শরিয়াহর আলোকে অমুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে বসবাস, PR গ্রহণ ও পরিবারসহ স্থায়ী হওয়ার বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রার্থনা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
সম্মানিত হুজুর এর কাছে আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি পোস্টটি দীর্ঘ হওয়ার জন্য। আমার ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনায় শরিয়াহর আলোকে সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে উপকৃত হব।
আমার ব্যক্তিগত পরিস্থিতি
আমার বয়স ৩০ বছর। আমি বাংলাদেশের একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ সম্পন্ন করেছি এবং দেশে দুটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করার পর বর্তমানে জাপানে বসবাস করছি। আমি অবিবাহিত এবং আমার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান।
আলহামদুলিল্লাহ, জাপানে আমি দেশে থাকার তুলনায় ভালো বেতন, সামাজিক নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং মানুষের অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত একটি জীবন পেয়েছি। এসব সুবিধা বাংলাদেশে আমার পক্ষে একই মাত্রায় পাওয়া কঠিন হতো। তবে দেশে থেকেও মোটামুটি মধ্যবিত্ত জীবনযাপন করা এবং ভালো চাকরি করে চলা সম্ভব।
আমার বাবা-মাও মনে করেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ও জীবিকার দিক থেকে বিদেশে থাকা ভালো হতে পারে। তাঁদের দৃষ্টিতে, বিদেশে পরিশ্রম করলে অন্তত তার প্রতিদান পাওয়া যায়; দেশে অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও পরিশ্রমের চেয়ে প্রভাব-প্রতিপত্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে জাপানে এসে আমার দ্বীন পালন নিয়ে নতুন কিছু উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখানে খাবারের ক্ষেত্রে হালাল-হারাম সম্পর্কে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়—এমনকি দুধ, পাউরুটি ও দৈনন্দিন খাবারের উপাদান নিয়েও। আমি স্বেচ্ছায় কখনো হারাম খাবার গ্রহণ করিনি। কিন্তু সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে থাকাকালে খাবারের বিকল্প বা ডায়েট পরিবর্তনের সুযোগ না থাকায় এমন পরিস্থিতিতে পড়েছি, যেখানে খাবারের উপাদান নিয়ে আমার উদ্বেগ ছিল।
নামাজ ও জুমার ক্ষেত্রেও আমার অভিজ্ঞতা উদ্বেগজনক। গত দুই বছরে কাজের কারণে আমার অনেক ফরজ নামাজ কাজা হয়েছে এবং এ সময়ে আনুমানিক পাঁচ থেকে সাতটি জুমার নামাজ আদায় করতে পেরেছি। অথচ বাংলাদেশে থাকাকালে অন্তত জুমার নামাজ নিয়মিত আদায় করতে পারতাম। আমি জানি, ফরজ নামাজের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি এবং এ ক্ষেত্রে আমার ঘাটতি হয়েছে।
অন্যদিকে, সম্প্রতি কর্মক্ষেত্রে একটি গুরুতর দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর জাপানের চিকিৎসাব্যবস্থা, চিকিৎসার প্রক্রিয়া, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নাগরিক হিসেবে প্রাপ্য অধিকারগুলোর গুরুত্ব আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি। বাংলাদেশে একই পরিস্থিতিতে হয়তো এমন চিকিৎসা, অধিকার ও আর্থিক সুরক্ষা পাওয়া কঠিন হতো; বরং শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি আর্থিক অনিশ্চয়তাও তৈরি হতে পারত।
এই অভিজ্ঞতাগুলোর পর বিদেশে থাকা, দেশে ফিরে যাওয়া এবং নিজের দ্বীন ও ভবিষ্যতের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে আমি দ্বিধায় পড়েছি। দেশে থাকলে দ্বীন পালনের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় সহজ ছিল, কিন্তু জাপানে জীবনযাত্রা, নিরাপত্তা ও আর্থিক সুরক্ষা ভালো। আবার এখানে দ্বীন পালনের ক্ষেত্রে নিজের ঈমান নিয়ে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হয়। দেশে থাকাকালে যেসব বিষয়ে অবহেলা করতাম, বিদেশে এসে সেগুলো আরও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করেছি।
আমি বুঝতে পারছি না, আমার জন্য দেশে ফিরে যাওয়াই শরিয়াহসম্মত উত্তম সিদ্ধান্ত হবে, নাকি বিদেশে থেকে দ্বীন পালনের ঘাটতিগুলো সংশোধন করে একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার চেষ্টা করা উচিত।
আমার মূল প্রশ্ন
একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, প্রত্যেক মানুষ নিজের দেশে যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি, ক্যারিয়ার উন্নয়ন, গবেষণা, দক্ষতার মূল্যায়ন ও আর্থিক স্থিতিশীলতার সুযোগ পান না। কেউ যদি নিজের যোগ্যতার যথাযথ ব্যবহার, উন্নত জীবিকা, নিরাপত্তা, পরিবারকে সহায়তা এবং ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য অন্য দেশে যেতে চান, তাহলে এটিকে সরাসরি দুনিয়ার লোভ বা ভুল উদ্দেশ্য বলা কতটা সঠিক?
