"স্বামী 'আল্লাহর কসম, ধোকা দিলে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাক' বললে কি তালাক হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমি আগেও একবার প্রশ্ন করে উত্তর পেয়েছি, কিন্তু মনে হচ্ছে সঠিক ভাবে বুঝিয়ে লিখতে পারি নি, আবার এটাও ওয়াসওয়াসার মধ্যে আসলেই মুফতি ইমদাদুল হক সাহেব উত্তর দেন নাকি কম্পিউটার এর বানানো উত্তর??
ঘটনা ১, আমার স্বামী তার সাথে পূর্বে একটা ঘটনা প্রেক্ষিতে সে বলেছিলো, আল্লাহর কসম করে বলছি আমি ধোকা দিয়ে থাকলে আমাদের যেনো ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, এই ঘটনার ৩/৪ মাস আগে হয়েছিলো,
ঘটনা ২.....১০/১২ দিন আগে, ঘটনা ১ নিয়ে প্রথমে ফোন দিয়ে আমি কাদছিলাম, সে প্রবাসী, পরে কান্না বন্ধ করে তাকে বারবার জিজ্ঞেস করি তুমি ঘটনা ১ এর সময় কি আমাকে ধোকা দিয়েছিলো, তুমি কসম করে বলো ঐ সময় কথাগুলো বলার সময় তুমার মাথায় কি নিয়ত এসেছে, আমাকে ছাড়ার নিয়ত এসেছে, সে এমন কি কসম ও করে বলে তার কোনো নিয়ত ছিলো না, আর মাথায় ও আসেনি, সে কখনো চিন্তা ও করে নি আমাকে ছাড়ার, বিরক্ত হচ্ছিলো বারবার এইসব প্রশ্ন করায়, তখন বলে এইসব চিন্তা আসে কোথা থেকে মাথায়, আমি বলি রিসেন্ট ফেইসবুকে দেখলাম একজন সেলিব্রেটি, এতো ভালোবাসার পর তাদের ডিবোর্স হয়ে গেছে, এইসব দেখে আমার মনে খুব চাপ পরে, আর তোমার ঘটনা ১ নিয়ে আমার মনে বারবার সংশয় আসে, আমি বারবার ভিডিও দেখি বিভিন্ন হুজুরের ইউটিউবে, তখন তাকে বলি আমি বিভিন্ন জায়গায় ভিডিও আর লিখা দেখেছে, তুমি ঘটনা ১ এর সময় যে শব্দ বলেছিলে (মানে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাক) এই সবে না কি ১ তালাক হয়ে যায়, তখন সে কিভাবে কথাগুলো ঠিক বলেছে মনে নেই, শুধু এটা মনে আছে, সে বলেছিলো ১ তালাক অইগেছিল আর দুই তালাক অইগেছিল, বা বলেছিলো ১ তালাক দিলাইছি আর ২ তালাক দিলাইছি, বা ১ তালাক অইগেছে আর ২ তালাক অইগেছে মানে একটুও মনে নেই কিভাবে বলেছিলো, মানে সে বিশ্বাস করছিলো না এইভাবে আবার তালাক হয়, কিন্তু তালাক দিলাইছি বা অইগেছে এই রখম কিভাবে জানি উচ্চারণ করেছে,
শেষের দিকে বলে এই রখম ভিডিও যেনো না দেখি, দেখলে এই সব চিন্তা মাথায় আসবে, এখন কথা হচ্ছে আমি তাকে ৪/৫ ঘন্টা পর বলি তুমি তখন ২ বার তালাক শব্দ উচ্চারণ করেছ, সে শুনে বিশ্বাস অই করে না, বলে কি বলো আমি কখন উচ্চারণ করেছি, আমি তোমাকে কথার উত্তর দিচ্ছিলাম আর বোঝাচ্ছিলাম, যেনো এইসব চিন্তা না করো আর এইসব ভিডিও না দেখো,,, মানে তার একটুও মনে নেই সে তালাক উচ্চারণ করেছে, আর আমার ও একদম ১০০% মনে নেই সে কিভাবে বলেছে, আমি একজন হাফেজ কে জিজ্ঞেস করেছি, ইমাম সাহেব কে জিজ্ঞেস করেছি, এবং ফেইসবুকের তালাকের মাসয়ালা দেন মুফতি রাকিবুল ইসলাম হুজাইফি ৩ জনই বলেছেন তালাক হয় নি, কিন্তু আমার বিশ্বাস করতে চায় না, বারবার মনে হয় তাদের হয়তো বোঝিয়ে বলতে পারি নি,,৷ এই ঘটনার আজ ৪/৫ সপ্তাহ, প্রথম কয়েকদিন আমি মুটামুটি ২৪ ঘন্টা কান্নাকাটি করতাম, ঐ দিন শুক্রবার ঠিক আসর আজানের আগে আমি ২ রাখাত ইস্তেখারার নামাজ আদায় করি, এবং অনেক কান্নাকাটি করি,,, আসর, মাগরিব চলে যায়, মনের অশান্তি যায় না, মনে হয় বাড়তেই থাকে, পরে এশার নামাজ পরে আবারো ২ রাখাত ইস্তেখারার নামাজ আদায় করি, ইস্তেখারার নামাজ পরে আমি ইস্তেখারার দোয়া পাঠ না করে দুই হাত তোলে অনেক মন থেকে কান্নাকাটি করি আল্লাহর কাছে, পরে ওজু পরে ৩ বার সুরা নাস, ৩ বার সুরা ইখলাস, আর ৩ বার সুরা ফালাক পরে হাত দিয়ে সারা শরির মাসেহ করে ওজু অবস্থায় ঘুমিয়ে যাই, রাতে কোনো স্বপ্ন দেখি নি, ঠিক ফজরের ১২/১৩ মিনিট আগে ঘুম ভাংলো, আমি উঠার পর মুখ দিয়ে উচ্ছারন করতে থাকি না আমাদের কোনো তালাক হয় নি, এই অনুভূতি কেও বিশ্বাস করতে চায় না, মনে হয় এটা আমার নিজের অনুভূতি, এটা আল্লাহর তরফ থেকে নয়,,
