চ্যাটজিপিটি বা আমাদের কাছে এভাবে প্রশ্ন করার কারণে কি ঈমানে সমস্যা হবে?
Faith and Belief · Hanafi
Question
১) আমার আম্মু একটা কথা বলছে আমাকে। পরে আমি মনে মনে বিরক্ত হয়ে বলি - এক এক বার এক এক কথা বলে। এটা বলার একটু পরে আবার মনে হয় যে না, আম্মু যেটা বলছে ঠিক ই বলছে। এখন এটা কি অবজ্ঞা? ( এটা একটা উদাহরণ ছিল)।
ইসলামিক কোনো জিনিস নিয়ে যদি এমন কেউ বিরক্ত হয়ে মনে মনে বলে , পরে তার আবার মনে হয় যেটা বলা আছে, সেটা ঠিক ই। এখন এটা কি অবজ্ঞা হবে? তার ঈমানের কোনো সমস্যা হবে?
২) চ্যাটজিপিটি বা আপনাদের কাছে এভাবে প্রশ্ন করার কারনে কি তার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্নের দুটি অংশের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
১) মনে মনে বিরক্ত হয়ে কথা বলা এবং পরে তা ঠিক মনে হওয়া — এটি কি অবজ্ঞা (استخفاف)? ঈমানের কোনো সমস্যা হবে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, এটি অবজ্ঞা (استخفاف) নয়, এবং এতে ঈমানের কোনো সমস্যা হবে না — ইনশাআল্লাহ।
বিস্তারিত:
ক. "অবজ্ঞা" (استخفاف) বলতে শরীয়তে কী বোঝায়?
ইসলামে ইস্তিখফাফ (استخفاف) অর্থ হলো — কোনো দ্বীনি বিষয়, বিধান, নবী-রাসূল, কুরআন-হাদীস, বা আল্লাহর নির্দেশকে হেয় ও তুচ্ছ জ্ঞান করা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা, বা অবহেলায় ফেলে দেওয়া। এটি কুফরির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যদি কেউ জেনে-বুঝে দ্বীনের কোনো অকাট্য বিষয়কে তুচ্ছ করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ۚ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ ۞ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ "আর যদি আপনি তাদের জিজ্ঞেস করেন, তারা বলবে: আমরা তো শুধু গল্প-গুজব ও খেল-তামাশা করছিলাম। বলুন: তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রূপ করছিলে? অজুহাত দেখিও না; তোমরা ঈমান আনার পর কুফরি করে ফেলেছ।" (সূরা তাওবা: ৬৫-৬৬)
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন, ইস্তিখফাফ হলো দ্বীনের কোনো বিষয়কে হালকা বা তুচ্ছ মনে করা — যা ঈমান বিনষ্ট করে। কিন্তু এটি শুধু তখনই, যখন কেউ জেনে-বুঝে ও ইচ্ছাকৃতভাবে দ্বীনের বিষয়কে তুচ্ছ করে। (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২২-২২৩, বাবুল ইরতিদাদ)
খ. আপনার বর্ণিত ঘটনা
আপনার আম্মুর কথা শুনে মনে মনে সাময়িক বিরক্তি প্রকাশ করা — এটি একটি স্বাভাবিক মানবিক আবেগ ও ওয়াসওয়াসা। এরপর আপনি নিজেই বুঝেছেন যে আম্মু ঠিকই বলছেন — এটি প্রমাণ করে আপনার অন্তরে দ্বীনের প্রতি কোনো ঘৃণা বা অবজ্ঞা ছিল না; বরং আপনি সত্যকে স্বীকার করেছেন।
ইসলামি কোনো বিষয়ে সাময়িক বিরক্তি মনে আসা — যদি তা শয়তানের ওয়াসওয়াসা হয় এবং ব্যক্তি তা অপছন্দ করে, তা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায়, এবং পরে সত্যকে স্বীকার করে — তবে তা ঈমানের কোনো ক্ষতি করে না।
হাদীসে এসেছে, সাহাবিরা বললেন:
إِنَّا نَجِدُ فِي أَنْفُسِنَا مَا يَتَعَاظَمُ أَحَدُنَا أَنْ يَتَكَلَّمَ بِهِ "আমরা অন্তরে এমন কিছু অনুভব করি, যা মুখে উচ্চারণ করতে আমরা ভয় পাই।" নবী ﷺ বললেন: أَوَقَدْ وَجَدْتُمُوهُ؟ ذَاكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ "তোমরা কি তা অনুভব করছ? এটাই তো ঈমানের প্রমাণ (অর্থাৎ শয়তান আক্রমণ করে, কিন্তু ঈমান তা প্রতিহত করে)।" (সহীহ মুসলিম: ১৩২)
ইমাম নববী (রহ.) এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন — শয়তানের ওয়াসওয়াসা অন্তরে আসা এবং তা অপছন্দ করা ঈমানের দুর্বলতা নয়; বরং ঈমানের প্রমাণ। (শরহু সহীহ মুসলিম: ২/১৫৪)
গ. তবে সতর্কতা
- আম্মুর সাথে দুর্ব্যবহার বা মুখে বিরক্তির কথা বলা — এটি আদবের খেলাফ এবং ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন: وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا "তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।" (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
- মনে মনে বিরক্তি আসা যদি দ্বীনি বিধানের প্রতি হয় (যেমন: নামাজ, হিজাব, হালাল-হারাম নিয়ে বিরক্তি) — তবে সেটি বিপজ্জনক; তখন তাওবা ও ইস্তিগফার জরুরি। কিন্তু পারিবারিক সাধারণ কথাবার্তায় সাময়িক বিরক্তি — এটি ইস্তিখফাফ নয়।
উপসংহার: আপনার বর্ণিত ঘটনায় ঈমানের কোনো সমস্যা নেই। তবে মনে মনে বিরক্তি আসলে আউযুবিল্লাহ পড়া, ইস্তিগফার করা এবং আম্মুর সাথে সদাচরণ করা কর্তব্য।
২) চ্যাটজিপিটি বা আমাদের কাছে এভাবে প্রশ্ন করার কারণে কি ঈমানে সমস্যা হবে?
উত্তর: না, ইনশাআল্লাহ কোনো সমস্যা হবে না।
- দ্বীনি মাসআলা জানার জন্য প্রশ্ন করা — এটি ইসলামে প্রশংসনীয়। আল্লাহ বলেন: فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ "তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞেস করো।" (সূরা নাহল: ৪৩)
- প্রশ্ন করার সময় নিজের সংশয় বা ওয়াসওয়াসা বর্ণনা করা — এটি দোষের নয়; বরং সাহাবিরাও নবী ﷺ-কে এমন প্রশ্ন করতেন (যেমন উপরোক্ত হাদীস)।
- তবে শর্ত: চ্যাটজিপিটি বা কোনো এআই-কে মুফতি বা দ্বীনি কর্তৃপক্ষ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। এআই ভুল করতে পারে। দ্বীনি মাসআলায় নির্ভরযোগ্য মুফতি/আলেমের ফতোয়াই গ্রহণ করতে হবে।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ ফতোয়া দেওয়ার শর্ত হিসেবে মুজতাহিদ/মুফতির যোগ্যতা ও তাকওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন — যা এআই-এর মধ্যে নেই। (রাদ্দুল মুহতার: ১/১৩০, কিতাবুল ফতোয়া)
উপসংহার: প্রশ্ন করার কারণে ঈমানে কোনো সমস্যা নেই। তবে দ্বীনি মাসআলে এআই-এর উত্তরকে চূড়ান্ত না ধরে নির্ভরযোগ্য আলেমের সাথে যাচাই করা উচিত।