হাদীস পড়ে বিরক্তি, নবী ﷺ সম্পর্কে ওয়াসওয়াসা ও কুচিন্তা আসলে ঈমান নষ্ট হয় কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
১)ফেসবুকে আমাদের নবী নিয়ে একটা ইসলামিক পোস্ট পড়তেছিলাম। ভালো পোস্ট। তখন আমার মনে অনেক প্রশ্ন চলে আসছে, আর অনেক বিরক্ত চলে আসছে। কারন এক এক হাদীস এ এক এক রকম লিখা থাকে। আমাদের মত সাধারণ মানুষ এর জন্য তো সব বুঝা কঠিন। তাই পোস্টে নবীর যে হাদিস টা লিখা ছিল, সেটা পরেই আমার মুলত মনের মধ্যে বিরক্ত চলে আসে। পরে আমি আবার ভাবতে থাকি মনে মনে এত বিরক্ত ভাব এমন করা তো আমার ঠিক হয় নাই৷ এখন আল্লাহ যদি আমাকে ধরেন? আমার ঈমান কি ঠিক আছে?
২) মনে মনে যে বিরক্ত হলাম সেই ইসলামিক পোস্ট টা পড়ে। নবীর হাদিস সেখানে যা লিখা ছিল ওটা নিয়ে৷ এটার জন্য কি ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?
৩) এগুলা ভাবতে ভাবতে মনে মনে আরো বাজে কথা বলে ফেলছি । নবীকে নিয়ে। আল্লাহ মাফ করুক। আমি মনে মনে এগুলা বলতেছি আবার মনে মনেই বলতেছি এমন না, এমন না। মানে এক মনে অইসব কথা আসতেছে, আরেক মনে আমি বলতেছি এমন না, এমন না। এখন আমার খুব খারাপ লাগতেছে হুজুর।আল্লাহ কি আমাকে ধরবেন?
আমার ঈমান কি ঠিক আছে?
৪)এগুলা করার পরে আমি নিজে নিজে ভাবতে থাকি আর মুখে উচ্চারণ করে বলি যে," আমি জাস্ট বিরক্ত হইছি। অন্য কোনো কিছু বলি নাই"। মানে সেই হাদিস টা পড়ে আমার বিরক্ত চলে আসছিলো। তাই এটা আমি মুখে উচ্চারণ করে বলি। নবীর হাদিস পড়ে বিরক্ত হয়ে মুখে এমন উচ্চারণ করা তে কি ঈমানের কোনো সমস্যা হবে?
৫)এখন মুখে "আমি তো জাস্ট বিরক্ত হইছি, অন্য কিছু বলি নাই"। এটা বলে, মনে মনে অন্য কথা বললে কি কোনো সমস্যা হবে? মানে মুখে এই কথা উচ্চারণ করে বললে, আর মনে মনে কার উপর কিসের উপর বিরক্ত হইছি সেটা বললে কি ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?
৬) মুখে উচ্চারণ করে - "আমি তো জাস্ট বিরক্ত হইছি, অন্য কিছু বলি নাই"। এটাই শুধু বলছি। এখন মুখে বলেছি "শুধু বিরক্ত হইছি" কিন্তু মনে মনে অন্য কিছু বলেছি। হাফ মুখে বললে, হাফ মনে মনে বললে । এখন কি মনের টা ধরা হবে? নাকি পুরো বাক্য স্পষ্ট ভাবে মুখে উচ্চারণ করলেই ধরা হবে?
৭)এতক্ষন মনে হচ্ছিল সব তো মনে মনেই বললাম। কোনো সমস্যা হবে না ইন শা আল্লাহ। কিন্তু এখন এই একটা কথা মুখে উচ্চারণ করে ফেলছি তাই চিন্তা হচ্ছে। আমি যে মুখে উচ্চারণ করে বললাম "আমি তো জাস্ট বিরক্ত হইছি, অন্য কিছু বলি নাই"। এখানে কার উপর কিসের উপর বিরক্ত হইছি সেটা উচ্চারণ করি নাই। এখন শুধু এটুকু কথা " আমি জাস্ট বিরক্ত হইছি " উচ্চারণ করার জন্য আমার ঈমানে কোনো সমস্যা হয়েছে?
