হাম্বলি মাযহারেব আলোকে রাগের মাথায় বারবার "ছেড়ে দিলাম" বা "ডিভোর্স দিয়ে দেব" বললে কি তালাক হয়ে যায়? তালাকের নিয়ত না থাকলে শরিয়তের বিধান কী?

Marriage and Divorce · Hanbali

Question No: 7801
Questioner: Maisha Khanom
Question Asked: 02 Nov 2026, 02:41 PM
Reviewed & Published: 02 Nov 2026, 03:46 PM
Views: 9
Tokens: 12,553
This answer is according to the 'Hanbali' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুআলাইকুম আমি নতুন বিয়ে করছি এক মাস হইছে আমি ওর অতীত এর একটা জিনিস নিয়ে খুব বিরক্ত ছিলাম তাই আমাদের দাম্পত্য জীবনে বিভিন্ন সময় রাগারাগি ও উত্তেজনার মুহূর্তে আমি রাগের মাথায় একাধিকবার আমার স্ত্রীকে 'ছেড়ে দিলাম' এবং মাঝে মাঝে 'ডিভোর্স দিয়ে দেব বা ডিভোর্স লেটার পাঠাব'—এজাতীয় কথাগুলো অনেকবার বলে ফেলেছি।
তবে আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, এই কথাগুলো বারবার বলার সময় আমার মনে বিন্দুমাত্রও তালাক দেওয়ার বা চিরতরে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলার কোনো নিয়ত বা উদ্দেশ্য ছিল না। আমার উদ্দেশ্য কখনোই সংসার ভেঙে দেওয়া ছিল না; আমি কেবল তাকে রাগানোর জন্য বা ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলতাম, যেন সে আমার কথা শুনে চলে এবং আমার নিয়ন্ত্রণে থাকে। আর সবচেয়ে বড় কথা আমি জানতামও না যে রাগ করে বা না বুঝে এ ধরনের কথা বারবার বললে শরিয়তে তালাক হয়ে যায়। আমার কখনোই তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না।
"হুজুর, আমাদের দাম্পত্য জীবনে আমি মানসিকভাবে প্রচণ্ড কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছি। ওর অতীতের আচরণ ও কিছু বিষয় এতটাই কষ্টদায়ক ছিল যে তা আমার পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব ছিল। বিশেষ করে, একদিন আমি ওর ফোনে কিছু জিনিস দেখতে পাই, যা আমার জন্য একটা বিশাল মানসিক আঘাত ছিল। এছাড়া ও আমার অনেক কথা শুনত না, ডায়েট বা অনেক বিষয়ে আমার নিয়ন্ত্রণ মানত না।
এই চরম ক্ষোভ, মানসিক কষ্ট এবং ওকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার তীব্র তাগিদ থেকেই আমি রাগের মাথায় দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। এই আক্রোশ ও রাগ থেকেই আমি রাগের মাথায় একাধিকবার মুখে 'ছেড়ে দিলাম' এবং মাঝে মাঝে 'ডিভোর্স দিয়ে দেব' এজাতীয় কথাগুলো অনেকবার বলে ফেলেছি এবং গায়েও হাত তুলেছি।
তবে আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, এই কথাগুলো বারবার বলার সময় আমার মনে বিন্দুমাত্রও শরিয়তসম্মত উপায়ে তালাক দেওয়ার বা চিরতরে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলার কোনো নিয়ত বা উদ্দেশ্য ছিল না। আমার উদ্দেশ্য কখনোই সংসার ভেঙে দেওয়া ছিল না; আমার উদ্দেশ্য ছিল কেবল ওকে চরম রাগ দেখানো, ভয় দেখানো এবং নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা, যাতে ও আর এই ধরণের মারাত্মক ভুলগুলো না করে। তখন আমি জানতামও না যে রাগ করে বা না বুঝে এ ধরনের কথা বারবার বললে শরিয়তে তালাক হয়ে যায়। আমার কখনোই তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না।
এখন আমার এই পুরো পটভূমি, মানসিক আঘাত, বারবার কথাটি বলার অভ্যাস এবং আমার মূল নিয়ত (যেখানে তালাকের কোনো উদ্দেশ্য ছিল না, কেবল চরম রাগ ও ভয় দেখানো ছিল)—এগুলো বিবেচনা করে শরিয়তের সঠিক বিধান ও ফতোয়া কী হবে, দয়া করে আমাকে জানিয়ে বাধিত করবেন।"
আর সবচেয়ে বড় কথা আমি জানতামই না যে ছেড়ে দিলাম বললে কী হয় আর ছেড়ে দিলাম কথা টা মনেহয় অনেকবার বলেছি আবার মনেহয় বলি নাই আবার বলেছি মনেহইলে কোনদিন বলেছি স্পষ্ট মনেও পড়ে না কিন্তু পরশু যে বলেছি এটা স্পষ্ট মনে আছে আমার স্ত্রী ও মনে করতে পারতাছে না ছেড়ে দিলাম আগে বলেছি কী না আগে বললেও কতবার বলেছি কিন্তু পরশু এই কথা বলার পর আমার স্পষ্ট মনে আছে আমার স্ত্রী আমাকে আটকাইছে কিন্তু আগে এই কথা বলার পর আমার স্ত্রী আমাকে আটকাইছে কি না আমার স্পষ্ট মনে নাই আমার স্ত্রী পরশু বলছে মনেহয় অনেকবার বলেছি কালকে আবার বলে বলেছি কী না বা কয়বার বলেছি কিচ্ছু মনে পড়তাছে না আমার ও কিচ্ছু মনে পড়তাছে না

