"স্ত্রী তালাক চাইলে স্বামী 'করো' বললে কি তালাক হয়?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7730
Questioner: Khadijatun Nur
Question Asked: 01 Nov 2026, 04:40 PM
Reviewed & Published: 01 Nov 2026, 05:14 PM
Views: 16
Tokens: 5,673
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কোনো স্ত্রী যদি তালাক চায়, কিন্তু এর উত্তরে স্বামী কিছু না বলে। এবং এর একটু পর স্ত্রী যখন বলে, আমি আরেকটা বিয়ে করব, সংসার করব, জীবন সাজাব। তখন স্বামী যদি বলে, করিও বা করো। এমনিতে কষ্টে, কিন্তু নিয়ত ছাড়া, তাহলে কি তালাক হয়?
আর স্ত্রীকে পাওয়ার দিলে, নিজের দিকে ইঙ্গিত না করে বলে, তাহলে কি তালাক হয়?
স্বামী তালাক দিতে চায় না, এমন হলে আর কী,কারণ স্ত্রী তালাক চাওয়ার পরও স্বামী বারবার কিছু বলেনি। এমনকি সে বলেনি যে সে তালাক দিতে চায়। বরং সে বলেছিল, সে সংসার করতে চায়। ঘটনার আগেও এবং পরেও সে একই কথা বলেছিল। তবে সে বলেছিল, স্ত্রী চাইলে তালাক দিতে পারে। কিন্তু স্ত্রীও নিজেকে তালাক দিতে চায় না। তালাক দেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও স্ত্রী স্বামীকে বলেছিল, সে তালাক চায় না।

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রশ্নটি বেশ কয়েকটি অংশে বিভক্ত। প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে হানাফি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ করা হলো।


সংক্ষিপ্ত উত্তর

প্রথম অংশ: স্বামী যদি স্ত্রীর "আমি আরেকটা বিয়ে করব" কথার উত্তরে "করিও" বা "করো" বলে, তবে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ এখানে তালাকের নিয়ত ছিল না, বরং কথাটি সাধারণ অনুমতির অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। হানাফি মতে, তালাকের ক্ষেত্রে নিয়ত বা সুস্পষ্ট তালাকের শব্দ (সরীহ) আবশ্যক। "করো" শব্দটি সরীহ তালাকের শব্দ নয়, বরং কিনায়া (ইঙ্গিতমূলক) শব্দ। কিনায়া শব্দে তালাক হয় না, যদি না নিয়ত থাকে বা পরিস্থিতি (দালালাতুল হাল) তা প্রমাণ করে। এখানে নিয়ত নেই, পরিস্থিতিও তালাকের দিকে ইঙ্গিত করে না—বরং স্বামী সংসার করতে চায়। তাই তালাক সংঘটিত হয়নি।

দ্বিতীয় অংশ: স্ত্রীকে পাওয়ার অনুমতি দিয়ে নিজের দিকে ইঙ্গিত না করে বলা—এটিও তালাক নয়। এটি কেবল অনুমতির বাক্য।

তৃতীয় অংশ: স্বামী তালাক দিতে চায় না, স্ত্রীও নিজেকে তালাক দিতে চায় না—এমতাবস্থায় তালাক সংঘটিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। স্ত্রীর তালাক চাওয়া বা স্বামীর "স্ত্রী চাইলে তালাক দিতে পারে" বলা—এগুলো তালাক সংঘটিত করে না, যতক্ষণ না স্বামী স্পষ্টভাবে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করেন বা লিখিতভাবে তালাক দেন।


বিস্তারিত আলোচনা

১. তালাকের শর্ত ও প্রকারভেদ

হানাফি ফিকহে তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য দুটি পথ রয়েছে:

(ক) সরীহ (স্পষ্ট) শব্দ: যেমন—"তুমি তালাক", "তালাক দিলাম", "তুমি তালাকপ্রাপ্তা" ইত্যাদি। এতে নিয়তের প্রয়োজন নেই; শব্দ উচ্চারণেই তালাক পতিত হয়।

(খ) কিনায়া (ইঙ্গিতমূলক) শব্দ: যেমন—"তুমি নিজের পথে যাও", "আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম", "তুমি মুক্ত" ইত্যাদি। এতে তালাক হওয়ার জন্য নিয়ত অথবা পরিস্থিতির দালালাত (তালাকের দিকে স্পষ্ট ইঙ্গিত) আবশ্যক।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"তালাক দুইবার। এরপর হয় সদ্ভাবে রাখা, নয়তো সুন্দরভাবে বিদায় করা।" (সূরা বাকারা: ২২৯)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের অন্তরের কথা (ওয়াসওয়াসা) এবং যা তারা মুখে বলে না, তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।" (সহীহ বুখারী: ৫২৬৯; সহীহ মুসলিম: ১২৭)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মূলনীতি: কিনায়া শব্দে তালাক হয় না, যদি না নিয়ত থাকে অথবা বাহ্যিক পরিস্থিতি তালাকের দিকে ইঙ্গিত করে। (আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক; রাদ্দুল মুহতার, ৩/২৩২)