৮) হাদিস পড়ে সেটা নিয়ে বিরক্ত হওয়া আমার কাছে অনেক বড় অপরাধ মনে হচ্ছে। কারন নবী যেটা বলেছেন সেটা পড়ে বিরক্ত কেন আসবে? আমার ঈমান কি ঠিক আছে?
৯) আপনার উত্তরের উপর আমল করতে পারব?
১০) হুজুর আপনি বললে জোর লাগে। মনে হয় বিজ্ঞ কেউ উত্তর দিয়েছে। তাই এআই উত্তর না দিয়ে যদি একটু একবার বলে দিতেন আমার ঈমান বিবাহিত জীবন ঠিক আছে কিনা ?
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আপনার মনের ব্যাকুলতা, অনাকাঙ্ক্ষিত অহেতুক চিন্তা (ওয়াসওয়াসা) এবং ঈমান ও বিবাহিত জীবন নিয়ে তৈরি হওয়া ভীতি অনুধাবন করতে পেরেছি। আপনি একদম নিশ্চিন্ত থাকুন। নিচে আপনার ১০টি প্রশ্নেরই হানাফী ফিকহ ও প্রামাণ্য ফাতাওয়া কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ সুনির্দিষ্ট শরঈ ফয়সালা উপস্থাপন করা হলো:
১, ২ ও ৮ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: হাদিস পড়ে বিরক্তি আসা, অপরাধবোধ ও ঈমানের অবস্থান
-
শরঈ ফয়সালা: হাদিস পাঠ করার সময় সাধারনাংশে গভীর অর্থ বুঝতে না পারা বা ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা দেখে মনে ক্ষণিকের জন্য যে বিরক্তি বা খটকা এসেছে, এর কারণে আপনার ঈমানের কোনো ক্ষতি হয়নি; আপনার ঈমান শতভাগ ঠিক ও বহাল রয়েছে।
-
ফিকহী কারণ: সাধারণ মানুষের জন্য হাদিসের পারস্পরিক সমন্বয় ও গভীরতা বোঝা কঠিন হওয়ায় সাময়িক মনঃক্ষুণ্ণ হওয়া দ্বীনকে অস্বীকার করা নয়। পরবর্তীতে "এমন করা আমার ঠিক হয়নি" বলে অন্তরে যে তীব্র অনুশোচনা ও অপরাধবোধ জেগেছে, উক্ত অনুশোচনাই প্রামাণ্য দলিল যে আপনার অন্তরে সুদৃঢ় ঈমান ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি অগাধ ভালোবাসা বিদ্যমান রয়েছে।
-
সংযুক্ত কিতাব ও পৃষ্ঠা:
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৯৫–১৯৬ (পরিচ্ছেদ: 'ওয়াসওয়াসা শায়তানী সে ইমান জায়া না হওয়া ওয়া উসকা ইলাজ')।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৪র্থ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৬৮, ১৩৯।
৩ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: মনে বাজে কথা আসা এবং অন্তরে তা প্রতিহত করা ("এমন না, এমন না")
- শরঈ ফয়সালা: এটি শতভাগ শয়তানের ঢেলে দেওয়া 'ওয়াসওয়াসা' (অনাকাঙ্ক্ষিত কূচিন্তা)। এ জন্য আল্লাহ তাআলা আপনাকে কখনোই ধরবেন না এবং আপনার ঈমান সম্পূর্ণ নিরাপদ ও অটুট রয়েছে।
- ফিকহী কারণ: রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের অন্তরের অনাকাঙ্ক্ষিত কূচিন্তা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তা কাজে পরিণত করে বা মুখে উচ্চারণ করে” (সহিহ বুখারি)। এক মন দিয়ে কূচিন্তাকে "এমন না, এমন না" বলে প্রতিহত করা স্পষ্ট প্রমাণ করে যে শয়তান আপনাকে ধোঁকা দিতে চাচ্ছে, কিন্তু আপনার ঈমান তা মেনে নিচ্ছে না।
- সংযুক্ত কিতাব ও পৃষ্ঠা:
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৯৫–১৯৬।
