শাফি'ঈ মাযহাবের আলোকে রাগের মাথায় বারবার "ছেড়ে দিলাম" ও "ডিভোর্স দিয়ে দেব" বললে কি তালাক হয়ে যায়?

Marriage and Divorce · Shafei

Question No: 7800
Questioner: Arafat Hussain
Question Asked: 02 Nov 2026, 02:29 PM
Reviewed & Published: 02 Nov 2026, 03:42 PM
Views: 16
Tokens: 12,262
This answer is according to the 'Shafei' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুআলাইকুম আমি নতুন বিয়ে করছি এক মাস হইছে আমি ওর অতীত এর একটা জিনিস নিয়ে খুব বিরক্ত ছিলাম তাই আমাদের দাম্পত্য জীবনে বিভিন্ন সময় রাগারাগি ও উত্তেজনার মুহূর্তে আমি রাগের মাথায় একাধিকবার আমার স্ত্রীকে 'ছেড়ে দিলাম' এবং মাঝে মাঝে 'ডিভোর্স দিয়ে দেব বা ডিভোর্স লেটার পাঠাব'—এজাতীয় কথাগুলো অনেকবার বলে ফেলেছি।
তবে আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, এই কথাগুলো বারবার বলার সময় আমার মনে বিন্দুমাত্রও তালাক দেওয়ার বা চিরতরে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলার কোনো নিয়ত বা উদ্দেশ্য ছিল না। আমার উদ্দেশ্য কখনোই সংসার ভেঙে দেওয়া ছিল না; আমি কেবল তাকে রাগানোর জন্য বা ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলতাম, যেন সে আমার কথা শুনে চলে এবং আমার নিয়ন্ত্রণে থাকে। আর সবচেয়ে বড় কথা আমি জানতামও না যে রাগ করে বা না বুঝে এ ধরনের কথা বারবার বললে শরিয়তে তালাক হয়ে যায়। আমার কখনোই তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না।
"হুজুর, আমাদের দাম্পত্য জীবনে আমি মানসিকভাবে প্রচণ্ড কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছি। ওর অতীতের আচরণ ও কিছু বিষয় এতটাই কষ্টদায়ক ছিল যে তা আমার পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব ছিল। বিশেষ করে, একদিন আমি ওর ফোনে কিছু জিনিস দেখতে পাই, যা আমার জন্য একটা বিশাল মানসিক আঘাত ছিল। এছাড়া ও আমার অনেক কথা শুনত না, ডায়েট বা অনেক বিষয়ে আমার নিয়ন্ত্রণ মানত না।
এই চরম ক্ষোভ, মানসিক কষ্ট এবং ওকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার তীব্র তাগিদ থেকেই আমি রাগের মাথায় দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। এই আক্রোশ ও রাগ থেকেই আমি রাগের মাথায় একাধিকবার মুখে 'ছেড়ে দিলাম' এবং মাঝে মাঝে 'ডিভোর্স দিয়ে দেব' এজাতীয় কথাগুলো অনেকবার বলে ফেলেছি এবং গায়েও হাত তুলেছি।
তবে আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, এই কথাগুলো বারবার বলার সময় আমার মনে বিন্দুমাত্রও শরিয়তসম্মত উপায়ে তালাক দেওয়ার বা চিরতরে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলার কোনো নিয়ত বা উদ্দেশ্য ছিল না। আমার উদ্দেশ্য কখনোই সংসার ভেঙে দেওয়া ছিল না; আমার উদ্দেশ্য ছিল কেবল ওকে চরম রাগ দেখানো, ভয় দেখানো এবং নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা, যাতে ও আর এই ধরণের মারাত্মক ভুলগুলো না করে। তখন আমি জানতামও না যে রাগ করে বা না বুঝে এ ধরনের কথা বারবার বললে শরিয়তে তালাক হয়ে যায়। আমার কখনোই তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না।
এখন আমার এই পুরো পটভূমি, মানসিক আঘাত, বারবার কথাটি বলার অভ্যাস এবং আমার মূল নিয়ত (যেখানে তালাকের কোনো উদ্দেশ্য ছিল না, কেবল চরম রাগ ও ভয় দেখানো ছিল)—এগুলো বিবেচনা করে শরিয়তের সঠিক বিধান ও ফতোয়া কী হবে, দয়া করে আমাকে জানিয়ে বাধিত করবেন।"
আর সবচেয়ে বড় কথা আমি জানতামই না যে ছেড়ে দিলাম বললে কী হয় আর ছেড়ে দিলাম কথা টা মনেহয় অনেকবার বলেছি আবার মনেহয় বলি নাই আবার বলেছি মনেহইলে কোনদিন বলেছি স্পষ্ট মনেও পড়ে না কিন্তু পরশু যে বলেছি এটা স্পষ্ট মনে আছে আমার স্ত্রী ও মনে করতে পারতাছে না ছেড়ে দিলাম আগে বলেছি কী না আগে বললেও কতবার বলেছি কিন্তু পরশু এই কথা বলার পর আমার স্পষ্ট মনে আছে আমার স্ত্রী আমাকে আটকাইছে কিন্তু আগে এই কথা বলার পর আমার স্ত্রী আমাকে আটকাইছে কি না আমার স্পষ্ট মনে নাই আমার স্ত্রী পরশু বলছে মনেহয় অনেকবার বলেছি কালকে আবার বলে বলেছি কী না বা কয়বার বলেছি কিচ্ছু মনে পড়তাছে না আমার ও কিচ্ছু মনে পড়তাছে না