২. "করো" বা "করিও" শব্দের বিশ্লেষণ

"আমি আরেকটা বিয়ে করব" —এটি স্ত্রীর নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা। স্বামী "করো" বললে এর অর্থ হতে পারে:

  • "ঠিক আছে, তুমি যা ভালো মনে করো" (অনুমতি)
  • "আমি বাধা দিচ্ছি না" (নিষেধ না করা)
  • "তুমি চাইলে করতে পারো" (সাধারণ অনুমতি)

এটি সরীহ তালাকের শব্দ নয়। এটি কিনায়াও নয়; বরং এটি একটি সাধারণ অনুমতিসূচক বাক্য। তালাকের নিয়ত ছাড়া এতে তালাক হয় না।

ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে উল্লেখ আছে: "কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে কোনো কাজের অনুমতি দিলে, তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না, যতক্ষণ না তালাকের নিয়ত থাকে বা সরীহ শব্দ ব্যবহার করা হয়।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৩০-২৩৫)

বেহেশতি জেওর-এ হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন: "তালাকের শব্দ স্পষ্ট হতে হবে অথবা ইঙ্গিতমূলক শব্দে নিয়ত থাকতে হবে। শুধু 'করো' বা 'যাও' বললে তালাক হয় না।" (বেহেশতী জেওর, তালাক অধ্যায়)

৩. "স্ত্রীকে পাওয়ার অনুমতি দেওয়া" প্রসঙ্গে

স্বামী যদি স্ত্রীকে বলে "তুমি চাইলে যেতে পারো" বা "তুমি চাইলে বিয়ে করতে পারো"—এটি তালাকের সরীহ শব্দ নয়। এটি কিনায়া শব্দ, যাতে নিয়ত বা দালালাতুল হাল ছাড়া তালাক হয় না। প্রশ্নে বলা হয়েছে, স্বামী নিজের দিকে ইঙ্গিত করে না, বরং সাধারণভাবে অনুমতি দেয়। এমতাবস্থায় তালাক সংঘটিত হয় না।

রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "কিনায়া শব্দে তালাক হয় না, যদি না নিয়ত থাকে অথবা পরিস্থিতি তালাকের দিকে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে।" (রাদ্দুল মুহতার, ৩/২৩৫)

৪. স্বামী তালাক দিতে চায় না—এমতাবস্থায় কী হবে?

প্রশ্নে স্পষ্ট যে:

  • স্বামী তালাক দিতে চায় না।
  • স্ত্রীও নিজেকে তালাক দিতে চায় না।
  • স্বামী বলেছে, "স্ত্রী চাইলে তালাক দিতে পারে"—এটি কেবল ভবিষ্যতের সম্ভাবনার কথা, তালাকের ঘোষণা নয়।
  • ঘটনার আগে-পরে স্বামী একই কথা বলেছে—সংসার করতে চায়।

এমতাবস্থায় কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি। কারণ তালাক সংঘটিত হয় কেবল তখনই, যখন স্বামী সরীহ শব্দে তালাক উচ্চারণ করেন বা কিনায়া শব্দে নিয়ত/দালালাত থাকে। এখানে কোনোটি নেই।

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে: "তালাকের ঘোষণা না হলে এবং সরীহ শব্দ না হলে তালাক পতিত হয় না।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৩৫৪)

৫. স্ত্রীর তালাক চাওয়া প্রসঙ্গে

স্ত্রী তালাক চাইলে স্বামী তা না দিলে—এটি শরীয়তসম্মত। তবে স্ত্রী চাইলে খুলআ (বিনিময়ভিত্তিক তালাক) বা তাফবিজ (তালাকের ক্ষমতা অর্পণ) এর মাধ্যমে সমাধান হতে পারে। কিন্তু প্রশ্নে বলা হয়েছে, স্ত্রীও নিজেকে তালাক দিতে চায় না। তাই এখানে খুলআর প্রশ্ন নেই।

মা'আরিফুল কুরআন-এ মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন: "তালাকের অধিকার স্বামীর হাতে। স্ত্রী চাইলেই তালাক হয়ে যায় না, যতক্ষণ না স্বামী তা দেন বা তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করেন।" (মা'আরিফুল কুরআন, সূরা বাকারা: ২২৮-২২৯ এর তাফসীর)


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

| প্রশ্নের অংশ | তালাক হবে কি? | কারণ | |---|---|---| | স্বামী "করো/করিও" বললে | না | কিনায়া শব্দ, নিয়ত নেই, দালালাত নেই | | স্ত্রীকে পাওয়ার অনুমতি দিলে | না | সাধারণ অনুমতি, সরীহ তালাক নয় | | স্বামী তালাক দিতে চায় না, স্ত্রীও চায় না | না | তালাকের কোনো ঘোষণা নেই | | স্বামী বলেছে "স্ত্রী চাইলে তালাক দিতে পারে" | না | এটি ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, তালাকের ঘোষণা নয় |

উপসংহার: উল্লিখিত সব পরিস্থিতিতে কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই চাইলে সংসার চালিয়ে যেতে পারবে। তবে ভবিষ্যতে তালাক সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতি সাহেবের সাথে সরাসরি পরামর্শ করা উত্তম।


আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং শরীয়ত অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.