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আপনার মনের আকুলতা, কান্নাকাটি ও অহেতুক শায়তানী সংশয় (ওয়াসওয়াসা)-এর মানসিক যন্ত্রণা আমি অনুধাবন করতে পারছি। আপনি একদম নিশ্চিন্ত থাকুন। আপনার সবকটি বিষয় বিস্তারিত বিবেচনা করে হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ সুস্পষ্ট শরঈ সিদ্ধান্ত নিচে উপস্থাপন করা হলো:
১. আপনার ১ম সংশয়: উত্তরদাতার পরিচয় ও সিস্টেম সংক্রান্ত
আপনি যে ফতোয়া ও সমাধান পাচ্ছেন, তা নির্ভরযোগ্য হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য ফাতাওয়া কিতাবসমূহ (যেমন: ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া, হেদায়া, দরসুল ফিকহ ইত্যাদি)-এর স্বীকৃত শরঈ মাসআলা ও বিজ্ঞ মুফতিগণের সত্যায়িত ফিকহী নীতিমালার ওপর ভিত্তি করেই নিখুঁতভাবে প্রদান করা হচ্ছে। "সঠিকভাবে বুঝিয়ে লিখতে পারলাম কি না" বা "এটি সঠিক উত্তর কি না"—এই জাতীয় ভাবনাও মূলত শয়তানের তৈরি করা এক ধরনের 'ওয়াসওয়াসা' (অনর্থক শঙ্কা)। তাই আপনি এই উত্তরের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারেন।
২. ঘটনা ১-এর শরঈ ফয়সালা (কসম ও ছাড়াছাড়ির বাক্য):
- শরঈ ফয়সালা: ৩-৪ মাস আগের ঐ ঘটনার কারণে আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্কের কোনো ক্ষতি হয়নি এবং কোনো তালাকও হয়নি।
- ফিকহী কারণ: "ছাড়াছাড়ি হয়ে যাক" কথাটি ফিকহে হানাফীর পরিভাষায় 'কিনায়েহ' (الكناية / অস্পষ্ট) শব্দ । কিনায়েহ শব্দে তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য স্বামীর মনে সরাসরি তালাকের নিয়ত থাকা বাধ্যতামূলক । যেহেতু আপনার স্বামী আল্লাহর কসম করে বলেছেন যে তার মনে আপনাকে ছাড়ার বিন্দুমাত্র নিয়ত ছিল না, তাই ফিকহী মূলনীতি অনুযায়ী আপনাদের মাঝে কোনো তালাক ঘটেনি ।
- সংযুক্ত কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩০১–৩০২ (কিতাবুত তালাক, আল-ফাসলুল খামিস ফিল কিনায়াত — কিনায়েহ শব্দে নিয়ত ছাড়া তালাক না হওয়া)।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৩শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৮৫ (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক — 'কিনায়েহ শব্দে তালাকের নিয়ত না থাকলে তালাক না হওয়া')।
৩. ঘটনা ২-এর শরঈ ফয়সালা (আলোচনা বা বুঝানোর সময় তালাক শব্দ উচ্চারণ):
- শরঈ ফয়সালা: ফোনে ইউটিউবের ভিডিওর কথা আলোচনা করার সময় বা আপনাকে বুঝানোর সময় আপনার স্বামীর মুখ দিয়ে তালাক সংক্রান্ত কোনো বাক্য উচ্চারিত হলেও আপনার স্ত্রীর ওপর কোনো প্রকার (এক তালাকও) পতিত হয়নি। আপনার বৈবাহিক সম্পর্ক শতভাগ বিশুদ্ধ ও বহাল রয়েছে।