Answer

বিস্তারিত ফতোয়া: রাগের মাথায় বারবার "ছেড়ে দিলাম" ও "ডিভোর্স দিয়ে দেব" বলার বিধান

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

প্রিয় ভাই, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আমি শাফি'ঈ মাযহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের আলোকে ধাপে ধাপে বিধানটি বর্ণনা করছি। আল্লাহ তাওফিক দান করুন।


১. মূল নীতি: তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য কী শর্ত?

শাফি'ঈ মাযহাব অনুযায়ী, স্পষ্ট শব্দে (সরীহ) তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য নিয়ত (কাসদ) শর্ত নয়; বরং শুধু ইচ্ছাকৃতভাবে (اختيار) উচ্চারণ করাই যথেষ্ট। কিন্তু ইঙ্গিতবাচক (কিনায়া) শব্দে তালাক সংঘটিত হতে নিয়ত বা قرينة (পরিস্থিতি) আবশ্যক।

ইমাম নববী (রহ.) «المجموع» -এ বলেন:

«فَأَمَّا صَرِيحُ الطَّلَاقِ فَلَا يَحْتَاجُ إِلَى نِيَّةٍ بَلْ يَقَعُ بِاللَّفْظِ مَعَ الْقَصْدِ إِلَى اللَّفْظِ» — (المجموع شرح المهذب، كتاب الطلاق)

অর্থাৎ সরীহ তালাকের শব্দে নিয়ত লাগে না; শুধু শব্দটি ইচ্ছাকৃতভাবে বলা হলেই তালাক পতিত হয়।

ইমাম শাফি'ঈ (রহ.) «الأم» -এ বলেন:

«وَلَوْ قَالَ: أَنْتِ طَالِقٌ، وَلَمْ يُرِدْ الطَّلَاقَ، وَقَعَ الطَّلَاقُ» — (الأم، باب الطلاق)


২. "ছেড়ে দিলাম" (تركتك / خليتك) — কোন ধরনের শব্দ?

শাফি'ঈ মাযহাবের মু'তামাদ (নির্ভরযোগ্য) মত অনুযায়ী "تركتك" (তোমাকে ছেড়ে দিলাম) শব্দটি সরীহ তালাক নয়, বরং এটি কিনায়া (ইঙ্গিতবাচক) শব্দ। কারণ এটি তালাক ছাড়াও অন্য অর্থে (যেমন: পরিত্যাগ করা, উপেক্ষা করা) ব্যবহৃত হয়।

ইবন হাজার আল-হাইতামী (রহ.) «تحفة المحتاج» -এ বলেন:

«وَمِنْ الْكِنَايَاتِ: اتْرُكِيهِ، وَخَلِّي سَبِيلَهُ... وَلَا يَقَعُ بِهَا إِلَّا بِنِيَّةٍ أَوْ قَرِينَةٍ» — (تحفة المحتاج، كتاب الطلاق)

ইমাম রমলী (রহ.) «نهاية المحتاج» -এ একই মত দিয়েছেন।

সুতরাং "ছেড়ে দিলাম" শব্দে তালাক পতিত হতে নিয়ত বা قرينة (পরিস্থিতিগত প্রমাণ) আবশ্যক। আপনি কসম করে বলেছেন আপনার তালাকের নিয়ত ছিল না — তাহলে এই শব্দে তালাক পতিত হয়নি।


৩. "ডিভোর্স দিয়ে দেব" / "ডিভোর্স লেটার পাঠাব" — ভবিষ্যৎবাচক শব্দ

এগুলো ভবিষ্যৎবাচক (وعد بالطلاق) বাক্য — "দিয়ে দেব", "পাঠাব"। শাফি'ঈ মাযহাব অনুযায়ী ভবিষ্যতে তালাক দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বা হুমকি তালাক সংঘটিত করে না।

ইমাম নববী (রহ.) «روضة الطالبين» -এ বলেন:

«لَوْ قَالَ: سَأُطَلِّقُكِ، أَوْ سَأُطَلِّقُكِ غَدًا، لَمْ يَقَعْ طَلَاقٌ بِلَا خِلَافٍ» — (روضة الطالبين، كتاب الطلاق)

