মনে কুফরি কথা আসলে ঈমান বাতিল হয় কি? ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত হলে করণীয় কী?
Faith and Belief · Hanafi
Question
১) আমি আমার জানা মতে কোনো কিছু মুখে উচ্চারণ করি নাই কুফরির মত। আমার মনে মনে কিছু আসলে বাজে কথা সেটা আমি মনে বলছি না মুখে বলছি, সেটা নিয়ে টেনশন এ পড়ে যাই। তখন আমি এই বাজে কথা গুলা আবার চেক করি মুখ হা করে, জিহবা নেড়ে, মনে মনে বলে।।কোনো সাউন্ড হয় কিনা। চেক করার জন্য বাজে কথা গুলা আমি ইচ্ছা করেই বলি। দেখতে কোনো সাউন্ড হয় কিনা। পরে নিশ্চিত হই যে, প্রথমে যে বাজে কথা বলেছিলাম সেটা মনে হয় মনে মনেই বলছি।
২) আমার মনে যদি বাজে কথা চলেও আসে, মাঝে মাঝে হাদীস পড়ে, এটা ওটা নিয়ে অনেক কিছু চলে আসে মনে। তার পরেও আমি মনে মনে বললেও মুখে কিছু উচ্চারণ করি নাই। মনে মনে বিরক্ত হইলেও ইসলামের জিনিস নিয়ে মুখে উচ্চারণ করি নাই৷ আবার একটু পরে বুঝেছি বিরক্ত হওয়া ঠিক হয় নাই।
৩) ইউটিউব এ সার্চ করলে হুজুর রা বলে ঈমান নবায়ন করেন, বিয়ে নবায়ন করেন। এগুলা দেখে আরো ভয় লাগে। আবার আপনাদের অনেকে ফতোয়া দেয় যে, মুখে কুফরি কথা উচ্চারণ করলেই ঈমানে সমস্যা। এটা মনে করে আরোও ভয় লাগে।
৪) এখন আমি আমার মন কে কিভাবে বুঝাবো যে, আমার সব কিছু ঠিক আছে? আমাকে নতুন করে কিছু নবায়ন করতে হবে না।
৫) মুফতি সাহেব রা উত্তর দিয়েছেন ঈমান বিয়ে সব ঠিক আছে। কিন্তু আমি আমার মনে হয় তারা আমার প্রশ্ন বুঝেছেন? তারা বলে আমি ওসওয়াসা তে আক্রান্ত। কিন্তু আমার এটা মনে হয় না। আমার একটাই ভয় হয় আমার বিয়ে ঠিক আছে তো। বিয়ে নিয়ে আমি অনেক ভয় পাই। এমন ভাবে কি মন কে বুঝাইতে পারবো যে, আমাকে মুফতি সাহেব উত্তর দিয়েছেন তার উত্তর এর উপর আমল করি। আল্লাহ না করুক কোনো সমস্যা হলে মুফতি সাহেব এর হবে , আমাকে উত্তর দিয়েছেন দেখেই তো আমি আমল করতেছি যে আমার ঈমান বিয়ে সব ঠিক আছে।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি পড়ে বোঝা যাচ্ছে যে আপনি গভীর মানসিক কষ্ট ও ওয়াসওয়াসায় ভুগছেন। প্রথমে একটি বিষয় পরিষ্কার করে নিন: আপনার ঈমান ও বিবাহ ইনশাআল্লাহ সম্পূর্ণ ঠিক আছে। পূর্বের ফতোয়াও সঠিক ছিল। এখন নিচে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর হানাফি ফিকহের আলোকে দিচ্ছি।
১) মনে বাজে কথা আসা ও মুখে উচ্চারণ না করা
মনে কুফরি বা বাজে কথা আসা—এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। যতক্ষণ মুখে উচ্চারণ না করেন বা মনে তা গ্রহণ না করেন, ততক্ষণ ঈমানের কোনো ক্ষতি হয় না। হাদিসে এসেছে:
«إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَتَكَلَّمْ بِهِ أَوْ تَعْمَلْ بِهِ» — সহিহ বুখারি, হাদিস ৫২৬৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১২৭
অর্থাৎ, যতক্ষণ মুখে বলা বা কাজে পরিণত না হয়, মনে আসা কথা আল্লাহ ক্ষমা করে দেন।
আপনি যা করছেন—অর্থাৎ চেক করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে বাজে কথা মনে বলা—এটি ঠিক নয়। এটি ওয়াসওয়াসাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার» (১/৪৬) -এ ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা হিসেবে লিখেছেন: ওয়াসওয়াসাকে উপেক্ষা করা, তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করা। আপনি চেক করার জন্য যা করছেন তা বন্ধ করুন। মুখে কোনো শব্দ হয়নি—এটাই প্রমাণ যে আপনি উচ্চারণ করেননি। বারবার চেক করা শয়তানের ধোঁকা।
২) মনে বাজে কথা চলা ও ইসলাম নিয়ে বিরক্তি