বর্তমানে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ রয়েছে, কিন্তু মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া আর ইসলামী শাসনব্যবস্থা থাকা এক বিষয় নয়। কিছু মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে দীর্ঘমেয়াদি PR, পরিবারসহ স্থায়ীভাবে বসবাস, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য এবং শিক্ষার সুযোগ সীমিত। অন্যদিকে কিছু অমুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এসব সুযোগ তুলনামূলক ভালো হতে পারে।
পরিবারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশে দীর্ঘদিন বসবাস করেও যদি স্থায়ী হওয়ার সুযোগ না থাকে কিংবা ভবিষ্যতে স্ত্রী-সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বসবাস করা কঠিন হয়, তাহলে জীবিকা ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বিবেচনা করা উচিত?
আমি নিজে হয়তো ভালো ও সচেতন থাকতে পারবো দ্বীনের ক্ষেত্রে কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষেত্রে এটার নিশ্চয়তা অনেকসময় কম কারন তারা অমুসলিম ফ্রেন্ডলি পরিবেশে বড় হবে এটাও ভাবায়।
একই সঙ্গে, কিছু অমুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে নামাজ, রোজা, হালাল খাবার ও অন্যান্য ফরজ আমল পালন করা সম্ভব হলেও তা মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের তুলনায় কঠিন হতে পারে। হিজাব বা দ্বীন পালনের কারণে সামাজিক মন্তব্য কিংবা বৈষম্যের আশঙ্কাও রয়েছে। তবে কোনো কোনো সমাজে ব্যক্তিগত জীবন ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ তুলনামূলক কম হতে পারে।
সমসাময়িক ফিকহে পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিমদের বসবাস, ফিকহুল-আকাল্লিয়াত এবং দারুল ইসলাম ও দারুল হারবের ধারণা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে শরিয়াহর অবস্থান কী, সেটিও জানতে চাই।
আরেকটি প্রচলিত যুক্তি হলো, নিজ দেশ জনগণের করের অর্থ দিয়ে নাগরিকদের শিক্ষা ও উন্নয়নে অবদান রেখেছে, তাই দেশ ছেড়ে যাওয়া কতটা ন্যায়সংগত। এ যুক্তি কি ধর্মীয়ভাবে দেশ ছাড়ার বিরুদ্ধে কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি করে, নাকি বিষয়টি ব্যক্তির দায়িত্ব, অধিকার ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল?
আমার প্রশ্ন হলো: একজন মুসলিম যদি এমন কোনো অমুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে বসবাস করেন, যেখানে দ্বীন পালন করা সম্ভব, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে তা কঠিন; অন্যদিকে তিনি ভালো জীবিকা, নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যতে PR নিয়ে পরিবারসহ স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পান—তাহলে সেখানে থাকা কি শরিয়াহর দৃষ্টিতে জায়েজ? নাকি দ্বীন পালনের ক্ষেত্রে তুলনামূলক সহজতার কারণে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে বসবাস করাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া আবশ্যক, যদিও সেখানে জীবিকা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা কম হতে পারে?
বিশেষ করে, আমার মতো একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে—যিনি দেশে মোটামুটি ভালোভাবে চলতে পারবেন, কিন্তু বিদেশে উন্নত জীবন ও নিরাপত্তা পেয়েছেন এবং একই সঙ্গে দ্বীন পালনের ক্ষেত্রে কিছু গুরুতর ঘাটতির মুখোমুখি হয়েছেন—দেশে ফিরে যাওয়া নাকি বিদেশে থেকে নিজের দ্বীন সংশোধন ও উন্নত করার চেষ্টা করা উত্তম হবে?
