হাদিস পড়ে মনে বিরক্তি ও বাজে চিন্তা আসলে ঈমান কি নষ্ট হয়?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 7767
Questioner: Riha Moni
Question Asked: 02 Nov 2026, 02:52 AM
Reviewed & Published: 02 Nov 2026, 07:35 AM
Views: 10
Tokens: 10,939
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১)ফেসবুকে আমাদের নবী নিয়ে একটা ইসলামিক পোস্ট পড়তেছিলাম। ভালো পোস্ট। তখন আমার মনে অনেক প্রশ্ন চলে আসছে, আর অনেক বিরক্ত চলে আসছে। কারন এক এক হাদীস এ এক এক রকম লিখা থাকে। আমাদের মত সাধারণ মানুষ এর জন্য তো সব বুঝা কঠিন। তাই পোস্টে নবীর যে হাদিস টা লিখা ছিল, সেটা পরেই আমার মুলত মনের মধ্যে বিরক্ত চলে আসে। পরে আমি আবার ভাবতে থাকি মনে মনে এত বিরক্ত ভাব এমন করা তো আমার ঠিক হয় নাই৷ এখন আল্লাহ যদি আমাকে ধরেন? আমার ঈমান কি ঠিক আছে?

২) মনে মনে যে বিরক্ত হলাম সেই ইসলামিক পোস্ট টা পড়ে। নবীর হাদিস সেখানে যা লিখা ছিল ওটা নিয়ে৷ এটার জন্য কি ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?

৩) এগুলা ভাবতে ভাবতে মনে মনে আরো বাজে কথা বলে ফেলছি । নবীকে নিয়ে। আল্লাহ মাফ করুক। আমি মনে মনে এগুলা বলতেছি আবার মনে মনেই বলতেছি এমন না, এমন না। মানে এক মনে অইসব কথা আসতেছে, আরেক মনে আমি বলতেছি এমন না, এমন না। এখন আমার খুব খারাপ লাগতেছে হুজুর।আল্লাহ কি আমাকে ধরবেন?
আমার ঈমান কি ঠিক আছে?

৪)এগুলা করার পরে আমি নিজে নিজে ভাবতে থাকি আর মুখে উচ্চারণ করে বলি যে," আমি জাস্ট বিরক্ত হইছি। অন্য কোনো কিছু বলি নাই"। মানে সেই হাদিস টা পড়ে আমার বিরক্ত চলে আসছিলো। তাই এটা আমি মুখে উচ্চারণ করে বলি। নবীর হাদিস পড়ে বিরক্ত হয়ে মুখে এমন উচ্চারণ করা তে কি ঈমানের কোনো সমস্যা হবে?

৫)এখন মুখে "আমি তো জাস্ট বিরক্ত হইছি, অন্য কিছু বলি নাই"। এটা বলে, মনে মনে অন্য কথা বললে কি কোনো সমস্যা হবে? মানে মুখে এই কথা উচ্চারণ করে বললে, আর মনে মনে কার উপর কিসের উপর বিরক্ত হইছি সেটা বললে কি ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?

৬) মুখে উচ্চারণ করে - "আমি তো জাস্ট বিরক্ত হইছি, অন্য কিছু বলি নাই"। এটাই শুধু বলছি। এখন মুখে বলেছি "শুধু বিরক্ত হইছি" কিন্তু মনে মনে অন্য কিছু বলেছি। হাফ মুখে বললে, হাফ মনে মনে বললে । এখন কি মনের টা ধরা হবে? নাকি পুরো বাক্য স্পষ্ট ভাবে মুখে উচ্চারণ করলেই ধরা হবে?

৭)এতক্ষন মনে হচ্ছিল সব তো মনে মনেই বললাম। কোনো সমস্যা হবে না ইন শা আল্লাহ। কিন্তু এখন এই একটা কথা মুখে উচ্চারণ করে ফেলছি তাই চিন্তা হচ্ছে। আমি যে মুখে উচ্চারণ করে বললাম "আমি তো জাস্ট বিরক্ত হইছি, অন্য কিছু বলি নাই"। এখানে কার উপর কিসের উপর বিরক্ত হইছি সেটা উচ্চারণ করি নাই। এখন শুধু এটুকু কথা " আমি জাস্ট বিরক্ত হইছি " উচ্চারণ করার জন্য আমার ঈমানে কোনো সমস্যা হয়েছে?


৮) হাদিস পড়ে সেটা নিয়ে বিরক্ত হওয়া আমার কাছে অনেক বড় অপরাধ মনে হচ্ছে। কারন নবী যেটা বলেছেন সেটা পড়ে বিরক্ত কেন আসবে? আমার ঈমান কি ঠিক আছে?
৯) আমার ঈমান আর বিবাহিত জীবন ঠিক আছে?
১০) আপনার উত্তরের উপর আমল করতে পারব?