অর্থাৎ "আমি তোমাকে তালাক দেব" বা "আগামীকাল দেব" বললে কোনো তালাক পতিত হয় না — এতে কোনো মতভেদ নেই।

সুতরাং "ডিভোর্স দিয়ে দেব" বা "ডিভোর্স লেটার পাঠাব" — এই ধরনের বাক্যে তালাক পতিত হয়নি।


৪. রাগের অবস্থায় তালাক — শাফি'ঈ বিধান

শাফি'ঈ মাযহাব অনুযায়ী রাগের অবস্থায় তালাক পতিত হয়, যদি রাগ এতটা না হয় যে ব্যক্তির বিবেক-বুদ্ধি লোপ পায় (যেমন: পাগল হয়ে যায়)। কিন্তু সাধারণ রাগ (যা বিবেক বজায় থাকে) তালাক প্রতিরোধ করে না।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: যেহেতু আপনার ব্যবহৃত শব্দগুলো (ছেড়ে দিলাম, ডিভোর্স দিয়ে দেব) সরীহ তালাক নয় — বরং কিনায়া ও ভবিষ্যৎবাচক — তাই রাগের বিষয়টি এখানে মুখ্য নয়; বরং নিয়তের অনুপস্থিতি এবং শব্দের ধরন-ই মূল নির্ধারক।


৫. সন্দেহ ও ভুলে যাওয়ার বিষয় (শাক্ক)

আপনি বলেছেন — কতবার বলেছেন, আগে বলেছিলেন কিনা, স্ত্রী আটকেছিলেন কিনা — এসব স্পষ্ট মনে নেই। ইসলামের মূলনীতি হলো:

«الْأَصْلُ بَقَاءُ الْعِصْمَةِ» — মূল অবস্থা হলো বিবাহ-বন্ধন বহাল থাকা।

ইমাম নববী (রহ.) «الأشباه والنظائر» -এ বলেন:

«الْأَصْلُ بَقَاءُ مَا كَانَ عَلَى مَا كَانَ، فَلَا يُحْكَمُ بِزَوَالِهِ بِالشَّكِّ» — (الأشباه والنظائر، القاعدة الثالثة)

অর্থাৎ সন্দেহের কারণে বিদ্যমান অবস্থা (বিবাহ) বিলুপ্ত বলে حکم দেওয়া যাবে না। যেহেতু তালাকের সংখ্যা ও শব্দের ধরন নিয়ে সন্দেহ আছে, এবং শব্দগুলো মূলত কিনায়া/ভবিষ্যৎবাচক — তালাক পতিত হয়নি বলে حکم দেওয়াই শাফি'ঈ মাযহাবের মূলনীতি অনুযায়ী অগ্রগণ্য।


৬. চূড়ান্ত ফতোয়া (خلاصة الحكم)

উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে শাফি'ঈ মাযহাব অনুযায়ী সিদ্ধান্ত:

| বিষয় | বিধান | |---|---| | "ছেড়ে দিলাম" (تركتك) | কিনায়া শব্দ — নিয়ত/قرينة ছাড়া তালাক হয় না। আপনার নিয়ত ছিল না → তালাক পতিত হয়নি | | "ডিভোর্স দিয়ে দেব / লেটার পাঠাব" | ভবিষ্যৎবাচক ওয়াদা — তালাক পতিত হয় না | | রাগের অবস্থা | সাধারণ রাগ তালাক প্রতিরোধ করে না, তবে এখানে শব্দই সরীহ নয় | | সন্দেহ (কতবার বলেছেন) | সন্দেহে বিবাহ বহাল থাকে — তালাক প্রমাণিত নয় |

সারসংক্ষেপ: আপনার বিবাহ-বন্ধন বহাল আছে (إن شاء الله)। আপনার স্ত্রী আপনার জন্য হালাল। তবে এ ধরনের শব্দ মুখে আনা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।


৭. গুরুত্বপূর্ণ নসীহত

১. রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «لَا يَغْضَبْ أَحَدُكُمْ فَيُطَلِّقَ» — "তোমাদের কেউ যেন রাগের বশে তালাক না দেয়।" (মুসলিম)

২. গায়ে হাত তোলা সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ বলেন: «وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ» — "তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা নিসা: ১৯)

৩. তালাকের শব্দ মুখে আনা থেকে বিরত থাকুন — এমনকি রাগ দেখানোর জন্যও নয়। কারণ কোনো কোনো আলিমের মতে কিনায়া শব্দেও قرينة থাকলে তালাক পতিত হতে পারে।

৪. স্ত্রীর অতীত নিয়ে কষ্ট — এটি সমাধানের জন্য পরামর্শ ও সালাতুল ইস্তিখারা করুন; তবে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন ইসলামে নিষিদ্ধ।

৫. নিশ্চিত হতে চাইলে — স্থানীয় নির্ভরযোগ্য শাফি'ঈ আলিমের সাথে সরাসরি বসে বিস্তারিত আলোচনা করুন।


والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.