স্বামীর সাথে তিন মাস যোগাযোগ নেই, মানসিক নির্যাতন ও নাফকা না পাওয়ার অবস্থায় একজন স্ত্রীর করণীয় কী?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আপনার দীর্ঘ ও কষ্টময় প্রশ্নটি পড়ে বুঝতে পারছি আপনি কঠিন মানসিক চাপের মধ্যে আছেন। আল্লাহ তাআলা আপনার সব কষ্ট দূর করুন এবং আপনার জন্য সর্বোত্তম ফয়সালা দিন। আমিন।
প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার: আপনার প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনাগুলো মূলত পারিবারিক ও মানসিক কষ্টের বিবরণ। এখানে শরীয়তের দৃষ্টিতে কয়েকটি দিক আছে—(১) স্বামীর সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ, (২) নাফকা (ভরণপোষণ), (৩) শারীরিক নিরাপত্তা, (৪) ইস্তেখারা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ। নিচে কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে আলোচনা করছি।
১. স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ও যোগাযোগ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা নিসা: ১৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।" (তিরমিজি: ৩৮৯৫)
আপনার স্বামী তিন মাস কথা বন্ধ রাখা, রাগের সময় জিনিস ছুঁড়ে মারা—এসব ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। রাগ নিয়ন্ত্রণ করা ঈমানের অংশ। রাসূল ﷺ বলেছেন:
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ "শক্তিশালী সেই নয় যে কুস্তিতে জেতে; বরং শক্তিশালী সেই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে।" (বুখারি: ৬১১৪)
তবে আপনার ওপরও দায়িত্ব আছে—সর্বোচ্চ ধৈর্য ও হিকমতের সাথে সমাধানের চেষ্টা করা। আল্লাহ বলেন:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا "যদি তোমরা তাদের (স্বামী-স্ত্রীর) মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে তার পরিবার থেকে একজন এবং তার (স্ত্রীর) পরিবার থেকে একজন মধ্যস্থতাকারী পাঠাও।" (সূরা নিসা: ৩৫)
এখানে করণীয়: আপনার বাবা ইতিমধ্যে ফোন করেছেন—এটি ভালো উদ্যোগ। এখন উভয় পরিবারের সম্মানিত ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের নিয়ে একটি বৈঠক হওয়া উচিত (হাকাম/মধ্যস্থতাকারী পদ্ধতি)। আপনি সরাসরি একা একা সিদ্ধান্তে না গিয়ে পরিবারের বড়দের মাধ্যমে কথা বলুন।
২. নাফকা (ভরণপোষণ) প্রসঙ্গে
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, স্বামীর ওপর স্ত্রীর নাফকা (খাবার, বাসস্থান, পোশাক) ওয়াজিব—যদি শরীয়তসম্মতভাবে বিবাহ বহাল থাকে এবং স্ত্রী স্বামীর কাছে থাকতে রাজি থাকে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, নাফকা ওয়াজিব হওয়ার জন্য স্বামীর সামর্থ্য থাকা শর্ত।
আপনি লিখেছেন আপনার হাতখরচ আপনার বাবা দেন। এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে আদর্শ নয়—স্বামীর সামর্থ্য থাকলে তারই দেওয়া উচিত। তবে যেহেতু তিনি ছাত্র ও আর্থিকভাবে দুর্বল, সেহেতু বর্তমানে বাবার সহায়তা নেওয়াতে গুনাহ নেই, তবে স্বামী সামর্থ্যবান হলে ভবিষ্যতে তার দায়িত্ব নিতে হবে।
রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ৩, নাফকার অধ্যায়; আল-হিদায়া, কিতাবুন নাফাকা।
৩. শারীরিক নিরাপত্তা ও ভয়
স্বামী রাগের সময় জিনিস ছুঁড়ে মারে—এটি শরীয়তসম্মত নয় এবং এটি নির্যাতনের শামিল হতে পারে। ইসলামে স্ত্রীর ওপর কোনো প্রকার শারীরিক নির্যাতন নিষিদ্ধ। রাসূল ﷺ কখনো কোনো স্ত্রী বা খাদিমকে মারেননি (সহিহ মুসলিম)।
