জিনের উপদ্রবের আশংকায় ঘর বন্ধ করার উদ্দেশ্যে হুজুর ডেকে ঘরে বোতল রাখা কি জায়েয?
Halal and Haram · Hanafi
Question
বাবা আমাকে হুজুরকে সাহায্য করতে বলেছে। বাবার খুব কড়া মেজাজ, কিছু বললে উল্টো তিরস্কার করে।
কি করতে পারি আমি এখন? খুব পেরেশানিতে আছি।
Answer
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা নিচে দেওয়া হলো।
মূল নীতি: শিরক থেকে বেঁচে থাকা ফরজ
আল্লাহ তা'আলা কুরআনে ইরশাদ করেন:
"নিশ্চয়ই শিরক মহা অন্যায়।" (সূরা লুকমান: ১৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
"যে ব্যক্তি শিরক করে মারা গেল, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।" (সহীহ মুসলিম: ৯২)
তাই শিরকি কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ করা কোনো মুসলিমের জন্য জায়েয নয়। তবে এখানে কয়েকটি দিক স্পষ্ট করা প্রয়োজন:
১. হুজুর যা করছেন তা কী ধরনের কাজ?
প্রশ্নে বলা হয়েছে—বোতলে কী থাকবে আপনি জানেন না। তাই না জেনে কাউকে শিরকি কাজের অভিযোগ দেওয়া ঠিক নয়। ইসলামে সু-ধারণা (হুসনে যন) রাখা কর্তব্য। হতে পারে তিনি পবিত্র কুরআনের আয়াত (যেমন আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস) লিখে পানিতে ধুয়ে ছিটাচ্ছেন—যা কিছু আলেমের মতে জায়েয (যদিও অনেক হানাফী আলেম এ ধরনের তামিমা-কবজকে মাকরূহ বলেছেন, শিরক বলেননি)।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" (৬/৩৬৩) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন—কুরআনের আয়াত লিখে ঝুলানো বা পানিতে ধুয়ে ব্যবহার করা সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে; কেউ জায়েয বলেছেন, কেউ মাকরূহ বলেছেন। কিন্তু শিরক বলা হয়নি, যতক্ষণ না তাতে আল্লাহর নামের অপমান বা অ-কুরআনী মন্ত্র থাকে।
তবে যদি তিনি জিন-শয়তানের নামে কিছু লেখেন, অথবা এমন মন্ত্র পড়েন যা কুরআন-সুন্নাহ বহির্ভূত, অথবা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন—তাহলে তা স্পষ্ট শিরক বা হারাম।
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী জেওর"-এ লিখেছেন—তাবিজ-কবজে কুরআনের আয়াত থাকলে কোনো কোনো আলেম জায়েয বলেছেন, কিন্তু শর্ত হলো: (ক) শুধু কুরআন-সুন্নাহর দোয়া থাকবে, (খ) বিশ্বাস হবে আল্লাহই শিফা দেন, তাবিজ নিজে কিছু করে না, (গ) শিরকি কালাম থাকবে না।
২. আপনি কী করবেন?
(ক) প্রথমে যাচাই করুন
বিনয়ের সাথে হুজুরকে জিজ্ঞেস করুন—"হুজুর, বোতলে কী আছে? কোন দোয়া পড়ছেন?" এতে আপনি জানতে পারবেন এটি কুরআনী আমল নাকি শিরকি। জেনে-বুঝে বিচার করা ইসলামের শিক্ষা।
(খ) সরাসরি অংশ না নেওয়ার উপায়
আপনি যদি নিশ্চিত হন যে এটি শিরকি কাজ, তাহলে:
- বোতল বহন করা, ধরিয়ে দেওয়া, কোণায় রাখতে সাহায্য করা—এসব থেকে বিরত থাকুন।
- বিনয়ের সাথে বলুন: "আব্বু, আমি একটু অসুস্থ/পেট খারাপ, এখন পারব না" — মিথ্যা নয় এমন ওজর।
- অথবা বলুন: "আব্বু, আমি হুজুরকে জিজ্ঞেস করতে চাই এতে কী আছে—আমার একটু জানতে ইচ্ছা করে।"
(গ) বাবার সাথে বিতর্ক নয়, দুআ করুন
বাবার কড়া মেজাজের কারণে সরাসরি তর্ক করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"তুমি নম্রভাবে ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে তাদেরকে আল্লাহর পথে আহ্বান কর।" (সূরা নাহল: ১২৫)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় দেখে, সে হাত দিয়ে তা পরিবর্তন করবে; যদি না পারে, তবে মুখ দিয়ে; যদি তাও না পারে, তবে অন্তর দিয়ে—এটাই ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।" (সহীহ মুসলিম: ৪৯)
আপনি অন্তত অন্তরে ঘৃণা পোষণ করছেন—এটাই ঈমানের দাবি। সামর্থ্য না থাকলে আল্লাহ আপনাকে মাফ করবেন।
(ঘ) বাবার জন্য দুআ করুন
"হে আল্লাহ, আমার বাবাকে হেদায়াত দিন, তাকে শিরক থেকে হেফাজত করুন।"
(ঙ) বিকল্প সমাধান প্রস্তাব করুন
বাবাকে বলুন: "আব্বু, আমরা তো প্রতিদিন আয়াতুল কুরসি পড়তে পারি, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়তে পারি—রাসূল ﷺ বলেছেন এগুলো ঘরে পড়লে শয়তান প্রবেশ করে না।" (সহীহ বুখারী: ৫০১০, সহীহ মুসলিম: ৭৮০)
এভাবে আপনি শিরক এড়িয়ে সুন্নাহর আমল চালু করতে পারেন।
৩. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
- না জেনে কাউকে শিরকি বলা যাবে না—এটি নিজেই গুনাহ। রাসূল ﷺ বলেছেন: "কেউ তার ভাইকে 'কাফির' বললে, যদি সে প্রকৃতপক্ষে কাফির না হয়, তবে সেই কথাটি বলনেওয়ালার দিকে ফিরে যায়।" (সহীহ বুখারী: ৬১০৪)
- তবে নিশ্চিতভাবে শিরকি কাজে সহযোগিতা করা যাবে না। আল্লাহ বলেন: "তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নীতি হলো—সন্দেহজনক বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা, কিন্তু অন্যের ওপর দোষারোপ না করা।
সারসংক্ষেপ
১. প্রথমে বিনয়ের সাথে হুজুরকে জিজ্ঞেস করুন বোতলে কী আছে। ২. যদি কুরআনী দোয়া হয়—অংশ নিতে অসুবিধা নেই (তবে বিশ্বাস আল্লাহর ওপর রাখুন)। ৩. যদি শিরকি হয়—বিনয়ের ওজর দিয়ে বিরত থাকুন, তর্ক নয়। ৪. বাবার জন্য দুআ করুন, সুন্নাহর আমল প্রস্তাব করুন। ৫. অন্তরে ঘৃণা রাখুন—এটাই আপনার সামর্থ্যের ঈমানী দায়িত্ব।
আল্লাহ তা'আলা আপনাকে ধৈর্য ও হিকমত দান করুন এবং আপনার বাবাকে হেদায়াত করুন। আমীন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।