মনে বাজে কথা আসা, এমনকি ইসলামের বিষয়ে সাময়িক বিরক্তি অনুভব করা—এগুলোও ওয়াসওয়াসা। মনে বিরক্তি আসা কুফর নয়, যতক্ষণ না মুখে কুফরি কথা বলেন বা অন্তরে তা স্বীকার করেন। আপনি নিজেই বলেছেন পরে বুঝেছেন বিরক্তি ঠিক হয়নি—এটাই প্রমাণ যে আপনার অন্তরে ঈমান জীবিত আছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْتِي أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ: مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ حَتَّى يَقُولَ: مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ؟ فَإِذَا بَلَغَهُ فَلْيَسْتَعِذْ بِاللَّهِ وَلْيَنْتَهِ» — সহিহ বুখারি, হাদিস ৩২৭৬
অর্থাৎ শয়তান এমন প্রশ্ন পর্যন্ত নিয়ে আসে, তখন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে এবং ওয়াসওয়াসা বন্ধ করতে হবে।
৩) ইউটিউবে "ঈমান নবায়ন" শোনা
ইউটিউবে অনেক বক্তা সাধারণভাবে ঈমান নবায়ন করার কথা বলেন—এটি সাধারণ মুসলিমদের জন্য সতর্কতামূলক। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু আপনি নিশ্চিত যে মুখে কোনো কুফরি কথা উচ্চারণ করেননি, তাই আপনার ঈমান নবায়ন করা আবশ্যক নয়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার» (৪/২২২) -এ স্পষ্ট করেছেন যে, কুফরি কথা মুখে উচ্চারণ করা ছাড়া ঈমান বাতিল হয় না। শুধু মনে আসা ওয়াসওয়াসা ঈমান বাতিল করে না।
তবে যদি কখনো সত্যিই মুখে কুফরি কথা উচ্চারণ হয়ে যায় (নাউজুবিল্লাহ), তখন তাওবা ও কালিমা পড়ে ঈমান নবায়ন করবেন এবং বিবাহ নবায়ন করবেন। কিন্তু আপনার বর্ণনা অনুযায়ী এমন কিছু ঘটেনি।
৪) মনকে কিভাবে বুঝাবেন?
আপনার মনকে বোঝানোর জন্য নিম্নলিখিত আমলগুলো করুন:
- ওয়াসওয়াসা চেক করা বন্ধ করুন। বারবার "মুখে বলেছি কি না" চেক করা শয়তানের ফাঁদ। একবার নিশ্চিত হয়ে নিন—মুখে বলিনি—তারপর আর চেক করবেন না।
- আউযুবিল্লাহ ও কালিমা পড়ুন। ওয়াসওয়াসা আসলে «أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ» পড়ুন এবং «لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ» বলুন।
- নিজেকে বারবার বলুন: "আমি মুখে কোনো কুফরি কথা বলিনি, আমার ঈমান ও বিবাহ ঠিক আছে।" এটা বিশ্বাস করুন।
- ফতোয়ার উপর আমল করুন। আপনি মুফতি সাহেবের ফতোয়া পেয়েছেন—তার উপর ভরসা করুন। ফতোয়া অনুযায়ী আমল করাই যথেষ্ট। বারবার সন্দেহ করা শয়তানের কাজ।
- দোয়া করুন: «يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ» (হে অন্তর পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর স্থির রাখুন)—তিরমিজি, হাদিস ৩৫২২।
৫) মুফতি সাহেবের ফতোয়ার উপর আস্থা
আপনি বলেছেন, "মুফতি সাহেবের উত্তর দিয়েছেন দেখেই তো আমি আমল করছি।" হ্যাঁ, এটাই সঠিক পদ্ধতি। শরীয়তের নিয়ম হলো—মুফতি সাহেবের ফতোয়া পেলে তার উপর আমল করা, বারবার সন্দেহ না করা। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার» (১/৪৬) -এ লিখেছেন যে, ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত ব্যক্তির উচিত ফতোয়ার উপর আমল করা এবং সন্দেহকে উপেক্ষা করা।
আপনার ঈমান ও বিবাহ সম্পূর্ণ ঠিক আছে। আপনি যা ভয় পাচ্ছেন তা শয়তানের ওয়াসওয়াসা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
«وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ أَلْقَىٰ إِلَيْكُمُ السَّلَامَ لَسْتَ مُؤْمِنًا» — সূরা নিসা: ৯৪
আরও বলেন:
«وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ» — সূরা হজ: ৭৮
অর্থাৎ দ্বীনে কোনো সংকীর্ণতা নেই।
সারসংক্ষেপ: আপনার ঈমান ও বিবাহ ঠিক আছে। মুখে কুফরি উচ্চারণ না করলে ঈমান বাতিল হয় না। মনে আসা ওয়াসওয়াসা উপেক্ষা করুন, চেক করা বন্ধ করুন, ফতোয়ার উপর আমল করুন। আল্লাহ আপনার অন্তরকে স্থির রাখুন। আমিন।