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আপনার বর্ণনা অনুযায়ী আপনি রাগের মাথায় একাধিকবার "ছেড়ে দিলাম" বা "ডিভোর্স দিয়ে দেব" জাতীয় কথা বলেছেন, কিন্তু আপনার কোনো তালাকের নিয়ত ছিল না। আপনি জানতেনও না যে এ ধরনের কথা বললে তালাক হয়ে যায়। এখন আপনি জানতে চান শরিয়তের বিধান কী।

নিচে কুরআন, সুন্নাহ এবং প্রখ্যাত ফকীহদের মতামতের ভিত্তিতে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


১. তালাকের মূল ভিত্তি: নিয়ত ও ইচ্ছা

তালাক একটি গুরুতর বিষয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের অন্তরের কথা (ওয়াসওয়াসা) ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা বলে বা আমল করে।" — সহীহ বুখারী (৫২৬৯), সহীহ মুসলিম (১২৭)

আরও ইরশাদ হয়েছে:

"নিশ্চয়ই আমলসমূহ নিয়তের উপর নির্ভরশীল, এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়ত করেছে।" — সহীহ বুখারী (১), সহীহ মুসলিম (১৯০৭)

তালাকের ক্ষেত্রে নিয়ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন: "তালাকের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয় ব্যক্তির নিয়ত ও উদ্দেশ্যকে।" (মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩৩/৯০)


২. তালাকের প্রকারভেদ ও আপনার পরিস্থিতির বিশ্লেষণ

(ক) স্পষ্ট তালাক (তালাকুন সারীহ) — যেমন "ছেড়ে দিলাম", "তালাক দিলাম"

হাম্বলী মাযহাব অনুযায়ী, স্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করলে নিয়ত ছাড়াও তালাক পতিত হয়। ইমাম ইবনু কুদামাহ রহ. বলেন: "স্পষ্ট তালাকের শব্দে নিয়তের প্রয়োজন নেই, কারণ শব্দটিই তালাকের অর্থ বহন করে।" (আল-মুগনী, ৭/৩০০)

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রয়েছে যা ইবনু তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এবং শাইখ ইবনু উসাইমীন রহ. সমর্থন করেছেন:

(খ) রাগের মাথায় তালাক (তালাকুল গাদবান)

রাগের মাথায় তালাকের বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হাম্বলী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত হলো: রাগের মাথায় তালাক পতিত হয়, যদি রাগ এতটা না হয় যে ব্যক্তির বিবেক বিলুপ্ত হয়ে যায়।

ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রহ. এবং ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এই মত পোষণ করেন যে, যদি রাগ এতটা তীব্র হয় যে ব্যক্তি কী বলছে তা বুঝতে পারে না, তাহলে তালাক পতিত হয় না। ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন: "যদি রাগ এতটা তীব্র হয় যে ব্যক্তির বিবেক-বুদ্ধি লোপ পায় এবং সে যা বলছে তা জানে না, তাহলে তার তালাক পতিত হয় না।" (ইগাসাতুল লাহফান, ১/৪৫)

(গ) ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে তালাকের কথা বলা

আপনি বলেছেন আপনার উদ্দেশ্য ছিল ভয় দেখানো, সংসার ভাঙা নয়। এখানে দুটি দিক রয়েছে:

প্রথম দিক: যদি আপনি "ছেড়ে দিলাম" বা "তালাক দিলাম" এর মতো স্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করেন, তাহলে হাম্বলী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী নিয়ত ছাড়াও তালাক পতিত হয়। কারণ শব্দটি স্পষ্ট।

দ্বিতীয় দিক: কিন্তু ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রহ. এর একটি গুরুত্বপূর্ণ মত রয়েছে। তিনি বলেন: "যদি কেউ তালাকের কথা বলে কিন্তু তার অন্তরে তালাকের ইচ্ছা না থাকে, বরং সে শুধু ভয় দেখাতে চায়, তাহলে তার তালাক পতিত হবে না।" (মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩৩/৯০-৯১)