কুরআন-সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য ফিকহি মতামতের আলোকে আমার পরিস্থিতিতে কোন সিদ্ধান্তটি অধিক উপযুক্ত, তা জানালে কৃতজ্ঞ থাকব।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
আমি কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করছি না। বরং আমি আন্তরিকভাবে বুঝতে চাই, কুরআন, সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য ফিকহি মতামতের আলোকে আমার জন্য কোন পথটি অধিক উপযুক্ত হবে।
ইসলামি নীতিমালা এবং আমার ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনায় আপনার দিকনির্দেশনা পেলে আমি কৃতজ্ঞ থাকব।
আপনার সময় ও পরামর্শের জন্য জাযাকাল্লাহু খাইরান।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সম্মানিত প্রশ্নকর্তা, আপনার দীর্ঘ ও বিস্তারিত প্রশ্নটি পড়লাম। আল্লাহ তাআলা আপনার উদ্বেগ ও আন্তরিকতাকে কবুল করুন এবং আপনার জন্য সর্বোত্তম পথ সহজ করে দিন। আপনার প্রশ্নটি মূলত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি ও আকিদাগত বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। আমি ধাপে ধাপে কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।
১. অমুসলিম দেশে বসবাসের বিধান (দারুল ইসলাম ও দারুল হারবের ধারণা)
হানাফি ফিকহে 'দারুল ইসলাম' (ইসলামের ভূমি) ও 'দারুল হারব' (যুদ্ধের ভূমি) এর ধারণা মূলত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও ইবাদতের স্বাধীনতার সাথে সম্পর্কিত। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কোনো ভূমি তখনই 'দারুল হারব' হয় যখন সেখানে ইসলামের প্রকাশ্য বিধান (শিয়ার) বন্ধ হয়ে যায় এবং মুসলমানরা নিরাপত্তার সাথে ইবাদত করতে পারে না। (দেখুন: আল-হিদায়া, কিতাবুল জিহাদ; রাদ্দুল মুহতার, ৪/১২৫)
আধুনিক যুগে রাষ্ট্রব্যবস্থার ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে কোনো দেশে মুসলমানরা যদি নিরাপত্তার সাথে নামাজ, রোজা, হালাল-হারাম মেনে চলতে পারে, তবে ফিকহি দৃষ্টিতে সেখানে বসবাস করা নিষিদ্ধ নয়। বরং যদি সেখানে দ্বীন পালন করা কঠিন হয়, কিন্তু সম্ভব হয়, তবে তা মাকরুহ হতে পারে। আর যদি দ্বীন পালনই অসম্ভব হয়ে যায় (যেমন: ইবাদতের স্বাধীনতা না থাকা, কুফরির বিধান জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া), তবে সেখানে বসবাস করা জায়েজ নয়। (দেখুন: ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৫৬; ফাতাওয়া উসমানি, ৩/৫৮৫)
আপনার ক্ষেত্রে জাপানে দ্বীন পালন করা সম্ভব, যদিও কিছুটা কঠিন। তাই সেখানে বসবাস করা মূলত জায়েজ। তবে এটি আপনার ঈমান ও আমলের ওপর নির্ভর করবে।
২. জীবিকা ও দ্বীনের মধ্যে ভারসাম্য এবং দেশ ত্যাগের বিধান
আপনার প্রশ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—উন্নত জীবিকা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য বিদেশে যাওয়া কি 'দুনিয়ার লোভ'? ইসলামে জীবিকা অর্জনের জন্য বৈধ পথে চেষ্টা করা নিন্দনীয় নয়; বরং এটি ফরজ বা ওয়াজিবের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যদি তা পরিবারের ভরণপোষণের জন্য হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করো।" (সূরা জুমুআ: ১০)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের কেউ যদি নিজের পরিবারের ভরণপোষণের জন্য বের হয় এবং নিজের ইজ্জত রক্ষা করে, তবে সে আল্লাহর পথে জিহাদকারী।" (তিরমিজি: ২৩৪৪)
তবে শর্ত হলো—হালাল উপার্জন, দ্বীন পালনের সুযোগ এবং ঈমান-আকিদার নিরাপত্তা। যদি বিদেশে থেকে দ্বীনের মৌলিক বিধান (ফরজ নামাজ, হালাল খাবার) পালনে স্থায়ীভাবে অবহেলা হয়, তবে তা ভয়ংকর। আপনার ক্ষেত্রে ফরজ নামাজ কাজা হওয়া এবং জুমা ছুটে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ফরজ নামাজ কাজা করা কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন: "নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ করা হয়েছে।" (সূরা নিসা: ১০৩)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ছেড়ে দেয়, তার ওপর আল্লাহর কোনো দায়িত্ব নেই।" (মুসনাদ আহমাদ: ২২১৯৯) — অর্থাৎ সে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হবে।
তাই আপনার জন্য প্রথম কাজ হলো—জাপানে থেকে নামাজ ও জুমার ব্যবস্থা করা। যদি কাজের কারণে জুমা আদায় করা সম্ভব না হয়, তবে এমন চাকরি বা সময় নির্ধারণ করা, যেখানে জুমা আদায় করা যায়। ইসলামে জুমা আদায় করা ফরজ (মুকিম ব্যক্তির জন্য)। জুমা ছেড়ে দেওয়া জায়েজ নয়, যদি না শরয়ি ওজর থাকে। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, ২/১৪১; ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/১৪৫)
৩. মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ফিরে যাওয়া কি আবশ্যক?
মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে বসবাস করা ইসলামের দৃষ্টিতে উত্তম, যদি সেখানে দ্বীন পালন সহজ হয় এবং ঈমান-আকিদা রক্ষা করা যায়। তবে এটি কোনো ফরজ নয়, যদি না অমুসলিম দেশে দ্বীন পালন অসম্ভব হয়ে যায়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "মুসলমানের জন্য দারুল হারবে বসবাস করা জায়েজ নয়, যদি না সে দ্বীন পালনে সক্ষম হয় এবং নিরাপত্তা থাকে।" (রাদ্দুল মুহতার, ৪/১২৫)
আপনার ক্ষেত্রে দেশে ফিরে গেলে দ্বীন পালন সহজ হবে, কিন্তু জীবিকা ও নিরাপত্তা কমবে। আবার বিদেশে থাকলে জীবিকা ও নিরাপত্তা ভালো, কিন্তু দ্বীন পালনে ঘাটতি হচ্ছে। ইসলামে দ্বীনের হেফাজত জীবিকার চেয়ে অগ্রাধিকার পায়। আল্লাহ তাআলা বলেন: "হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো।" (সূরা তাহরিম: ৬)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "প্রত্যেক ব্যক্তি তার পরিবারের দায়িত্বশীল, এবং তাকে তার অধীনদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।" (বুখারি: ৮৯৩)
তাই আপনার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করুন:
-
ঈমান ও আমলের নিরাপত্তা: আপনি যদি জাপানে থেকে নামাজ, রোজা, হালাল খাবার ও জুমা আদায়ের ব্যবস্থা করতে পারেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারেন, তবে সেখানে থাকা জায়েজ। কিন্তু যদি আপনি নিজেই স্বীকার করেন যে ফরজ নামাজ কাজা হচ্ছে এবং জুমা ছুটে যাচ্ছে, তবে এটি অত্যন্ত বিপদজনক। ফরজ ইবাদতের অবহেলা কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়।
-
পরিবারের দায়িত্ব: আপনি একমাত্র সন্তান। বাবা-মায়ের খেদমত করা ফরজ। যদি তারা আপনার সাথে জাপানে থাকতে না চান বা সেখানে তাদের দ্বীনি পরিবেশ ভালো না হয়, তবে দেশে ফিরে তাদের খেদমত করা আপনার জন্য অগ্রাধিকার হতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "মায়ের পায়ের নিচে জান্নাত।" (নাসাঈ: ৩১০৪)
-
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম: সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা ও পরিবেশ নিশ্চিত করা পিতার দায়িত্ব। অমুসলিম পরিবেশে সন্তানদের ঈমান রক্ষা করা কঠিন। আল্লাহ তাআলা বলেন: "হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ও পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো।" (সূরা তাহরিম: ৬)
-
নিয়ত ও উদ্দেশ্য: বিদেশে যাওয়ার নিয়ত যদি শুধু দুনিয়ার লোভ হয়, তবে তা নিন্দনীয়। কিন্তু যদি নিয়ত হয়—হালাল জীবিকা অর্জন, পরিবারের ভরণপোষণ, দ্বীন পালনের সুযোগ এবং সন্তানদের ইসলামি শিক্ষা দেওয়া—তবে তা বৈধ। নিয়ত ভালো হলে কাজও ইবাদত হয়ে যায়।
৪. দেশ ত্যাগের নৈতিকতা ও করের যুক্তি
আপনার উত্থাপিত যুক্তি—"দেশের করের অর্থ দিয়ে শিক্ষা ও উন্নয়নে অবদান রাখা হয়েছে, তাই দেশ ছাড়া ন্যায়সংগত নয়"—এটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। ইসলামে দেশপ্রেম ও নাগরিক দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা ফরজ ইবাদতের চেয়ে বড় নয়। যদি দেশে থেকে দ্বীন পালন কঠিন হয় বা জীবিকার সংকট থাকে, তবে বৈধ পথে অন্য দেশে হিজরত করা জায়েজ। ইমাম শাফি (রহ.) বলেন: "যদি কোনো মুসলমানের দ্বীন বা জীবন বিপন্ন হয়, তবে তার জন্য হিজরত করা জায়েজ।" (আল-উম্ম, ৪/১৭০)
তবে হিজরতের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দ্বীন ও জীবিকার নিরাপত্তা, শুধু দুনিয়ার লোভ নয়।
৫. আপনার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত কী?