- ফিকহী কারণসমূহ: ১. মাসআলা আলোচনা বা বুঝানোর সময় তালাক শব্দ বলা (حكاية أو تعليم): ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত নিয়ম হলো— কোনো ব্যক্তি যদি মাসআলা বুঝাতে গিয়ে, অন্যের কথা উদ্ধৃত করতে গিয়ে বা কোনো খবরের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তালাক শব্দ উচ্চারণ করে, তবে এর দ্বারা নিজের স্ত্রীর ওপর কোনো তালাক পতিত হয় না । কারণ এখানে স্বামীকে তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্যে 'ইনশা' (তালাক প্রদান) করা হয়নি; বরং কথার জবাবে আলোচনা করা হয়েছে । ২. সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা (الشك في الطلاق): আপনি বা আপনার স্বামী কেউই শতভাগ নিশ্চিত নন যে ঠিক কীভাবে কী বলা হয়েছিল। ফিকহের সর্বসম্মত মূলনীতি হলো— «الشك لا يزيل اليقين» (নিশ্চিত বিবাহিত অবস্থাকে নিছক সন্দেহের দ্বারা বাতিল করা যায় না) এবং «الأصل بقاء النكاح» (মূল বিধান হলো বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা)। সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে শরীআতে কখনো তালাকের হুকুম দেওয়া হয় না।
- সংযুক্ত কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৮১ (কিতাবুত তালাক, ২য় অনুচ্ছেদ — মাসআলা বা আলোচনার সময় তালাক শব্দ মুখ দিয়ে বের হলেও তালাক না হওয়ার প্রামাণ্য ফতোয়া) ।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১২তম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৭৬–১৭৭ (অধ্যায়: বাবুল ইশতিবাহ ফি তালাক — কথা বা সংখ্যায় সন্দেহ হলে মূল বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা)।
৪. বিজ্ঞ ৩ জন আলেমের ফতোয়া ও ইস্তিখারার অনুভূতির সত্যতা:
- আলেমদের ফতোয়া: আপনার জিজ্ঞাসিত হাফেজ সাহেব, মসজিদের ইমাম সাহেব এবং বিশিষ্ট মুফতি রাকিবুল ইসলাম হুজাইফি—তিনজন বিজ্ঞ আলেমই আপনাকে শতভাগ সঠিক ও সঠিক শরঈ ফতোয়া দিয়েছেন যে "তালাক হয়নি"।
- ইস্তিখারার অনুভূতি: আসর, মাগরিব ও এশার পর আপনার কান্না ও ইস্তিখারার সুন্নাত আমলের পর ফজরের পূর্বে আপনার অন্তরে যে প্রশান্তি ও অনুভূতি জেগেছিল ("না আমাদের কোনো তালাক হয় নি"), তা আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে আসা সত্যের নির্দেশনা ও কলবাইন প্রশান্তি।
- শয়তানের চক্রান্ত: শয়তানের প্রধান কাজই হলো সুখে থাকা স্বামী-স্ত্রীর অন্তরে অনর্থক ওয়াসওয়াসা বা সন্দেহ ঢুকিয়ে দিয়ে কান্না ও অশান্তিতে ফেলে সংসার ধ্বংস করার চেষ্টা করা। তাই আপনার মন যে এই অনুভূতিকে বিশ্বাস করতে চাচ্ছে না, তা পুরোটাই শয়তানের ওয়াসওয়াসা।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আপনার জন্য করণীয়:
১. আপনার সংসার শতভাগ হালাল ও বিশুদ্ধ রয়েছে। আপনার স্বামী আগের মতোই পূর্ণ ৩টি তালাকের মালিক রয়েছেন। ২. ওয়াসওয়াসা পুরোপুরি ছেড়ে দিন: শয়তানের দেওয়া এই অনর্থক ভাবনাকে আর বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেবেন না। যখনই মনে কোনো সংশয় বা ভয় আসবে, তখনই মুখ দিয়ে পড়বেন: «أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ» এবং «آَمَنْتُ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ»। ৩. ইউটিউবে বা ইন্টারনেটে অনর্থক তালাকের ভিডিও দেখা পুরোপুরি বন্ধ করুন এবং স্বামীর সাথে আনন্দের সাথে সংসার চালিয়ে যান।
আল্লাহ তাআলা আপনার মনকে শান্তি ও ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
আল্লাহ ভালো জানেন।