শাইখ ইবনু উসাইমীন রহ. এই মতকে সমর্থন করেন এবং বলেন: "তালাকের ক্ষেত্রে নিয়ত শর্ত। যদি কেউ শুধু ভয় দেখানোর জন্য তালাকের কথা বলে, কিন্তু তালাকের ইচ্ছা না থাকে, তাহলে তালাক পতিত হয় না।" (আশ-শারহুল মুমতি, ১৩/৬৫)


৩. আপনার পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:

  1. আপনার তালাকের নিয়ত ছিল না — আপনি আল্লাহর নামে কসম করে বলেছেন।
  2. আপনি জানতেন না যে এ ধরনের কথা বললে তালাক হয়ে যায়।
  3. আপনার উদ্দেশ্য ছিল ভয় দেখানো ও রাগ প্রকাশ করা, সংসার ভাঙা নয়।
  4. আপনি রাগের চরম মুহূর্তে ছিলেন — মানসিকভাবে প্রচণ্ড চাপে ছিলেন।

এই পরিস্থিতিতে শাইখ ইবনু উসাইমীন রহ. এবং ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রহ. এর মত অনুযায়ী, যেহেতু আপনার তালাকের নিয়ত ছিল না এবং আপনি জানতেন না, তাই তালাক পতিত হয়নি।

শাইখ ইবনু উসাইমীন রহ. কে এমন এক ব্যক্তির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে রাগের মাথায় তালাকের কথা বলে কিন্তু নিয়ত ছিল না। তিনি উত্তর দেন: "তালাক পতিত হয় না, কারণ তালাকের জন্য নিয়ত শর্ত।" (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব, তালাক অধ্যায়)


৪. তবে একটি সতর্কতা

যদিও উপরের মত অনুযায়ী তালাক পতিত হয়নি, তবে আপনাকে অবশ্যই আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"মুসলিম সেই ব্যক্তি যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।" — সহীহ বুখারী (১০)

আপনি আপনার স্ত্রীর উপর হাত তুলেছেন — এটিও একটি গুরুতর অন্যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আর তাদের (স্ত্রীদের) উপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে, তাদেরও তোমাদের উপর অধিকার রয়েছে।" — সূরা আল-বাকারাহ: ২২৮

রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনো কোনো স্ত্রীকে মারেননি। (সহীহ মুসলিম)


৫. সন্দেহের বিষয়টি (কতবার বলেছেন)

আপনি বলেছেন আপনি নিশ্চিত নন কতবার বলেছেন, আপনার স্ত্রীও নিশ্চিত নন। ইসলামী বিধান অনুযায়ী:

"সন্দেহের কারণে কোনো কিছু প্রমাণিত হয় না।" (ফিকহী মূলনীতি)

যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন কতবার বলেছেন এবং আপনার নিয়ত ছিল না, তাই আপনি ধরে নেবেন যে তালাক পতিত হয়নি। তবে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন।


৬. চূড়ান্ত ফতোয়া

শাইখ ইবনু উসাইমীন ও ইবনু তাইমিয়্যাহ রহ. এর মত অনুযায়ী:

  1. যেহেতু আপনার তালাকের নিয়ত ছিল না, শুধু ভয় দেখানো ও রাগ প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল — তালাক পতিত হয়নি।
  2. যেহেতু আপনি জানতেন না যে এ ধরনের কথা বললে তালাক হয় — এটি আপনার জন্য ওজর (অজুহাত)।
  3. যেহেতু আপনি সন্দেহে আছেন কতবার বলেছেন — সন্দেহের কারণে তালাক প্রমাণিত হয় না।

তাই আপনার বিবাহ এখনও বহাল আছে। আপনাকে নতুন করে বিয়ে করতে হবে না।

তবে আল্লাহর কাছে তাওবা করুন, স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চান, এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আর তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা কর, হে মুমিনগণ! যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।" — সূরা আন-নূর: ৩১


৭. পরামর্শ

  1. ভবিষ্যতে রাগের সময় মুখে তালাকের কথা বলবেন না — এমনকি রাগের মাথায়ও।
  2. স্ত্রীর সাথে সদাচরণ করুন — আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর।" (সূরা আন-নিসা: ১৯)
  3. রাগ নিয়ন্ত্রণ করুন — রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "প্রকৃত বীর সেই ব্যক্তি যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে।" (সহীহ বুখারী, ৬১১৪)
  4. প্রয়োজনে একজন বিশ্বস্ত আলেমের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন — কারণ আপনার পরিস্থিতি ব্যক্তিগতভাবে বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন।

মূল কথা: আপনার তালাক পতিত হয়নি, ইনশাআল্লাহ। আপনার বিবাহ বহাল আছে। তবে তাওবা করুন এবং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.