৪, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: মুখে "আমি জাস্ট বিরক্ত হইছি, অন্য কোনো কিছু বলি নাই" উচ্চারণ করা
- শরঈ ফয়সালা: মুখে কেবল এটুকু সাধারণ বাক্য উচ্চারণ করার দরুন আপনার ঈমানের বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষতি হয়নি এবং কোনো গোনাহ বা কুফর হয়নি।
- ফিকহী কারণ: ১. মুখের বাক্যের প্রকৃতি: মুখে বলা "আমি জাস্ট বিরক্ত হইছি, অন্য কোনো কিছু বলি নাই" বাক্যটিতে কুফর, শিরক বা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শানে বেয়াদবির কোনো শব্দ নেই। ২. মনের চিন্তা বনাম মুখের উচ্চারণ: ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত মূলনীতি হলো— কুফরি সাব্যস্ত হওয়ার জন্য স্পষ্ট কুফরি শব্দ মুখে উচ্চারণ করা (الفاظ الكفر) শর্ত। ৩. হাফ-মুখে বা মনে মনে যাই থাকুক না কেন, স্পষ্ট কুফরি শব্দ মুখে উচ্চারণ না করা পর্যন্ত মনের অস্ফুট ভাবনার কারণে কোনো ব্যক্তি ঈমানহারা হয় না।
- সংযুক্ত কিতাব ও পৃষ্ঠা:
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (২১তম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৬৪ (অধ্যায়: 'আলফাজে কুফর')।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৪র্থ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৬৮, ১৪০, ১৪১।
৯ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: এই উত্তরের ওপর আমল করার বিধান
- শরঈ ফয়সালা: হ্যাঁ, আপনি পূর্ণ নিশ্চিত মনে ও দ্বিমুখী সংশয় ছাড়াই এই শরঈ উত্তরের ওপর আমল করতে পারবেন।
- করণীয়: অহেতুক শায়তানী ভয় ও ওয়াসওয়াসাকে পুরোপুরি বর্জন করুন। আপনার ঈমান নবায়ন (তাজদীদে ঈমান) বা তওবারও কোনো প্রয়োজন নেই। যখনই কোনো খারাপ চিন্তা আসবে, তখনই মনে মনে পড়ুন: «أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ» এবং «آَمَنْتُ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ»।
- সংযুক্ত কিতাব ও পৃষ্ঠা:
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৯৬।
১০ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: ঈমান ও বিবাহিত জীবনের চূড়ান্ত নিশ্চয়তা
- শরঈ ফয়সালা: আপনার ঈমান এবং আপনার বিবাহিত জীবন—উভয়টিই শতভাগ নিরাপদ, বিশুদ্ধ ও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
- ফিকহী কারণ: ফিকহে হানাফীর শরঈ আইন অনুযায়ী, যেহেতু আপনার দ্বারা কুফর বা রিদ্দাত (ইসলাম ত্যাগ)-এর কোনো স্পষ্ট শব্দ বা ঘটনা সংঘটিত হয়নি, তাই আপনার ঈমান যেমন শতভাগ সুরক্ষিত আছে, তেমনি আপনার বৈবাহিক সম্পর্কও (নিকাহ) সম্পূর্ণ বহাল রয়েছে। আপনার মনে কোনো প্রকার ভয়ের অবকাশ নেই; আপনি নিশ্চিন্ত মনে আপনার স্বামীর সাথে সংসার পরিচালনা করুন।
- সংযুক্ত কিতাব ও পৃষ্ঠা:
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৪র্থ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৬৮, ১৩৯, ১৪০।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (২১তম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৬৪।
আল্লাহ ভালো জানেন।