তবে তালাকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই ধৈর্য, ইস্তেখারা, এবং উভয় পরিবারের মধ্যস্থতা—এই তিনটি ধাপ শেষ করা উচিত। হঠাৎ আবেগে তালাক চাওয়া বা সম্পর্ক ছিন্ন করা ঠিক নয়।
৪. ইস্তেখারা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ
আপনি ইস্তেখারা পড়ছেন—এটি খুব ভালো কাজ। ইস্তেখারার পরও যদি কোনো দিক স্পষ্ট না হয়, তবে:
- ইস্তেখারা চালিয়ে যান (কমপক্ষে ৭ দিন বা ৪০ দিন পর্যন্ত)।
- ইস্তিশারা (পরামর্শ) করুন—বিশ্বস্ত আলেম, বুদ্ধিমান পরিবারের সদস্য, বা অভিজ্ঞ কারও সাথে।
- শরীয়তের সীমা মেনে সিদ্ধান্ত নিন—অর্থাৎ যদি স্বামী তালাক দেয় বা আপনি খুলআ চান, তা শরীয়তসম্মত পন্থায় হতে হবে।
খুলআ প্রসঙ্গে: হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, স্ত্রী স্বামীর সম্মতি ছাড়া সরাসরি খুলআ করতে পারে না; তবে কাজি/আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ চাওয়া যেতে পারে যদি স্বামী নাফকা না দেয় বা নির্যাতন করে। রাদ্দুল মুহতার ও ফাতাওয়া আলমগিরি-তে এ বিষয়ে বিস্তারিত আছে।
৫. আপনার করণীয়—ধাপে ধাপে
- ধৈর্য ধরুন ও দোয়া চালিয়ে যান। আল্লাহ বলেন: "হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও।" (সূরা বাকারা: ১৫৩)
- পরিবারের মাধ্যমে যোগাযোগ করুন। আপনার বাবা যেহেতু ফোন করেছেন, এখন উভয় পরিবারের সম্মানিত ব্যক্তিদের নিয়ে একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করুন। সরাসরি একা একা সিদ্ধান্ত নেবেন না।
- স্বামীর সাথে একান্তে কথা বলার সুযোগ চান—কিন্তু নিরাপদ পরিবেশে, পরিবারের উপস্থিতিতে। তার মনোভাব, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নাফকার দায়িত্ব—এসব স্পষ্টভাবে জানুন।
- শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। যদি স্বামী জিনিস ছুঁড়ে মারার অভ্যাস রাখে, তাহলে একা তার কাছে যাবেন না।
- ইস্তেখারা ও ইস্তিশারা চালিয়ে যান। সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সময় লাগলে তা স্বাভাবিক।
৬. একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
আপনি আপনার শ্বশুরের ব্যক্তিগত রোগ ও পরিবারের অন্যান্য ব্যক্তিগত বিষয় উল্লেখ করেছেন। শরীয়তের দৃষ্টিতে কারও ব্যক্তিগত দোষ প্রকাশ করা (গীবত) নিষিদ্ধ। এ ধরনের বিষয় প্রকাশ্যে না লিখে শুধু বিশ্বস্ত পরামর্শদাতার সাথে আলোচনা করুন। আল্লাহ বলেন:
وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا "তোমরা একে অপরের গীবত করো না।" (সূরা হুজুরাত: ১২)
সারসংক্ষেপ
আপনার বর্তমান অবস্থায় হঠাৎ কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (তালাক/বিচ্ছেদ) নেওয়া উচিত নয়। প্রথমে উভয় পরিবারের মধ্যস্থতায় একটি বৈঠক হোক, স্বামীর মনোভাব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা স্পষ্ট হোক, নাফকা ও নিরাপত্তার বিষয় নিশ্চিত হোক। এরপরও যদি স্বামী যোগাযোগ না করে, দায়িত্ব না নেয়, এবং নির্যাতন চলতে থাকে—তাহলে শরীয়তসম্মত পন্থায় (পরিবার ও আলেমের পরামর্শে) পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া যাবে। ইস্তেখারা ও দোয়া চালিয়ে যান, আল্লাহই সর্বোত্তম ফয়সালাকারী।
আল্লাহ তাআলা আপনার কষ্ট দূর করুন, আপনার অন্তরকে শান্তি দিন এবং আপনার জন্য কল্যাণকর ফয়সালা করুন। আমিন।