্বাস করে তার উপর ভরসা করা—সবই হারাম ও কবিরা গুনাহ। তবে কালোজাদু থেকে বাঁচার জন্য বৈধ শারঈ উপায় অবলম্বন করা জায়েজ।


২. কালোজাদু থেকে বাঁচার আমল

(ক) ফরজ-ওয়াজিব যথাযথ পালন

সবচেয়ে বড় সুরক্ষা হলো আল্লাহর হুকুক আদায় করা। নামাজ, রোজা, যাকাত, হালাল উপার্জন ও হারাম বর্জন।

(খ) সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকির

  • আয়াতুল কুরসি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ও ঘুমানোর আগে পড়া।
  • সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের আগে ৩ বার পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরে বুলানো।
  • "বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মাআস মিহি শাইউন ফিস সামায়ি ওয়ালা ফিল আরদি ওয়া হুয়াস সামিউল আলিম" সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার।
  • "আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক" সন্ধ্যায় ৩ বার।

(গ) সূরা বাকারার নিয়মিত তিলাওয়াত

রাসূল ﷺ বলেন: "যে ঘরে সূরা বাকারা পড়া হয়, সেখানে শয়তান প্রবেশ করে না।" (সহিহ মুসলিম: ৭৮০)

(ঘ) সকাল-সন্ধ্যা সুরক্ষার দুআ

"আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক" (সহিহ মুসলিম: ২৭০৮)

(ঙ) সাদকা ও দান

নিয়মিত সাদকা বিপদ দূর করে। রাসূল ﷺ বলেন: "সাদকা বিপদ দূর করে।" (তিরমিজি)

(চ) পবিত্রতা ও ওযু রক্ষা

ওযু অবস্থায় থাকা শয়তান থেকে সুরক্ষা।

(ছ) হালাল খাবার ও বৈধ উপার্জন

হারাম খাদ্য দুআ কবুলে বাধা দেয়।

(জ) তাওবা-ইস্তিগফার

গুনাহ থেকে ফিরে আসা; কারণ গুনাহই বিপদের মূল কারণ।


৩. নিয়ম-শৃঙ্খলা

  1. শিরক-কুফর থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা—তাবিজ-কবজ, জ্যোতিষী, গণক, ডাকিনীবিদ্যার আশ্রয় নেওয়া নিষিদ্ধ।
  2. রুকইয়া শারইয়্যা (কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক বৈধ ঝাড়ফুঁক) করা যাবে—তবে শর্ত: (ক) আল্লাহর কালাম বা তাঁর নাম-গুণাবলি দ্বারা, (খ) আরবি বা বোধগম্য ভাষায়, (গ) বিশ্বাস রাখা যে আরোগ্য দেন কেবল আল্লাহ।
  3. সবর ও দৃঢ় বিশ্বাস—আল্লাহর উপর ভরসা রাখা; আতঙ্কিত না হওয়া।
  4. নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত—বিশেষত সূরা বাকারা ঘরে চালু রাখা।
  5. ডাক্তারি চিকিৎসা—প্রয়োজনে মানসিক ও শারীরিক চিকিৎসা নেওয়া জায়েজ; এটি তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়।

৪. স্ত্রী কর্তৃক আমল করা কি কার্যকর?

হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ কার্যকর হবে, তবে শর্তসাপেক্ষে:

  • দুআ ও রুকইয়া একটি ইবাদত; যে-কেউ কারও জন্য দুআ করতে পারে। স্ত্রী স্বামীর জন্য দুআ করলে তা কবুলের আশা রাখে।
  • তবে শর্ত: আমলটি শরিয়তসম্মত হতে হবে—কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক দুআ, আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক-নাস ইত্যাদি। কোনো শিরকি পদ্ধতি, কবজ, বা অজ্ঞাত পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে না।
  • সরাসরি ঝাড়ফুঁক (রুকইয়া): স্ত্রী স্বামীর উপর সরাসরি ফুঁ দিতে পারেন—এটি জায়েজ; রাসূল ﷺ নিজে সাহাবিদের উপর ফুঁ দিয়েছেন এবং সাহাবিরা নিজেদের উপরও পড়েছেন।
  • তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: রোগী নিজে আমল করলে তার তাওয়াক্কুল ও ইবাদত সরাসরি প্রভাব ফেলে; পাশাপাশি স্ত্রীর দুআ ও রুকইয়া সহায়ক হবে। উভয়ের সমন্বয় সর্বোত্তম।

ফিকহি ভিত্তি: ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন—কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক রুকইয়া ও দুআ বৈধ; শর্ত হলো শিরকমুক্ত হওয়া। (রাদ্দুল মুহতার: ৯/৬৪০-৬৪২, দারুল ফিকর)


৫. বর্জনীয় বিষয়

  • গণক, জ্যোতিষী, ডাকিনীবিদ্যার কাছে যাওয়া—রাসূল ﷺ বলেন: "যে ব্যক্তি গণকের কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করল, তার ৪০ দিনের নামাজ কবুল হবে না।" (সহিহ মুসলিম: ২২৩০)
  • শিরকি তাবিজ-কবজ ব্যবহার।
  • কালোজাদু প্রতিরোধে হারাম পদ্ধতি অবলম্বন।

উপসংহার

কালোজাদু থেকে বাঁচার সর্বোত্তম উপায়—আল্লাহর উপর দৃঢ় তাওয়াক্কুল, ফরজ ইবাদতের পাবন্দি, মাসনুন জিকির ও দুআ, সূরা বাকারার তিলাওয়াত, সাদকা এবং শিরক থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা। স্ত্রী স্বামীর জন্য বৈধ দুআ ও রুকইয়া করতে পারেন—এটি সহায়ক ও কার্যকর; তবে রোগীর নিজের আমল ও তাওয়াক্কুলই মূল। আল্লাহই সর্বোত্তম হেফাজতকারী।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.