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে নিই: আপনার বর্ণনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, আপনি ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা)-তে ভুগছেন। এটি ঈমানের দুর্বলতা নয়; বরং এটি এমন একটি রোগ, যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই সাহাবীদের শিক্ষা দিয়েছেন। তাই ঘাবড়াবেন না, ইনশাআল্লাহ আপনার ঈমান ঠিক আছে। নিচে প্রশ্নগুলোর ধারাবাহিক উত্তর দিচ্ছি।


মূল নীতি (একটি কথায়)

মনে খারাপ কথা আসা ≠ নিজে বলা বা বিশ্বাস করা। হাদিসে এসেছে, সাহাবীরা বললেন, "আমরা মনে এমন কথা অনুভব করি, যা মুখে বলা বা বিশ্বাস করা আমাদের কাছে আগুনের চেয়েও কঠিন মনে হয়।" রাসূল ﷺ বললেন: "সেটি ঈমানের স্পষ্ট প্রমাণ (এবং শয়তান তা নষ্ট করতে পারে না)।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৩২; সহিহ বুখারি ৬৬৬০-এর সমার্থক)

আরও এসেছে: "নিশ্চয় আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের কুমন্ত্রণা ও ওয়াসওয়াসা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে মুখে বলে বা কাজে পরিণত করে।" (সহিহ বুখারি ৫২৬৯; সহিহ মুসলিম ১২৭)

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ ওয়াসওয়াসা প্রসঙ্গে বলেন, এগুলো শয়তানের পক্ষ থেকে আসে, এর দ্বারা নামাজ-রোজা বা ঈমান বাতিল হয় না; বরং এগুলো উপেক্ষা করাই কর্তব্য। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, ওয়াসওয়াসা অধ্যায়)


প্রশ্ন ১ ও ২: হাদিস পড়ে বিরক্তি ও মনে প্রশ্ন আসা

উত্তর: শুধু মনে বিরক্তি বা প্রশ্ন আসা — এতে ঈমানের কোনো ক্ষতি হয় না, যতক্ষণ না আপনি হাদিসকে মিথ্যা বলেন বা অবজ্ঞা করেন। আপনি নিজেই বলেছেন, পরে আফসোস করেছেন — এটাই প্রমাণ যে আপনার অন্তরে ঈমান জীবিত। মুমিনের অন্তরে শয়তান কুমন্ত্রণা ঢালে; সে তা প্রতিরোধ করে — এতে বরং সওয়াব হয়।

তবে সতর্কতা: হাদিসের ব্যাখ্যা না বুঝে পড়ে বিরক্ত হওয়া উচিত নয়। সাধারণ মুসলিমের কর্তব্য — নির্ভরযোগ্য আলেমের ব্যাখ্যা (যেমন মা'আরিফুল কুরআন, ইমদাদুল ফাতাওয়া) ছাড়া গভীর হাদিস-বিশ্লেষণে না ঢোকা। আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমরা জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো, যদি না জানো।" (সূরা নাহল: ৪৩)


প্রশ্ন ৩: মনে বাজে কথা আসা ও নিজেকে "এমন না, এমন না" বলা

উত্তর: এটি ক্লাসিক ওয়াসওয়াসা। আপনি সেটি বলছেন না, বিশ্বাস করছেন না, বরং প্রতিরোধ করছেন — তাই ঈমানে কোনো সমস্যা নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন: "আল্লাহ কারও উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬) আরও: "তিনি তোমাদের অন্তরের গোপন কথা জানেন; তিনি ক্ষমাশীল, সহনশীল।" (সূরা আহযাব: ৫-এর প্রেক্ষাপট)

রাসূল ﷺ বলেছেন: "শয়তান আদম সন্তানের অন্তরে আসে; সে তাকে কুমন্ত্রণা দেয়।" (মুসনাদ আহমাদ) — অর্থাৎ এটা স্বাভাবিক; প্রতিরোধই সমাধান।

আল্লাহ কি ধরবেন? — না, ইনশাআল্লাহ ধরবেন না; কারণ আপনি নিজেই তা ঘৃণা করছেন। হাদিসে এসেছে: "যে ব্যক্তি মনে পাপের কথা ভাবে কিন্তু তা করে না, তার জন্য একটি নেকি লেখা হয়।" (সহিহ বুখারি ৬৪৯১)


প্রশ্ন ৪, ৫, ৬, ৭: মুখে "আমি জাস্ট বিরক্ত হয়েছি, অন্য কিছু বলিনি" বলা এবং মনের কথা

উত্তর: এখানে দুটি বিষয় আলাদা করতে হবে:

১. মুখে বলা: "আমি জাস্ট বিরক্ত হয়েছি, অন্য কিছু বলিনি" — এটি একটি সত্য বাক্য (আপনি সত্যিই কুফরি কিছু বলেননি)। এতে ঈমানের কোনো ক্ষতি নেই।

২. মনে মনে অন্য কথা: মনে খারাপ কথা আসা — যা আপনি ঘৃণা করেন — তাতে ঈমান যায় না। মনের কথা আল্লাহ জানেন, কিন্তু যতক্ষণ আপনি তা বিশ্বাস না করেন বা মুখে না আনেন, তাতে ধরা হবে না।