আপনার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আমি নিম্নলিখিত পরামর্শ দিচ্ছি:
-
প্রথমে দ্বীনি ঘাটতি সংশোধন করুন: জাপানে থেকে নামাজ ও জুমার ব্যবস্থা করুন। যদি কাজের সময় এমন হয় যে জুমা আদায় করা যায় না, তবে চাকরির সময় পরিবর্তন করুন বা এমন চাকরি খুঁজুন, যেখানে দ্বীন পালন সহজ হয়। ফরজ নামাজ কাজা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কাজা নামাজগুলো আদায় করুন এবং তাওবা করুন।
-
হালাল খাবারের ব্যবস্থা করুন: জাপানে হালাল খাবারের বিকল্প আছে। নিজে রান্না করুন বা হালাল রেস্তোরাঁ খুঁজুন। অসুস্থ অবস্থায় খাবারের বিকল্প না থাকলে ইসলামে রুখসত আছে, তবে সুস্থ অবস্থায় সতর্ক থাকুন।
-
দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত: যদি আপনি জাপানে থেকে দ্বীন পালনের মৌলিক বিধান (ফরজ নামাজ, জুমা, হালাল খাবার) নিশ্চিত করতে না পারেন, তবে দেশে ফিরে যাওয়া আপনার জন্য উত্তম। কারণ দ্বীনের হেফাজত জীবিকার চেয়ে অগ্রাধিকার পায়। আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন, যা সে কল্পনাও করেনি।" (সূরা তালাক: ২-৩)
-
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: যদি জাপানে থাকার সিদ্ধান্ত নেন, তবে সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষার জন্য ইসলামিক স্কুল বা মসজিদের ব্যবস্থা করুন। পরিবারকে সাথে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করুন। আর যদি দেশে ফিরে যান, তবে হালাল জীবিকা ও দ্বীন পালনের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
-
ইস্তিখারা করুন: সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সালাতুল ইস্তিখারা পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের কেউ কোনো কাজের ইচ্ছা করলে সে যেন দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে এবং এই দোয়া করে..." (বুখারি: ১১৬৬)
সারসংক্ষেপ
- অমুসলিম দেশে বসবাস করা জায়েজ, যদি সেখানে দ্বীন পালন সম্ভব হয় এবং ঈমান-আকিদা রক্ষা করা যায়।
- ফরজ নামাজ ও জুমা আদায় করা ফরজ; এগুলো অবহেলা করা কবিরা গুনাহ।
- দ্বীনের হেফাজত জীবিকার চেয়ে অগ্রাধিকার পায়।
- যদি জাপানে থেকে দ্বীন পালনের মৌলিক বিধান নিশ্চিত করতে না পারেন, তবে দেশে ফিরে যাওয়া উত্তম।
- যদি জাপানে থাকেন, তবে দ্বীনি ঘাটতি সংশোধন করুন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা করুন।
- সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইস্তিখারা করুন এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য সর্বোত্তম পথ সহজ করে দিন এবং আপনার ঈমান ও আমলকে মজবুত করুন। আমিন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।