পরকীয়া করলে স্বামী কি স্ত্রীর ওপর জুলুম করে? স্ত্রীর হক নষ্ট হয় কি?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
পরকীয়া ও স্ত্রীর হক: ইসলামী দৃষ্টিকোণ
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: স্বামী পরকীয়া করলে তা স্ত্রীর ওপর জুলুম ও তার হক নষ্ট হয় কি না; আর স্ত্রী আল্লাহর কাছে এর বিচার চাইলে তা জুলুম হিসেবে গণ্য হবে কি না।
১. পরকীয়া কি স্ত্রীর হক নষ্ট করে ও জুলুম?
হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে। ইসলামে পরকীয়া মহাপাপ, আর বিবাহিত অবস্থায় তা আরও ঘৃণ্য। এটি শুধু আল্লাহর হক নয়, বরং স্ত্রীর হকও লঙ্ঘন করে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ "আর নারীদের রয়েছে পুরুষদের ওপর এমন অধিকার, যেমন পুরুষদের রয়েছে নারীদের ওপর, ন্যায়সংগতভাবে।" (সূরা বাকারা: ২২৮)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা নিসা: ১৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا، وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِهِمْ خُلُقًا» "মুমিনদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বাধিক পূর্ণ ঈমানদার, যার চরিত্র সর্বোত্তম; আর তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যিনি নিজের স্ত্রীর প্রতি আচরণে সর্বোত্তম।" (তিরমিজি: ১১৬২)
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে: পরকীয়া করা স্বামী আল্লাহর হক এবং স্ত্রীর হক (সততা, বিশ্বস্ততা ও সহবাসের অধিকার) — উভয়ই লঙ্ঘন করে। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ স্ত্রীর ভরণপোষণ ও সদাচারের বাধ্যবাধকতা আলোচনা করতে গিয়ে স্পষ্ট করেছেন যে, স্বামীর ওপর স্ত্রীর হক আদায় করা ওয়াজিব; আর অন্য নারীর প্রতি আসক্ত হয়ে স্ত্রীর হক অবহেলা করা সুস্পষ্ট জুলুম। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৭৩ প্রসঙ্গ)
২. স্ত্রী আল্লাহর কাছে বিচার চাইলে তা কি জুলুম হবে?
না, কখনোই জুলুম হবে না। বরং এটি মজলুমের বৈধ অধিকার — আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করা, যা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত:
لَا يُحِبُّ اللَّهُ الْجَهْرَ بِالسُّوءِ مِنَ الْقَوْلِ إِلَّا مَنْ ظُلِمَ "আল্লাহ প্রকাশ্যে মন্দ কথা বলা পছন্দ করেন না, তবে যে জুলুমের শিকার হয়েছে (সে ব্যতিক্রম)।" (সূরা নিসা: ১৪৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ মুয়াজ (রা.)-কে বলেছিলেন:
«وَاتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ، فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ» "মজলুমের দুআ থেকে সাবধান; কারণ তার ও আল্লাহর মধ্যে কোনো পর্দা নেই।" (বুখারি: ১৪৯৬; মুসলিম: ১৯)
সুতরাং স্ত্রী যদি আল্লাহর কাছে স্বামীর জুলুমের বিচার প্রার্থনা করেন, তবে তা মজলুমের দুআ — যা সম্পূর্ণ বৈধ ও কবুলযোগ্য। এতে কোনো জুলুম নেই; বরং জুলুম তো স্বামীর পক্ষ থেকেই হচ্ছে।
তবে মনে রাখতে হবে:
- দুআ ও আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করা বৈধ।
- স্বামীকে গালি দেওয়া, সমাজে অপমান করা বা অপপ্রচার করা বৈধ নয়; এতে স্ত্রী নিজেই সীমালঙ্ঘনকারী হবেন।
- শরীয়তসম্মত পথে (পরিবারের বড়দের মাধ্যমে বোঝানো, সালিশ, প্রয়োজনে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত) সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।
৩. পরকীয়ার সময়টুকুর বিচার
স্বামী যতদিন পরকীয়া করেছে, ততদিন সে স্ত্রীর হক (সহবাস, স্নেহ, বিশ্বস্ততা, ভরণপোষণে অবহেলা) নষ্ট করেছে। কিয়ামতের দিন প্রতিটি হকের হিসাব হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَتُؤَدُّنَّ الْحُقُوقَ إِلَى أَهْلِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ» "কিয়ামতের দিন অবশ্যই প্রত্যেক হকদারকে তার হক ফিরিয়ে দেওয়া হবে।" (মুসলিম: ২৫৮২)
তাই স্ত্রীর জন্য আল্লাহর কাছে এই বিচার প্রার্থনা করা সম্পূর্ণ ন্যায্য। তবে উত্তম পথ হলো: সবর, দুআ, সংশোধনের চেষ্টা — সাথে সাথে নিজের হক আদায়ের বৈধ দাবি জানানো। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" (সূরা তালাক: ২)