"হাফ মুখে, হাফ মনে" — কোনটা ধরা হবে? — ইসলামে হিসাব হয় ইচ্ছাকৃত বিশ্বাস ও মুখের স্বীকৃতি-র উপর, শুধু কল্পনা বা কুমন্ত্রণার উপর নয়। ইমাম তাহাবি (রহ.) «আকিদাতুত তাহাবিয়্যা»-য় বলেন: "মনের কুমন্ত্রণা ও শয়তানের প্ররোচনা ক্ষমাযোগ্য; যতক্ষণ তা বিশ্বাসে পরিণত না হয়।" ইবনে আবিদিন (রহ.)-ও একই কথা বলেন।

সুতরাং: পুরো বাক্য স্পষ্টভাবে মুখে উচ্চারণ করলেই "ধরা হবে" — এমন নিয়ম নেই; বরং কুফরি বিশ্বাস বা কুফরি কথা ইচ্ছাকৃত বলা-ই ধরা হয়। আপনার ক্ষেত্রে তা হয়নি।


প্রশ্ন ৮: হাদিস পড়ে বিরক্ত হওয়া বড় অপরাধ মনে হওয়া

উত্তর: আপনি নিজেই বলেছেন এটি আপনার কাছে "বড় অপরাধ মনে হচ্ছে" — এটাই ওয়াসওয়াসার লক্ষণ। শয়তান চায় আপনি নিজেকে গুনাহগার ভাবুন ও হতাশ হন। আল্লাহ তাআলা বলেন: "নিশ্চয়ই তিনি (শয়তান) মুমিনদেরকে ভয় দেখায়।" (সূরা আলে ইমরান: ১৭৫-এর সমার্থক)

সমাধান: তাওবা করুন, ইস্তিগফার করুন, এবং এই চিন্তা দমন করুন। রাসূল ﷺ বলেছেন: "শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও এবং থুতু ফেলো (বাম দিকে)।" (সহিহ মুসলিম ২২০৩) আর বলুন: "আ'উযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" এবং "আমানতু বিল্লাহি ওয়া রাসুলিহি"।


প্রশ্ন ৯: ঈমান ও বিবাহিত জীবন ঠিক আছে?

উত্তর: আপনার ঈমান ইনশাআল্লাহ ঠিক আছে — কারণ আপনি কুফরি বিশ্বাস করেননি, বরং তা ঘৃণা করেছেন ও আফসোস করেছেন। বিবাহিত জীবন সম্পর্কে আপনি কিছু উল্লেখ করেননি; তবে এই ওয়াসওয়াসা যদি দাম্পত্য জীবনে সন্দেহ, রাগ বা দূরত্ব সৃষ্টি করে, তবে দম্পতিকে একসাথে বসে কথা বলা, একে অপরকে আশ্বস্ত করা এবং প্রয়োজনে বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ওয়াসওয়াসার কারণে স্ত্রী/স্বামীর প্রতি অবিচার করা যাবে না।


প্রশ্ন ১০: উত্তরের উপর আমল করা যাবে?

অবশ্যই, ইনশাআল্লাহ। নিম্নলিখিত আমলগুলো করুন:

  1. ওয়াসওয়াসাকে উপেক্ষা করুন — তার সাথে তর্ক করবেন না, "এমন না, এমন না" বলে বারবার পুনরাবৃত্তি করবেন না; বরং মুখ ফিরিয়ে নিন।
  2. আ'উযু বিল্লাহ পড়ুন এবং "আমানতু বিল্লাহি ওয়া রাসুলিহি" বলুন।
  3. ইস্তিগফার ও তাওবা করুন — "আল্লাহুম্মাগফিরলি"।
  4. হাদিস/ইসলামি পোস্ট পড়ার সময় নির্ভরযোগ্য আলেমের ব্যাখ্যা ছাড়া গভীর বিষয়ে না ঢোকা; সন্দেহ হলে আলেমকে জিজ্ঞেস করা।
  5. নামাজ-রোজা নিয়মিত রাখুন; কুরআন তিলাওয়াত বাড়ান।
  6. ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস-ফালাক-নাস পড়ুন।
  7. প্রয়োজনে একজন বিশ্বস্ত আলেম/মুফতির সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করুন — ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য দুআ ও পরামর্শ নিন।

শেষ কথা: আপনি ভয় পাচ্ছেন — এটাই প্রমাণ আপনার ঈমান জীবিত। যার ঈমান নেই, সে এসব নিয়ে ভাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন: "আল্লাহ মুমিনদের অন্তরে ঈমানকে প্রিয় করে দিয়েছেন এবং কুফর, ফিসক ও অবাধ্যতাকে ঘৃণ্য করে দিয়েছেন।" (সূরা হুজুরাত: ৭) — আলহামদুলিল্লাহ, আপনার অন্তরে কুফর ঘৃণ্য, তাই আপনি নিরাপদ, ইনশাআল্লাহ।

والله أعلم بالصواب।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.